স্বপ্নের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে নানা রকম। সেসব ব্যাখ্যা বা সংজ্ঞা বিজ্ঞানীদের ঝোলাতেই থাক। আজ একজন স্বাপ্নিক ব্যক্তিত্বের সংজ্ঞা শোনা যাক। স্বপ্নের মত স্বপ্ন দেখতে পেরেছিলেন বলেই যিনি খুব সাধারণ অবস্থা থেকে ভারতের রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। মিসাইলম্যান খ্যাত এ পি জে আবদুল কালাম। তার ভাষায়, ‘স্বপ্ন সেটা না, যেটা মানুষ ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেখে। স্বপ্ন সেটাই যা মানুষকে ঘুমোতে দেয় না।’ এটাই ‘প্রকৃত স্বপ্ন’। সাফল্যের শুরু এই রকম ‘প্রকৃত স্বপ্ন’ দিয়েই। এরকম স্বপ্নই মানুষকে নিয়ে যায় প্রাপ্তির স্বর্ণচূড়ায়।
পৃথিবীতে যারাই সফল হয়েছেন তারাই স্বপ্ন দেখেছেন। কল্পনা করেছেন (তবে আকাশ কুসুম কল্পনা নয় অবশ্যই)। তারা বিশ্বাস করেছেন যে তাদের পক্ষে ওই কাজটি করা সম্ভব। মনের চোখে দেখেছেন যে তারা কাজটি করতে পেরেছেন। এই বিশ্বাস, এই কল্পনা, এই স্বপ্নই তাকে নিয়ে গেছে অনেক ওপরে। স্বপ্ন নিয়ে অনেকের মধ্যে ভুল ধারণা আছে যে, ওটা অলস মানুষের কাজ। বাস্তবিকই ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখাটা অলস মানুষেরই কাজ। অনেকটা সেই ডিমওয়ালার গল্পের মত। যে এক ঝুড়ি ডিম নিয়ে হাটে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে গাছের ছায়ায় জিরোতে গিয়ে সে ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে আবার স্বপ্নও দেখে ফেলল। কী স্বপ্ন? সে এসব ডিম বিক্রি করে অনেক টাকা লাভ করেছে। সেই টাকা দিয়ে সে অনেক মুরগি কিনেছে। এভাবে অল্প দিনেই সে অনেক ধনী হয়ে গেছে। অহংকারে মাটিতে তার পা পড়ে না। ধনী হওয়ায় সে অনেকগুলো বিয়ে করেছে। তার অনেক বাচ্চা হয়েছে। বাচ্চারা তাকে বিভিন্ন সময় বিরক্ত করছে। একদিন সে রেগে গিয়ে বিরক্ত হয়ে এক বাচ্চাকে দিল এক লাথি। বাস্তবেও সে পা ঝাড়া দিল প্রচণ্ড জোরে। লাথি লাগল ডিমের ঝুড়িতে। সব ডিম মাটিতে পড়ে ভেঙে একাকার। এই রকম অলস মানুষের স্বপ্ন বা আকাশ কুসুম কল্পনা কোন সাফল্য প্রসব করতে পারে না। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এরকম স্বপ্ন দেখা মানুষের জীবনে ব্যর্থতা আসে সহজে।
সাফল্যের জন্য প্রয়োজন সেই স্বপ্ন যেটার ভেতরে থাকে তীব্র তাড়না-প্রবল উদ্দীপনা। যে উদ্দীপনা ওই স্বাপ্নিক মানুষকে সারাক্ষন তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। স্বপ্নের জন্য যে কোন ত্যাগ স্বীকার করতে তিনি প্রস্তুত থাকেন। ইতিহাস বলে, ইতিহাস বদলে দেয়া সব সফল মানবরাই ছিলেন স্বপ্নতাড়িত। যীশুর আত্মদান থেকে হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর ত্যাগ, মাও সে তুং এর লং মার্চ কিংবা কিউবার বিপ্লব- এসকল ঐতিহাসিক উপাদান ও ঘটনা স্বপ্নতাড়নারই বহির্প্রকাশ। ইতিহাস বলে, ক্রীড়া বা সাহিত্য- রাজনীতি বা অর্থনীতি- যুদ্ধ বা প্রেম প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বপ্নতাড়িত মানুষরাই সাফল্যের শীর্ষে উঠেছেন। বিশ্বকে বদলে দিয়েছেন।
তবে তাদের স্বপ্ন কিন্তু এলোমেলো কিছু ছিল না। স্বপ্নের ভেতর লক্ষ্য ছিল সুস্পষ্ট। সুস্থির। এবং সে লক্ষ্যে তাদের আস্থাও ছিল অবিচল। তাদের দেখা স্বপ্ন শুধু দেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তাদের অনুভবেও ছিল সে স্বপ্নের অনুরণন। যেমন নেলসন ম্যান্ডেলা। প্রায় তিন দশক কারাগারে ছিলেন বন্দী। কারাগারে বসে তিনি স্বপ্ন দেখতেন মুক্ত দক্ষিণ আফ্রিকার। এই স্বপ্নই তাকে উজ্জীবিত রেখেছিল দীর্ঘদিন। তিনি ভেঙে পড়ার হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন। তারপর মুক্ত হয়ে পূর্ণ শক্তি নিয়ে পরিপূর্ণ উদ্যম নিয়ে নেমে পড়েছিলেন কাজে। আলোচনার টেবিলে শ্বেতাঙ্গদের পরাজিত করে কৃষ্ণাঙ্গ শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
প্রকৃত স্বপ্ন মানুষকে কর্মমুখি করে, কর্মবিমুখ নয়। উল্টোদিক থেকে বলা যায়, মানুষের কাজই প্রমাণ করে তার স্বপ্ন কতটা জোরদার, কতটা দৃঢ়। কর্মহীন প্রার্থনা যেমন কবুল হয় না তেমনি কর্মহীন স্বপ্নও কিছু দিতে পারে না। কারণ সেটা প্রকৃত অর্থে স্বপ্নই নয়। একজন শিক্ষার্থী যদি দাবি করে সে ক্লাশে প্রথম হতে চায় কিন্তু ঘুম বা কার্টুন কিংবা কমিক বই অথবা কোন সিরিয়াল কোন কিছুই বাদ না দেয় তাহলে কি তার দাবি বিশ্বাসযোগ্য হয়? তার স্বপ্ন আসলে নিছকই কল্পনা। তার দাবি নিতান্তই মৌখিক দাবি, অন্তরের বিশ্বাস নয়। আর যে স্বপ্ন বিশ্বাস করা যায় না সে স্বপ্ন বাস্তবায়নও করা যায় না। সাফল্যের জন্য তাই স্বপ্ন দেখার আগেই স্বপ্নটাকে মনের গভীর থেকে বিশ্বাস করতে হবে। নিজেকে নিজের সাহস দিতে হবে। নচিকেতার সেই গানের মত-‘স্বপ্ন দেখতে হলে, স্বপ্ন দেখার সাহস চাই’। স্বপ্ন দেখার সাহস ও সার্মথ্য থাকলে স্বপ্নের সাথে নিজেকে একাত্ম করে ফেলা যায়। স্বপ্নকে শয়নে জাগরণে সব সময় নিজের ভেতর নিয়ে আসতে পারলে, সকল ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করতে পারলে সেটাই হয়ে ওঠে সফলতার জননী। সেই স্বপ্নই স্বপ্নবাজ মানুষটিকে দিয়ে কাজ করিয়ে নেয়। খুব স্বতস্ফূর্তভাবে সে নীরবে কাজ করে যেতে থাকে, স্বপ্ন অর্জনের লক্ষ্যে।
স্বপ্ন কত রকম ভাবে কত কিছু যে দিতে পারে তার কোন ইয়ত্তা নেই। একজন বেকার যুবক যেমন চাকরি পেতে পারেন বা কোন ব্যবসা শুরু করে তাতে উন্নতি করতে পারেন কিংবা বিদেশ যেতে ইচ্ছুক ব্যক্তি পেতে পারেন ভিসা; তেমনি বিয়ে করতে আগ্রহী ব্যক্তির ভাল বিয়ে হওয়া অথবা নিজের ব্যক্তি ইমেজ বাড়াতে আগ্রহী কারও ব্যক্তিত্বের উন্নয়ন, ধূমপান বা কোন বদভ্যাস ছেড়ে দেয়া কিংবা বিশেষ কোন গুণ অর্জন করা; খুব সাধারণ অবস্থা থেকে খ্যাতির শীর্ষে ওঠা- সবই সম্ভব যদি স্বপ্নটি হয় প্রকৃত স্বপ্ন। স্বপ্ন দিতে পারে একটি পরাধীন জাতিকে স্বাধীনতা এনে দিতে। বাংলাদেশই এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। গত শতাব্দীর সত্তর দশকের আগে থেকেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের আপামর জনসাধারণ যে সম্মিলিত স্বপ্ন দেখেছিলেন তারই বাস্তব রূপ আজকের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। হোসে মার্তির সেই কবেকার স্বপ্ন আজ লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে সত্য হয়ে জ্বলে উঠছে। জেগে উঠছে আফ্রিকাও। স্বপ্নই যুগে যুগে মানুষকে দিয়েছে উন্নততর জীবনের দিশা। দেখিয়েছে বৈষম্য থেকে সাম্যে যাওয়ার পথ। বর্বরতার অন্ধকার ভেদ করে নিয়ে এসেছে মানবতার আলো।
স্বপ্ন যে শক্তিশালী তার কারণ কী? স্বপ্ন দেখলেই কেন সাফল্যে বা লক্ষ্যে পৌঁছানো যায়? প্রকৃত রহস্য হচ্ছে, সত্যিকারের স্বপ্ন গেঁথে যায় মস্তিষ্কে। ক্রমাগত সে স্বপ্নের চর্চা মস্তিষ্কে স্থায়ী ছাপ ফেলে দেয়। মস্তিষ্ক সেটাকেই সত্যি বলে ভাবতে শুরু করে এবং সেটাকে বাস্তবে পরিণত করার জন্য কর্মকাঠামো পাল্টে ফেলে। মস্তিষ্কের এই পরিবর্তিত কর্মকাঠামোই প্রয়োজনীয় সকল কাজ তাকে দিয়ে করিয়ে নেয়। সহজ একটা উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝানো যেতে পারে। একজন চোর স্বপ্ন দেখতে থাকল যে সে সাধু হয়ে গেছে। প্রকৃত স্বপ্নের সব শর্ত যদি পূরণ হয় তাহলে সে স্বপ্ন নিশ্চিতভাবে তার মস্তিষ্কের কর্মকাঠামো পাল্টে দেবে। এরপর থেকে সে আর চুরি করার প্রতি আগ্রহ পাবে না। চুরি করতে গেলে ভেতর থেকে বাধা আসবে। এবং এক সময় সে চৌর্যবৃত্তি ছেড়ে দেবে। তারপর . . . .
কিভাবে দেখা যায় সত্যিকারের স্বপ্ন? যে স্বপ্ন নিয়ে যাবে সাফল্যের দোরগোড়ায়! সেরকম স্বপ্ন দেখতে হলে মাথাটাকে ঠাণ্ডা করে ভাবতে হবে। নিজের লক্ষ্যকে সুস্পষ্ট করতে হবে। নিজের কাছে আগে পরিস্কার হতে হবে আদৌ ওই স্বপ্নকে আমি পূরণ করতে চাই কিনা। নিজেকে বারবার প্রশ্ন করতে হবে। নিজের ভেতরে ডুব দিতে হবে। ডুব দিয়ে দেখতে হবে ‘অন্তরতম আমি’ কী চায়। বুঝতে হবে অবচেতন মন স্বপ্নকে গ্রহণ করছে কিনা। স্বপ্নকে ভালবাসতে পারছে কিনা। নিজের সাথে বোঝাপড়া সম্পন্ন করতে হবে। যেমন বোঝাপড়া সম্পন্ন করেছিলেন চে গুয়েভারা, ফিদেল ক্যাস্ত্রোর সঙ্গে। দীর্ঘক্ষণ ফিদেলের সাথে আলাপচারিতা-তর্ক বিতর্কের পর চে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনিও যাবেন কিউবার সংগ্রামে। যদিও তিনি জন্মগতভাবে আর্জেন্টিনার অধিবাসী। এবং এ সিদ্ধান্ত নেয়ার পর বিপ্লবের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য তিনি নিজের জীবন বাজি রেখেছিলেন। এর পরেরটুকু তো ইতিহাস। সাফল্যের জন্য নিজের সাথেও ঠিক এরকম বোঝাপড়া করে নিতে হয়। নিজের স্বপ্ন নিয়ে। স্বপ্নটি যে পূরণ করা সম্ভব সে বিষয়ে যুক্তি তর্ক দিয়ে নিজেকে বোঝাতে হবে। যৌক্তিকতায় পূর্ণ আস্থা থাকতে হবে। তারপর মনের চোখে দেখতে হবে। খুব ভাল হয় যদি শান্ত নির্জন কোন স্থানে নিশ্চুপ নীরব থেকে নিয়মিত স্বপ্নটাকে অবলোকন করা যায়। আত্মনিমগ্ন অবস্থায় বা ধ্যানাবস্থায় স্বপ্নটাকে বারবার দেখে নিজের মস্তিষ্কে গেঁথে দিতে পারলেই কেল্লা ফতে! (আত্মনিমগ্ন অবস্থায় বা ধ্যানাবস্থায় স্বপ্নকে মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দেয়া খুব সহজ) বাকি কাজ মস্তিষ্ক নিজ উদ্যোগেই করে নেবে, সহজ সাবলীলভাবে।
জীবনে প্রাপ্তিযোগ সবাই চায়। সাফল্য আকাঙ্খা করে সবাই। তবু সাফল্যের পথে যাত্রা শুরু করা হয় না অনেক সময়ই। শুধু ছোট্ট কিন্তু অসাধারণ একটি স্বপ্নের অভাবে। আবার স্বপ্নকে জিইয়ে রাখতে না পারার ফলেও অনেক সম্ভাবনাময় মানুষের মেধা বা প্রতিভার বীজ মহীরুহ হতে পারে না। তাই স্বপ্নকে প্রকৃত স্বপ্নে, সত্যিকারের স্বপ্নে রূপান্তরিত করার কোন বিকল্প নেই। নিদারুণ দূষিত পরিবেশেও এই স্বপ্নই মানুষকে জোগায় বাঁচার বিশুদ্ধ বাতাস- নির্ভেজাল অক্সিজেন। চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে এই স্বপ্নই দেয় লড়াই করার দুর্দাদন্ত সাহস। অতএব স্বপ্ন দেখতে হবে; স্বপ্ন দেখে যেতে হবে যতদিন না স্বপ্ন পূরণ হয়।