শিল্পী সুসান হেলার ভ্রমণ সর্ম্পকে বলেছেন,“ ভ্রমণের আগে আপনার সব জামাকাপড় আর টাকা পয়সা এক জায়গায় করুন। তারপর সেখান থেকে অর্ধেক কাপড় আর দ্বিগুণ টাকা নিয়ে যাত্রা করুন।” ম্যালার হ্রদ ও সল্টসাগর দিয়ে ঘেরা বিশাল জায়গা জুড়ে দ্বীপমালার শেষ দ্বীপটি দেখার যখন সুযোগ এলো তখন এক বস্ত্রেই বেড় হয়ে গিয়েছিলাম। দ্বীপমালার শেষ দ্বীপটির বাংলা প্রতিশব্দ ‘বালির বন্দর’। মরমী গায়ক আব্বাস উদ্দীনের একটি ভাওয়াইয়া গানে ‘চিলমারির বন্দর’ এর কথা উল্লেখ ছিল। ‘চিলমারির বন্দর’ আছে কিনা জানা নেই তবে ‘বালির বন্দর’ আছে সুইডেনেই। বালি আর পাথর দিয়ে ঘেরা বলেই হয়তো দ্বীপটির নাম ‘সান্দহাম’ বা বালির বন্দর।
স্যাটেলাইট থেকে ষ্টকহোমকে দেখলে দেখা যাবে বৃহত্তর ষ্টকহোম জলের উপর ভাসছে।
ছোট বড় চৌদ্দটি দ্বীপ নিয়ে গড়ে উঠেছে ষ্টকহোম। দ্বীপ গুলো একটি অপরের সঙ্গে একাধিক সাঁকো দিয়ে সংযুক্ত। চৌদ্দটি দ্বীপ নিয়ে বৃহত্তর ষ্টকহোম গঠিত হলেও ছোট বড় মিলিয়ে দ্বীপমালায় দ্বীপ রয়েছে আরো প্রায় বারশ। এই দ্বীপ গুলোর কোন কোনটি একেবারেই নির্জন জনশূণ্য। তবে প্রায় সব গুলো দ্বীপেই বোট নিয়ে যাওয়া যায়। এই বিশাল দ্বীপপূঞ্জ বা দ্বীপমালার শেষ দ্বীপটি ‘সান্দহাম’। ষ্টকহোম থেকে সান্দহামের দূরত্ব প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার। এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয় দ্রুতগামী বোটে। দ্বীপমালার দ্বীপ গুলো পাড়ি দিয়ে জলের উপর তরঙ্গ তুলে যাত্রী নিয়ে বোট এসে ভীরে সবুজ বনবিথী আর পাইন সমৃদ্ধ সান্দহামে। আকাশ পথে হেলিকপ্টারেও আসা যায তবে তা ব্যায় সাপেক্ষ। দ্বীপের পর দ্বীপ পেছনে ফেলে দীর্ঘ আড়াই ঘন্টা পর যখন বোট সান্দহামের কোলে এসে ভীরে তখন চোখ জুড়ে নামে মনমুগ্ধকর মুগ্ধতা। সান্দহামের পর আর কোন স্থলভূমি নেই, এখান থেকেই শুরু উত্তাল বাল্টিক সাগর।
জেরো পয়েন্ট ওয়ান স্কোয়ার মাইলের দ্বীপটির জনসংখ্যা মাত্র একশত।
তবে গ্রীষ্মকালে এই সংখ্যা বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় দ’ুথেকে তিন হাজার। এছাড়া প্রতি গ্রীষ্মে সান্দহামকে দেখতে আসেন প্রায় এক লক্ষের উপর দর্শনপ্রার্থী ও পর্যটক। সান্দহাম ইতিহাসের পাতায় উঠে আসে বারশ আশি সালে। যখন রাজা মাগনুস বর্নলক দ্বীপটি ষ্টকহোম সান্টক্লেয়ার র্গীজার সন্ন্যাসীদের দান করেন।
সকাল সাড়ে নয়টায় ষ্টকহোম থেকে ছাড়বে দ্রুতগামী বোট।
ম্যালার আর সল্টসাগরের উপর দিয়ে মাঝে আরো দুটি দ্বীপ থেকে কিছু যাত্রী উঠিয়ে আর কিছু যাত্রী নামিয়ে দুপুর বারটায় সান্দহামে এসে পৌঁছে বোট। দিনটি রৌদ্রউজ্জ্বল। সাগরের হিমেল হাওয়ায় পাইনের সবুজ পাতা গুলো পতাকার মত পত পত করে উড়ছে। বন্দরের কাছেই বেশ কয়েকটি স্থাপনা দোকান, হোটেল, রাজকীয় ইয়ট ক্লাব, পোষ্ট অপিস, পর্যটন কেন্দ্র। ক্লাবের পাশেই জলের উপর রাজহংসীর মতো গলা উচিয়ে অনেক গুলো ইয়ট দাঁড়িয়ে। হোটেল ও রেষ্টুরান্ট গুলোয় লোকে লোকারণ্য। আমাদের লাঞ্চের ব্যবস্থা করা হয়েছিল ষোলশ শতাব্দীর তৈরী দ্বীপের সবচেয়ে পুরানো পান্থনিবাসে। সতেরশ শতকে রাশান জলদস্যুরা সান্দহাম আক্রমন, লুটতরাজ আর অগ্নিসংযোগ করলে অলৌকিক ভাবে পান্থনিবাসটি রক্ষা পায়। লাঞ্চ বেলা একটায়। লাক্স মাছের ঝোল, ঝোলের ভেতর কুঁচি কুঁচি চিংড়ি, পেয়াজ,গাজর মটরশুটি, আলু- খেতে মন্দ লাগলোনা। সে সঙ্গে রুটি, পুডিং আর কফি দিয়ে লাঞ্চ সারা হল। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম জল থেকে একটু উপরে শূন্যে বাতাশে ভর দিয়ে একটি হেলিকপ্টার দাঁড়িয়ে। হেলিকপ্টার থেকে দড়ি বেয়ে এক জোড়া তরুন-তরুনী জরাজরি করে ধীরে নামছে জলের উপর । জানা গেল জেমস বন্ড জাতীয় কোন ফিল্মের শুটিং হচ্ছে।
লাঞ্চের পর অফুরন্ত সময়।
ফেরার বোট বেকেল সাড়ে চারটায়। এ’সময়ের মধ্যে দ্বীপটি ঘুরে দেখে নেয়া যায়। দ্বীপে তেমন কোন রাস্তা নেই। এ’মাথা থেকে ওমাথা যাবার পথটি কাঁচা। মটর সাইকেল ছাড়া মটর গাড়ি চোখে পরলোনা। হেটেই রওয়ানা দিলাম দ্বীপের ওমাথায়। ওমাথায় আছে মনোরম সীবিচ। সূর্য আর সাগরস্নান করার জায়গা। বোটে আসা স্বল্পবসনা অনেককেই দেখা গেল সীবিচের দিকে তোয়ালে আর ছোট ঝুড়ি হাতে ঝুলিয়ে যেতে। দ্বীপের মাঝ খানটায় শুধু বালি আর বালি। কোন কোন জায়গায় বালির উপর ঘাস গজাতে শুরু করেছে। বালি ছাড়া উচু নীচু জায়গা গুলোতে বনলতা আর পাইনের সারি। ছোট ছোট ঝোপঝাড়, মাঝে মাঝে কাঠের বেঞ্চ পাতা, বাতাশে খেলে বেড়ানো পাইন পাতার নীচে বসে দ্বীপকে উপভোগ করার ব্যবস্থা। এমন একটা বেঞ্চে মিখাইল একা বসে। মিখাইল আমার সহকর্মী, আমরা একই বোটে এসেছি। ওর হাতে কয়েকটি বিয়ারের ক্যান আর ক্যান্ডীর ঠোঙ্গা। ক্যান্ডী আর বিয়ার ছাড়া ও যেন আর কিছু চেনেনা। মিখাইলই আমায় আটলান্টিকের শেষ স্থলভূমি লোফোসেন দ্বীপ গুলোর কথা বলেছিল। ওখানেই দেখা পেয়েছিলাম বিষ্ময়কর আলো আরোরা, যা দেখার বামনা ছিল বহুকাল। মিখাইলকে ছেড়ে হাটতে হাটতে সাগরের উপর পাথরের ক্লীফে এসে দাঁড়ালাম। বিরাট এক জাহাজী নোঙ্গর পাথরের উপর শুয়ে। ওটা পেরিয়ে পাইনের সারি। ক্লীফের একটা অংশ খারা হয়ে নেমে গেছে জলের ভেতর। সাগরের ঢেউ এসে ভেঙ্গে পরছে ক্লীফের উপর। পাইন পাতার ফাঁকে বিশাল বাল্টিক। নীল জলের উপর শেষ বিকেলের আলো।
অজানাকে জানার যে অনুভূতি সে অনুভূতি আমাকে ঘর থেকে টেনে এনেছে বারবার।
জাপানি একটি প্রবাদ আছে,‘বাঁশের নল দিয়ে পুরো আকাশ দেখা যায়না’। আকাশ দেখতে হয় খোলা চোখ দিয়ে। শুধু আকাশ নয় নীল সাগরও। সাগর দেখতে আমি এসে দাঁড়িয়েছি ক্লীফের উপর, আপনি আসবেন কি?

লিয়াকত হোসেন
সুইডেন, ষ্টকহোম