কোথায় গেল? অন্ধকারে বিছানার ডানদিকটা হাতড়াল লাইজু কাঁপা হাতে। না, এদিকে নেই। তাহলে কি বাঁদিকে? সময় নিয়ে ওদিকটা হাতড়াল। না, ওদিকেও নেই। একটু অধৈর্য হয়ে উঠল লাইজু। অবশেষে বালিশের পাশ থেকে উদ্ধার করল জিনিসটা। কাগজের প্যাকেট -তার মধ্যে আছে ছোট্ট একটা জামা। নতুন কাপড়ের পরিচিত একটা মিষ্টি গন্ধ বের হচ্ছে ওটা থেকে। বুক ভরে সেই গন্ধ টেনে নিল সে লম্বা দমের সাথে। আহ্!
ইদানীং খুব ভুলো মনা হয়ে গেছে লাইজু বেগম! কিছু মনে রাখতে পারে না। জিনিস রাখে একদিকে, খোঁজে আরেকদিকে। কপাল কুঁচকে উঠল তার। ভুল হয়েছে? নাহ, কোনো ভুল হয়নি। স্পষ্ট মনে আছে লাইজুর, কাল রাতে ঘুমানোর আগে জামাটা খুব যতেœর সাথে বাঁ দিকেই রেখেছিল সে। বুকের কাছে। কি করে আরেকদিকে গেল সেটা? হয়ত নিজেই ঘুমের মধ্যে…
আচমকা অদৃশ্য মুগুরের ঘা খেল লাইজু। স্তব্ধ হয়ে বসে থাকল সুকঠিন সত্যটা উপলব্ধি করতে পেরে। বিশ্বাস করতে মন চায় না, তবু না করে উপায় নেই Ñ শুধু জামাটার কথাই নয়, পুরো একটা দিনের স্মৃতিই মুছে গিয়েছিল তার মন থেকে।
আসলে কাল রাতে নয়, পরশু রাতে জামাটা বাঁদিকে রেখে ঘুমিয়েছিল সে। মেয়ের বাসায়। একমাত্র মেয়ে ঋতুর প্রথম সন্তান, হৃদির প্রথম জন্মদিন উপলক্ষে জামাটা কিনেছে লাইজু। অনেক খোঁজাখুঁজি পর এই একটামাত্র জামাই পছন্দ হয়েছিল। খুব আশা ছিল জন্মদিনের দিন সকালে প্রথমে এই জামাটা পরাবে আদরের নাতনীকে।
কিন্তু… পাঁজর কাঁপানো একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল বুক চিরে। ভাঁজ করা জামাটার ওপর আলতো করে হাত বোলাল লাইজু বেগম। আজই নাতনির জন্মদিন। অথচ…
নিষ্ঠুর নিয়তি ঠিক সময়মতই তাকে নাতনির কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিল। আজীবনের কপালপোড়া লাইজু বেগমের দুর্ভাগ্যের রথ গতকালই শেষবারের মত বাঁক নিয়ে তাকে পৌঁছে দিয়ে গেছে এই বৃদ্ধ নিবাসে। তার জীবনের সমস্ত ছন্দ থামিয়ে দিয়েছে।
ঝিম মেরে বসে থাকল সে। আশপাশের অনেকের ঘুম ভেঙে গেছে। ফজরের নামাজের জন্য উঠে পড়তে শুরু করেছে একে একে। তাদের নড়াচড়ার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু লাইজু নড়ল না। কোনোদিক তাকালও না। পায়ের কাছে একটা জানালা আছে। ওটা দিয়ে একদৃষ্টে কালচে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকল সে। মনটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।
জোতদার বাবার তৃতীয় পরিবারের একমাত্র সন্তান লাইজু। গ্রামের স্কুলে কোনোমতে ক্লাস সিক্স পর্যন্ত পড়ার সুযোগ হয়েছিল। তারপর বাবার মৃত্যু হলে প্রথম পক্ষের চার ছেলে গায়ের জোরে যাবতীয় সহায়-সম্পত্তি দখল করে নেয়। লাইজু বা তার মায়ের ভাগ্যে জোটেনি কিছুই। নিরূপায় মা লাইজুকে নিয়ে নিজের বাপের বাড়িতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। সেখানে তিনবেলা খাবার জুটত বটে, কিন্তু উদয়াস্ত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতে হত মা-মেয়েকে। এভাবে দিন গড়াতে থাকে। দেখতে দেখতে বিয়ের উপযুক্ত হয়ে ওঠে লাইজু। মেয়ের কোনো ব্যবস্থা করতে না পেরে তার মা নীরবে চোখের পানি ফেলে।
এক সময় তার কান্নাকাটিতে ভাইদের দয়া হয়, ভাগ্নির জন্য পাত্র খুঁজতে শুরু করে তারা। কিন্তু পাত্র পাওয়া যায় না। এমনিতে লাইজু দেখতে-শুনতে মোটামুটি হলেও গায়ের রং ছিল চাপা। তারওপর বাপ মরা মেয়ে, তাকে বিয়ে করলে যৌতুক পাওয়া যাবে না। কাজেই লাইজুর দুঃখের নিশি আর ফুরায় না। মেয়েকে পাত্রস্থ করার দূরাশা নিয়ে অপেক্ষা করতে করতে একদিন তার মা-ও চোখ বোঁজে। আরও কয়েক বছরের চেষ্টার পর সবাই যখন আশা ছেড়ে দিল, ঠিক তখনই লাইজুর বিয়ের ফুল ফোটে।
গ্রামে বোনের শ্বশুর বাড়িতে বেড়াতে আসা এক মাঝবয়সী লোকের চোখে পড়ে যায় লাইজু। লোকটা ঢাকায় ছোটোখাটো চাকরি করে। বছর চারেক আগে স্ত্রী মারা গেছে। তারপর আর বিয়ে করেনি। নিঃসন্তান। নাম ভোলা মিয়া। লাইজুকে দেখে এবং তার বৃত্তান্ত শুনে ওকে বিয়ে করার ইচ্ছে হয় তার। শেষ পর্যন্ত বিয়েটা হয়ে গেল।
প্রায় দ্বিগুণ বয়সী স্বামীর সাথে ঢাকায় চলে এল সে। মধুবাগে দেড় রুমের টিনশেড ভাড়া বাসায় শুরু হলো সংসার জীবন। এক বছর পর ঋতুর জন্ম হয়। লাইজুর একমাত্র সন্তান। বুড়ো বয়সে সুন্দর, ফুটফুটে মেয়ের বাবা হতে পেরে আনন্দে পাগল হওয়ার দশা হলো ভোলা মিয়ার। ওকে নিয়ে নানান স্বপ্ন দেখতে শুরু করে দিল সে। তার কাণ্ড দেখে মাঝেমধ্যে হাসত লাইজু।
মানুষ হিসেবে যথেষ্ট ভাল ছিল ভোলা মিয়া। খুব সহজ-সরল আর ধৈর্যশীল ছিল। লাইজুর ভুল-ত্র“টি হলে ধৈর্য ধরে বোঝাত। কখনও বকাঝকা করত না। স্ত্রীর কখন কি দরকার সেদিকে নজরও থাকত তার। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে তা পূরণের সাধ্যমত চেষ্টা করত। মোট কথা সবদিক থেকে বিবেচনা করলে খুবই ভালো মানুষ ছিল সে।
অনেকে বলে ভালো মানুষরা নাকি বেশিদিন বাঁচে না। সৃষ্টিকর্তার ভালো মানুষদের বেশি প্রয়োজন পড়ে, তাই তাদেরকে অসময়ে তুলে নিয়ে যান তিনি। এ ক্ষেত্রেও তাই ঘটে গেল একদিন। লাইজুর ভালো মানুষ স্বামীটিকেও অসময়ে তুলে নিলেন তিনি। ঈদের তিনদিন আগে বেতন পেয়ে মেয়ের সখ পূরণ করতে একটা লাল শাড়ি কিনে বাসায় ফিরছিল ভোলা মিয়া। ওই সময় চরম লোড শেডিং চলছিল। রাত আটটার দিকে অন্ধকার গলির মুখে মহল্লারই একদল ছোকরা ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে গেল সে। সহজ-সরল মানুষটা বিপদ ঠিকমত বুঝে উঠে টাকা দিতে সামান্য দেরি করে ফেলেছিল, এই অপরাধে ছিনতাইকারীরা তাকে ছুরি দিয়ে মোরব্বা কাচা করে রেখে যায়। লাইজুর আর ঋতুর সমস্ত সাধ-আহ্লাদের ইতি ঘটে।
ভোলা মিয়া প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করত। তার মৃত্যুতে কোম্পানির পক্ষ থেকে কিছু নগদ সাহায্য পাওয়া গিয়েছিল। সেই টাকায় ঋতুকে কোনোমতে এসএসসি পাশ করায় লাইজু। বাসার কাছের এক কলেজে ভর্তি করে দেয়। এরমধ্যে সংসারের চাকা সচল রাখতে সেলাইয়ের কাজ হাতে নিতে হয়েছে তাকে। পাড়ার মেয়েদের জামা-কাপড় সেলাইয়ের কাজ। কাজটা মোটামুটি ভাল জানত বলে কাজও ভালই পেত। আয় যা হতো, তাতে মা-মেয়ের দিন চলে যেত কোনোমতে।
এমনিতে কোনো সমস্যা ছিল না। তারপরও সমস্যা একটা দেখা দিল। কারণ ঋতুর সৌন্দর্য্য। পাড়ার কিছু উঠতি মাস্তান আগে থেকেই পিছু লেগে ছিল ওর। কলেজে আরও খারাপ অবস্থা হলো। দিনে দিনে পরিস্থিতি এমন ঘোরাল হয়ে উঠল যে মেয়েটার ঘর থেকে বের হওয়াই বন্ধ হওয়ার অবস্থা। চোখে আঁধার দেখতে লাগল লাইজু বেগম। আক্ষরিক অর্থই নয় শুধু, বাস্তবেও। গ্লুকোমা ছিল তার, চোখের মরণ ব্যাধি। যার একমাত্র পরিণতি তিলে তিলে অবধারিত অন্ধত্বের দিকে এগিয়ে যাওয়া। ডাক্তার ধরতে না পারায় চিকিৎসা হয়নি, কাজেই দ্রুত ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হতে লাগল তার দৃষ্টি। মেয়ের দুশ্চিন্তায় তা যেন আরও বহুগুণ বেড়ে গেল।
আযান শুরু হয়ে গেছে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মশারী থেকে বের হলো লাইজু বেগম। ওজু করে নামাজে দাঁড়াল। কিন্তু হচ্ছে না। বারবার আনমনা হয়ে পড়ছে সে, দু’ চোখ ভরে উঠছে পানিতে। ঘন ঘন পানি মুছতে গিয়ে ভুল হয়ে যাচ্ছে। অনেক কষ্টে নামাজ শেষ করে ওখানেই বসে থাকল লাইজু। বুকের ভেতরে কোথায় যেন চিন চিনে একটা ব্যথা। ঠিকমত শনাক্ত করাও যায় না, আবার সহ্য করাও যায় না। কাউকে সে বলে বোঝাতে পারবে না এ কিসের ব্যথা। কেন তার অন্তরটা গুমরে গুমরে কাঁদছে।
পুব আকাশে খুব উজ্জল একটা তারা ফুটে রয়েছে। কেমন জ্বলজ্বল করছে। কি যেন নাম ওটার? মনে হলো লাইজুর দিকেই তাকিয়ে আছে ড্যাব ড্যাব করে। সহানুভূতি জানাচ্ছে? না তার অসহায়ত্ব দেখে মিটিমিটি হাসছে?
আবার চোখ মোছে লাইজু বেগম। ‘হাসি-আনন্দে ভরা একটা সংসারকে ইচ্ছে হলেই কানা-খোঁড়া করে ভোলা মিয়ার মত ভালো মানুষকে অসময়ে তুলে নিয়ে যাও,’ বিড়বিড় করতে লাগল সে। ‘অথচ আমার মত সহায়-সম্বলহীন, অসহায়কে ফেলে রাখো পরের দয়ার ওপর। কেন? কোন পাপের শাস্তি দিতে?’
ঋতুকে নিয়ে সমস্যা চরমে উঠতে এক বয়স্ক মহিলা পরামর্শ দিল গোপনে মেয়ের বিয়ে দিয়ে দাও। লাইজুও সেরকমই কিছু একটা ভাবছিল। ছেলে বাছ-বিচারের উপায় বা সময়, কোনোটাই ছিল না। তাই পাশের বাড়ির মহিলার এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের সাথে ঋতুর বিয়ে দিল সে। ছোটোখাটো ব্যবসায়ী ছেলেটা। ভাগ্য ভাল যে যৌতুক দাবি করেনি ছেলে। তাহলে কি হত কে জানে? তার বিয়ের পর ভোলা মিয়ার বানিয়ে দেয়া একটা সরু চেইন আর দুটো চুড়ি, এই ছিল লাইজুর সম্বল। তাই দিয়ে মেয়েকে তুলে দেয়া হলো।
ভালই চলছিল ঋতুর সংসার জীবন। শাশুড়ি চোখে কম দেখে, একা থাকতে কষ্ট হয়। তাই তাকে নিজেদের কাছে নিয়ে গেল জামাই। নাতনী হৃদির জন্ম হলো, বয়স একে একে সাত মাসে পড়ল। এই সময় হঠাৎ জানা গেল ঋতুর স্বামীর আগেও এক বিয়ে ছিল এবং সেই ঘরে দুটো ছেলেমেয়েও আছে। ঝড়ের তীব্র ঝাপটায় সবকিছু চূড়ান্তভাবে এলোমেলা হয়ে গেল। প্রথম স্ত্রী, ছেলে-মেয়েসহ শাশুড়ি পর্যন্ত এসে চড়াও হলো ঋতুর সংসারে। দু’ সপ্তাহের মধ্যে তছনছ হয়ে গেল মেয়ের সাজানো-গোছানো সাধের সংসার। যার চোখে জীবনে কখনও পানি দেকেনি, সেই ঋতুকে চোখের সামনে দিন-রাত কাঁদতে দেখে বুক ভেঙে-গুঁড়িয়ে গেল লাইজু বেগমের। নিজের অবস্থান আরও আগেই নড়বড়ে হয়ে গেছে। আগের পক্ষ বেশ জেঁকে বসেছে ঋতুর সংসারে। প্রথম স্ত্রীর বিনা অনুমতিতে দ্বিতীয় বিয়ে করার শাস্তির ভয় দেখিয়ে জামাইকে কেঁচো বানিয়ে ফেলেছে। জামাইয়ের ওপর আর ভরসা করার উপায় নেই বুঝতে পেরে শঙ্কিত হয়ে উঠল লাইজু। তার কি উপায় হবে? কোথায় যাবে? ঠিকমত চোখে দেখে না। সেলাই করতে পারে না। খাবে কি করে?
অনেক চিন্তা-ভাবনার পর সাহস করে একদিন ভোলা মিয়ার মালিকের সাথে দেখা করল লাইজু বেগম। তার জীবন সংগ্রামের কাহিনী শুনে দয়া হয় মানুষটার। পরিচিত এই বৃদ্ধ নিবাসে তার থাকার ব্যবস্থা করে দেয় সে।
কষ্ট যতই হোক, চলে আসতে হলো লাইজু বেগমকে। নিজেকে অনেক বুঝিয়েছে সে, এই ঠিক হয়েছে। অসহায়, অক্ষমের আবার কষ্ট কি?
তবে একটা আফসোস তারপরও আছে, আর দু’-একটা দিন যদি মেয়ের সংসারে থেকে আসতে পারত। যদি এই দিনে নতুন জামাটা নিজ হাতে হৃদিকে পরিয়ে দিয়ে আসতে পারত।
বিদায়ের সময় জামাই অবশ্য কথা দিয়েছে, জন্মদিনে মেয়েকে নিয়ে তার দোয়া নিতে আসবে ওরা। অবশ্যই আসবে। তখন ওটা পরিয়ে দিতে পারবে সে। আসবে তো? কখন আসবে? কে জানে?
বুকের ভেতরে কেমন যেন করছে লাইজু বেগমের। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। এমন কষ্ট, যার ধরণ কাউকে বলে বোঝানো যায় না।
জ্বল জ্বলে তারাটার দিকে তাকিয়ে থাকল লাইজু। বিড়বিড় করতে লাগল, ‘মানুষের মনে ভালোবাসা-আবেগ দিয়েছ, সেসব নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাও যদি দিতে! এক জনমে আর কত কষ্ট সইতে হবে…!’
গলা বুঁজে আসে লাইজুর। বিছানায় উঠে বসে সে। ঘোলা চোখে দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে প্রিয় হৃদির মিষ্টি কণ্ঠের ডাক শোনার, তার দেখা পাওয়ার প্রতীক্ষায়।

ইফতেখার আমিন