পিটার বাফেট একজন মিউজিশিয়ান, জনদরদী এবং এক সময়কার বিশ্বের সবেচেয়ে ধনী, ওয়ারেন বাফেটের বড় ছেলে। নেব্রাস্কার ওমাহায় মধ্যবিত্ত আমেরিকানদের মত বড় হয়েছেন তিনি। আর দশটা পরিবারের সন্তানের মত ছোটবেলা থেকে সব কাজেই মা-বাবার পূর্ণ সহযোগিতা পেয়েছেন। নগদ টাকা বাদে অবশ্য। টাকার নাগাল পেতে বহু বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে তাকে। উনিশ বছর বয়সে প্রথমবারের মত ৯০ হাজার ডলার মূল্যের স্টকের মালিক হন পিটার। একেবারে অল্প ছিল না অঙ্কটা। কিন্তু যার বাবা ওয়ারেন বাফেটের মত ধনকুবের, তার জন্য একটু অল্প হয়ে যায় ঠিকই। রেকর্ডিংয়ের যন্ত্রপাতি কিনতে টাকাটা খরচ করে ফেলেছিলেন পিটার। তা না করে স্টকেই যদি খাটাতেন, তাহলে আজ তা বেড়ে দাঁড়াত ৭০ মিলিয়নে। সে জন্য অবশ্য দুঃখ নেই পিটারের। কিছুদিন আগে মিউজিকের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি, এমি এওয়ার্ড জয় করেছেন তিনি।
সম্প্রতি লাইফ ইজ হোয়াট ইউ মেক ইট নামে নিজের জীবনী লিখেছেন পিটার বাফেট। বাবা যে লাগাম ছেড়ে দিয়ে যেনতেনভাবে তাকে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেননি, সে জন্য বইটিতে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
নিচে লাইফ ইজ হোয়াট ইউ মেক ইট- এর খানিকটা তুলে ধরা হলো।
লাইফ ইজ হোয়াট ইউ মেক ইট
‘আমাদের বাড়িটা ছিল খামার বাড়ির মত,’ লিখেছেন পিটার বাফেট। ‘চোখ দিয়ে পানি ঝরছে, এমন অদ্ভুত আকৃতির কয়েকটা জানালা ছিল সেটার চিলেকোঠায়। দেখে মনে হবে দি এমিটেভিল হরর ছবির সেই বাড়িটার মত ওটাও কাঁদছে।’
ওয়ারেন বাফেট আজও সেই বাড়িতে থাকেন। ১৯৬৪ সাল থেকে একই নিয়মে চলছে তাঁর জীবন। প্রতিদিন নিজে ড্রাইভ করে অফিসে যান, একই পার্কিং স্পেসে পার্ক করেন এবং একই বিল্ডিংয়ে অফিস করেন। পিটারের মতে, এটা তার বাবার ‘ওয়েল ওয়র্ন গ্রুভ (বিষষ-ড়িৎহ মৎড়ড়াব)’ বা বহু ব্যবহƒত ছন্দ। তিনি একই কাজ বারবার করতে পছন্দ করেন।
পিটার লিখেছেন, তিনি ওয়ারেন বাফেটের ছেলে কি না, তা নিয়ে মানুষের মনে যথেষ্ট জল্পনা-কল্পনা ছিল। তার ঠাঁটবাটহীন সাধারণ জীবন যাপনই ছিল এর উৎস। আমার মা-বাবা বলতেন এবং বিশ্বাস করতেন আমি সব পারি। এটাই আমাদেরকে সাহায্য করেছে সবচেয়ে বেশি। সন্তানকে নিজের সাফল্যের পথ খুঁজে নেয়ার, চলার পথে হোঁচট খেলে আপনা থেকে উঠে দাঁড়ানোর মত ভালবাসা, লালন-পালন আর যোগ্য সন্মান দিয়ে গড়ে তুলেছেন আমার মা-বাবা। নগদ টাকা বা চেকের বিনিময়ে নয়।
এত পথ অতিক্রম করতে টাকা-পয়সার দিকে থেকে তো বটেই, ব্যক্তিগত দিক থেকেও অনেক কঠিন সময় পার হতে হয়েছে তাকে, লিখেছেন পিটার। নিজের বাড়ি বন্ধক রাখতে হয়েছে, প্রদর্শনীর জন্য চাদা তুলতে হয়েছে। তিনি স্বীকার করেন, অনেক সময় ঝুট-ঝামেলার হাত থেকে সহজে উদ্ধার পাওয়ার উপায়ও খুঁজতে হয়েছে তাকে। ২০ বছরে বয়সে একবার বাবার কাছে কিছু টাকা ধার চেয়েও পাননি। তখন খুব রাগ হয়েছিল। পরে অবশ্য পিটার বুঝেছেন, ওয়ারেন বাফেট তখন ঠিক কাজটিই করেছিলেন।
তিনি বলেন, ‘কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে কাজ করতে গিয়ে নিজের ভেতরের সুপ্ত ক্ষমতা সম্পর্কে জানার যে সুযোগ পেয়েছি, রাশি রাশি টাকা খরচের উপায় থাকলে যা হয়ত পেতাম না।’
একবার ছেলেদের সবাইকে ১ বিলিয়ন ডলার করে দিয়ে রীতিমত হতবাক করে দেন ওয়ারেন বাফেট। জেনসেবামূলক কাজ করতে টাকাটা দিয়েছিলেন তিনি। কাজটা কিভাবে করা যায়, তা নিয়ে অনেক গবেষণার করেছেন পিটার। তারপর অবহেলিত সম্পদের’ পিছনে পুঁজি বিনিয়োগ করেছেন। তিনি বলেন উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কিশোরীদের, বিশেষ করে উঠতি বয়সের মেয়েদের এত বেশি অবহেলার চোখে, এত বেশি বোঝা হিসেবে দেখা হয়, যা পৃথিবঅর আর কোথাও চোখে পড়েনি।
তাই স্ত্রীকে নিয়ে সারাবিশ্বের উঠতি বয়সী মেয়েদের ও নারীর ক্ষমতায়ণের জন্য নো ভো ফাউন্ডেশন (ঘড়ঠড় ঋড়ঁহফধঃরড়হ) নামে একটা অলাভজনক সংস্থা খুলেছেন পিটার। তার মতে, ‘একটা মেয়েকে সহায়তা করা মানে একটা পরিবারকে সহায়তা করা। একটা পরিবারকে সহায়তা করা মানে একটা জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করা। যদিও সমগ্র বিশ্বের সমস্যা দূর করার ক্ষেত্রে সেটা বুদ্বুদের চেয়ে বেশি কিছু হবে না।
জীবনে অনেককে, অনেক ভাষায় বলতে শুনেছি, “আপনি ওয়ারেন বাফেটের ছেলে? এত সাধারণ আপনি?”
এসব মন্তব্যকে সব সময় সৌজন্য হিসেবে নিয়েছি। কেন? কারণ তাদের “সাধারণ” কথাটার অর্থ : উপযুক্ত কাজ সবাই করতে পারে এবং অন্যদের কাজের মত সেসব গ্রহণযোগ্যতাও পেতে পারে। যে সামাজিক ও আবেগজনিত মূল্যবোধ আমাদেরকে একত্রিত করে রেখেছে, কাজ করার এই ক্ষমতা আসতে পারে একমাত্র সেখান থেকে। এসব মূল্যবোধ শিখতে হয়। অথবা আরও সঠিকভাবে বলতে গেলে ধারণ করতে হয়।
বইটির মাধ্যমে আমি বলতে চেয়েছি: মূল্যবোধই হচ্ছে সবকিছুর ভিত্তি। মূল্যবোধের তালিকায় আমি সবচেয়ে আগে ট্রাস্ট বা আস্থাকে বসাতে চাই। ব্যাপক অর্থে এটা হচ্ছে সেই আস্থা, যাতে বোঝায় পৃথিবী একটা ভাল জায়গা। এমন জায়গায় বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করা যায়। আপনি যদি পৃথিবীতে ভালভাবে বেঁচে থাকতে চান, তাহলে এই আস্থা খুবই কার্যকর হতে পারে।
পৃথিবীর প্রতি আস্থাকে মানুষের প্রতি আস্থা থেকে আলাদা করা যায় না। আমরা মানুষ। তাই যে যত বিপথগামীই হই না কেন, আদি-অকৃত্রিমভাবে একে অন্যের শুভাকাক্সক্ষী। কারণ মানুষ সঠিক কাজটিই করতে চায়। জীবনের চলার পথে কখনও হয়ত বেপথে চলে যায় সে। অন্যায্য কাজ করে বসে। কিন্তু সেটা অস্বাভাবিক। অনেকটা নিজের সাথে প্রতারণা করার মত।
সবাই অবশ্য সেরকম ভাবে না। অনেকে ভাবে মানবজাতি জন্মগতভাবেই মন্দ। মিথ্যা বলা আর প্রতারণা করা তার স্বভাব। এরকম যারা ভাবে, তাদের জন্য দুঃখ হয়। বন্ধুত্ব বজায় রাখা, সবাইকে সন্দেহের তালিকায় না রেখে তাদের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া, তাদেরকে ভালবাসতে পারা, এতকিছু একযোগে চালিয়ে যেতে তাদের নিশ্চয়ই সমস্যা হয়।
যা মানুষের মজ্জাগতÑসেই আস্থাই হচ্ছে তার অন্তরে লালিত মূল্যবোধ। আমাদেরকে গোটা বিশ্বকেই নিজের বাড়ি ভাবতে শেখায় এই বোধ। এটা আসে কোত্থেকে? পরিবারের একের প্রতি অপরের ভালবাসা থেকে। এবং সেখান থেকেই এই বোধ ছড়ায়।
আমি প্রায় দিনই একা একা নানাবাড়ি যেতাম। নিজেদের বাড়ি থেকে বের হওয়ার এবং ও বাড়িতে পৌঁছার সময়, দু’বারই আমাকে জড়িয়ে ধরে আদর করা হত। আমি গেলেই নানি কোন আইসক্রিম বানিয়ে খাওয়াতেন। নানা জানতে চাইতেন, স্কুলে নতুন কি শিখেছি। প্রতিবেশীরা আমাকে দেখে হাত নাড়ত, হর্ন বাজাত।
আমার বাড়ির মত পরিবেশ সব বাড়িতে ছিল না। যাদের বাড়িতে ছিল না, তাদেরকে আস্থাশীল হতে আমার তুলনায় অনেক বেশি সময় লেগেছে। আমি আসলে বোঝাতে চাইছি, যা কিছু আমাকে পৃথিবীর প্রতি, মানুষের প্রতি আস্থাশীল হতে শিখিয়েছে, তার সাথে নগদ টাকার বা প্রয়োজনীয় এটা-সেটার কোনো সংশ্রব ছিল না।
আমাদের বাড়ি কতবড়, সেটা বিষয় ছিল না। বিষয় ছিল আমার প্রতি বাড়ির সবার ভালবাসা। আমাদের প্রতিবেশী ধনী না গরীব, সেটাও বিষয় ছিল না। বিষয় ছিল এক প্রতিবেশীদের সাথে অন্য প্রতিবেশীর সম্পর্ক, যোগাযোগ কেমন। এগুলোই আমাকে মানুষের প্রতি আস্থাশীল হতে শিখিয়েছে। তাদের ওপর বিশ্বাস রাখতে শিখিয়েছে।
আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছে নগদ টাকার ফিতা দিয়ে পৃথিবীকে না মেপে স্নেহ-ভালবাসার আলিঙ্গন, আস্থা, আইসক্রিম আর বাড়ির কাজে সহযোাগিতা ইত্যাদির ফিতা দিয়ে মাপতে।