রিয়া মধ্যবিত্ত ঘরের এক সাধারণ মেয়ে। শান্ত, স্থির, দরকারি কথা ছাড়া কথা একদম বলতে চায় না। চুপচাপ থাকতেই সে পছন্দ করে। পাঁচ জনের মধ্যে যদি সে বসে থাকে, তাহলে রিয়া হয়ে ওঠে সবচেয়ে আদর্শবান শ্রোতা। খুব মনোযোগ দিয়ে সবার কথা শুনতে পছন্দ করে। কোনো কিছুতেই তার যেন বিরক্তি নেই। এই স্থিরতার মধ্যেও ওর যে স্বভাবটি কারো নজরে পড়ে না, সেটা ওর ইমোশনাল আর কল্পনাপ্রবণ মনোভাব। প্রচ- ইমোশনাল সে, কিন্তু বাইরে থেকে তা বোঝার উপায় নেই। আর কল্পনা? রিয়া ওর কল্পনা দিয়ে সবকিছু সাজাতে চায়, জীবনকে দেখতে চায় ওর আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে; কিন্তু কল্পনার ওপর ভর করে তো জীবন হয় না। জীবন বড় কঠিন একটি বিষয়।
ছেলেবেলা থেকে সে শিখে এসেছে মিথ্যে কথা বলবে না, কারো মনে কষ্ট দিবে না, কাউকে ঠকাবে না। রিয়া সেই বুলিগুলোকে বড় সত্য ভেবে আঁকড়ে ধরেছে। কারো মনে কষ্ট দেয়নি। ছোটোখাটো দুষ্টুমি মিথ্যা ছাড়া কখনো সত্যিকার অর্থে মিথ্যা কথা বলেনি। যতটা পেরেছে মানুষের সঙ্গে সিনসিয়ার হতে। কিন্তু বিনিময়ে অজস্র মিথ্যা, অসত্য তাকে আঁকড়ে ধরেছে।
এ বছর ইউনিভার্সিটির সিঁড়ি পাড়ি দিল রিয়া। এখন দরকার চাকরি। প্রতিদিন সকালে তাড়াহুড়ো করে সে ঘর থেকে বের হয়। দেখে যে কেউ ভাববে এই বুঝি তার ক্লাস মিস হয়ে যাচ্ছে, কিংবা দেরি করে ক্লাসে ঢোকার জবাব টিচারের কাছে দিতে হবে। অথবা অফিসে আধঘণ্টা দেরিতে পৌঁছালে বস ডেকে পাঠাবেন রুমে; কিন্তু সেসব কিছুই না। রিয়া ছুটে চলে চাকরির সন্ধানে, সে-ই সন্ধ্যায় ফেরে। মাঝে মধ্যে রিকশা ভাড়া বাঁচাতে হেঁটে চলে। সমস্ত পা ব্যাথায় অবশ হয়ে যায়। স্যান্ডেল আস্তে আস্তে ক্ষয় হতে থাকে। স্যান্ডেলরই বা কি দোষ, সেটারও তো সহ্যের সীমা আছে। কিন্তু চাকরির সন্ধান সে আজও পায়নি। প্রতিদিন ব্যর্থ মুখ নিয়ে ফিরতে তার একদম ভালো লাগে না। তারপরও ফিরতে হয় পরাজিত সৈন্যের মতো অবনত মুখে।
আয়নার সামনে দাঁড়ায় রিয়া। আয়নার মাঝখানে একটি ফাটল ধরেছে, তবুও সে ফাটা আয়নার একপাশ দিয়ে কোনোমতে মাথার সিঁথিটা ঠিক করে নিল। চেহারা তার বড় মলিন দেখাচ্ছে। সারাদিন রোদের মধ্যে ঘুরে কেমন জানি ঝলসে গিয়েছে গায়ের রঙ। চোখের নিচে হালকা কালি পড়েছে। নিজেকে দেখতে দেখতে পুরনো স্মৃতিতে হারিয়ে গেল।

সে বছর রিয়া অনার্স থার্ড ইয়ারের ছাত্রী। জীবনের কঠিন কষাঘাত তখনো তাকে স্পর্শ করেনি। প্রাণবন্ত হাসি আর বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা ক্যাম্পাসময়। প্রেম ভালোবাসা কী তা সে জানতো না, বুঝতো না। কোনোদিন বোঝার চেষ্টাও করেনি, বরং একে অন্যের জন্য কেন পাগল হয়, এটাই তার বোধগম্য হতো না। ছোটবেলায় একবার এক পাশের বাসার সিনিয়র ভাইকে সে দেখেছে একটি মেয়ের জন্য জীবন দিতে। চোখের সামনে দেখেছে কীভাবে একজন মানুষ বদলে যেতে পারে, কষ্ট দিতে পারে। তারপর থেকে রিয়া বদ্ধপরিকর এই ভুল সে করবে না। কিন্তু তার জীবনে যখন ভালোবাসা এলো, তখন সে বুঝতেও পারেনি, জানতেও পারেনি কখন তার হৃদয়কে এতখানি স্পর্শ করেছে। ভালোবাসা যে এত গভীর, এত স্পর্শকাতর তা সে প্রতিমুহূর্তে উপলব্ধি করেছে। অনুভব করেছে প্রতিটি নিঃশ্বাসে, প্রতিটি কল্পনায়, কর্মচঞ্চলতায়, অলসতায়।
কিন্তু রিয়ার সেই ভালোবাসা টিকলো না। হঠাৎ একদিন তার ভালোবাসা অচেনা হয়ে গেল। বদলে গেল সেই অতি প্রিয় চেনা মানুষটি। রিয়া নিজেকে মেলাতে পারলো না, তার বিশ্বাস, তার কল্পনা, তার আমিত্ব-সবকিছু কেমন জানি অন্যরকম হয়ে গেল। অভিমানে সরে এলো সেখান থেকে। কোনোদিন প্রশ্ন করতেও যায়নি কেন, কিসের জন্য এমন হলো। বেছে নিল কল্পনা থেকে নিজের সংগ্রামী জীবনকে। নিজেকে সান্ত¡না দিল এই ভেবে যে, ক্ষণিকের সেই ক’টা দিন হয়তো তার বহুদিনের কল্পনার স্বপ্ন অথবা দুঃস্বপ্ন ছিল। ছিল একটি কালবৈশাখী। ঝড়ো হাওয়ায় সে কালবৈশাখী কেটে গেছে। সঙ্গে নিয়ে গেছে তার ছোট ছোট টুকরো স্মৃতিগুলো।
হঠাৎ ঘড়ির শব্দে রিয়া বাস্তবে ফিরে এল। রাত ১২টা বাজে। ঘুমাতে যেতে হবে, পরদিন সকালে অনিশ্চয়তার দিকে আবার সেই বিরামহীন ছুটে চলা।

সকালে ঘুম থেকে ওঠে চারদিকে অন্ধকার দেখে রিয়ার মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেল। মনে হচ্ছে এখনো সকাল হয়নি, চারদিকে বেশ অন্ধকার, অথচ ঘড়িতে সাতটা বাজার সংকেত শুনেই ওর ঘুম ভাঙলো। আকাশ আজ ঘন কালো মেঘে আচ্ছন্ন। এমন পরিবেশে ঘর থেকে বের হতেই ইচ্ছে হচ্ছিল না তার। কিন্তু আজ একটি ইন্টারভিউ আছে, রেজাল্ট যদিও জানা, তারপরও অনেক কিছু সাতপাঁচ ভেবে রিয়া বিছানা ছাড়লো। ঘর থেকে যখন বের হলো তখন ঘড়িতে নয়টা বাজার দশ মিনিট বাকি আছে।
বাসস্ট্যান্ডে এসে দাঁড়ায় রিয়া। অপেক্ষা করছে বাসের জন্য, এমন সময় দৃষ্টি গিয়ে থমকে গেল পরিচিত এক মানুষের দিকে। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, চুল আধা পাকা-কাঁচা, পরনে হালকা ময়লা পুরনো পাঞ্জাবি। খুব পরিচিত মুখ কিন্তু রিয়া কিছুতেই মনে করতে পারছিল না… কে সেই ছেলেটি।
গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। আকাশের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে সারাদিনই এমন অবস্থা চলবে। এমন সময় রিয়ার মনে পড়লো সেই আধা পাকা-কাঁচা চুলওয়ালা লোকটির পরিচয়। তিনি রিয়াদের ইউনিভার্সিটিতে পড়তেন, প্রবাল ভাই। রিয়া ডাকতে যাবে, ঠিক তখনই তিনি একটি রিকশা ডেকে উঠে পড়লেন। তারপর অনেক রিকশার মাঝে আবার হারিয়ে গেলেন তিনি। এরই মাঝে বাস এসে থামলো। রিয়া উঠে পড়লো গাড়িতে।
জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। বেশ জোরেসোরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। কিছুটা অবেচেতন মনে সে হাত বাড়িয়ে দিল বৃষ্টির দিকে। চেষ্টা করতে লাগলো বৃষ্টির সবক’টি ফোঁটা ধরার জন্য। হঠাৎ করেই অস্থির হয়ে গেল সে, বৃষ্টির ফোঁটাগুলো ধরে রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলো। কিন্তু সে কিছুতেই তা পারছে না। হাত উপচে পানি পড়ছে। এমনটি সে তো চাচ্ছে না। রিয়া চাচ্ছে সবগুলো ফোঁটা ধরে রাখতে। মনে পড়ে গেল সেই কথাটি- Next time when it rains, try to catch the rain drops. The drops you can catch show how much you miss me, and the drops you can’t catch, show how much I miss you. রিয়া আকাশকে এই কথাগুলো লিখেছিল। আকাশ- যাকে সে পাগলের মতো ভালোবেসেছিল।
সে বেশ কিছুদিন আগের কথা… অনেকদিন ধরেই আকাশের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব। আকাশ ভাবে-সাবে ইঙ্গিতে রিয়ার প্রতি তার ফিলিংসগুলো জানিয়ে দিয়েছিল। রিয়া বুঝতে পারতো ঠিকই; কিন্তু না বোঝার ভান করে থাকতো। একদিন রিয়া আবিষ্কার করলো, সেও ফিল করছে আকাশকে। তার চিন্তায়, কাজের ফাঁকে, চঞ্চলতায় নামটি চলে আসে। কিন্তু কি করে সে আকাশকে তার মনের কথা বলবে, ভাবতে লাগলো। এমন সময় হঠাৎ বুদ্ধি এলো মাথায়, ছদ্ম নামে মেসেজে লিখে পাঠালো কথাগুলো। আকাশ বুঝতে পারলো কিনা কথাগুলো কার; কিন্তু রিয়ার আর তর সইলো না। নিজের মুখে বিকেল বেলা সব স্বীকার করলো আকাশের কাছে…।

সেদিন ইন্টারভিউ রিয়ার ভালোই হয়েছিল। এখন অপেক্ষা শুধু রেজাল্টের। আজ ঘর থেকে বের হতে তার ইচ্ছা করছে না। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। ভাবছে আজ আর বের হবে না ঘর থেকে। কাঁথা গায়ে দিয়ে শুয়ে থাকতেই তার ভালো লাগছে। জানালা দিয়ে বাইরে চোখ পড়তেই দেখলো, একটি দাঁড়কাক বৃষ্টিতে ভিজে জবুুথবু হয়ে পড়েছে। আশ্রয় খুঁজতে লাগলো কাকটি। রিয়ার বড্ড মায়া হলো কাকটির জন্য। এলোমেলো অনেক চিন্তা মাথার মধ্যে আসতে লাগলো। ইদানীং আকাশের কথা তার খুব বেশি মনে পড়ছে। এতো কষ্ট দিয়েছে আকাশ, এতো অপমান… তারপরও কেন জানি আকাশকে সে ভুলতে পারে না। ভাবতে ভাবতে রিয়া চলে গেল পেছনে… দিনে যে কতবার তারা ফোনে কথা বলতো, সকালে ওঠে রিয়ার মেসেজ না পেলে আকাশ ভীষণ রাগারাগি করতো। এরপর পুরো লাঞ্চ আওয়ারের সময়টুকু ছিল রিয়ার জন্য। বাইরে যতো কাজই থাকুক না কেন, রিয়া চেষ্টা করতো ১টা ৩০ মিনিটের আগে বাসায় ফিরতে। এখানে শেষ নয়, বাসায় গিয়ে আবার ফোন। সবচেয়ে মজার ব্যাপার ছিল, দুজনের দিন শুরু হতো ফোন দিয়ে। শেষও হতো ফোন দিয়ে। দেখা হতো মাঝে মধ্যে। যেদিন দেখা হতো, রিয়ার যে কী আনন্দ, তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। একভাবে সে আকাশের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতো। বিশ্বাস, ভালোবাসা, সবই ছিল সেই চোখের মধ্যে। একদিন আকাশ রিয়ার হাত দুটো শক্ত করে ধরে বলেছিল, ‘তোমার আকাশ তোমারই থাকবে। কেউ সেখান থেকে নিয়ে যেতে পারবে না। পৃথিবীর কোনো শক্তি নেই আমাদের আলাদা করার।’
রিয়া বিশ্বাস করলো আকাশকে, তার কথা, চোখের ভাষা-এতদিন তাকেই তো সে খুঁজেছে মনে মনে। এতদিন যে মানুষটির প্রতীক্ষায় ছিল, সে তার বর্তমান। জীবনে এতটুকু ভালোবাসার জন্যই রিয়া উদগ্রীব ছিল। অদ্ভুত এক টান, মায়া ছিল আকাশের জন্য। এই টান এতটাই গভীর যে আকাশ সামনে বসে থাকলেও রিয়া আনমনে হয়ে যেত। রিয়ার বিশ্বাস ছিল, আকাশের প্রতি যতটুকু টান, আকাশও ঠিক তেমনি পাগলের মতো তাকে ভালোবাসে। মাঝে মধ্যে একটু আধটু যখন ঝগড়া হতো দুজনের মধ্যে, আকাশ অস্থির হয়ে পড়তো তার রাগ ভাঙানোর জন্য। তেমনি রিয়াও আকাশকে ছাড়া একমুহূর্তে থাকতে পারতো না। দুজন দুজনকে প্রতিজ্ঞা করলো জীবনের কোনো মুহূর্তে একজন আরেকজনকে ছেড়ে যাবে না, কখনো না, কোনোদিন না। সফলতায়, ব্যর্থতায় সব সময় পাশাপাশি থাকবে।

হঠাৎ কলিংবেলের শব্দ। রিয়া ঠিক টের পেল না। এরই মধ্যে তার হুঁশ এলো। বিছানা থেকে ওঠে দরজা খুলতেই দেখতে পেল ডাকপিয়ন দরজায় দাঁড়িয়ে। বেচারা বৃষ্টিতে একদম ভিজে গেছে। রিয়ার দিকে একটি চিঠি এগিয়ে দিল। রিয়ার খুব মায়া হলো লোকটির জন্য। বয়স ভালোই হবে লোকটির। এ বয়সে নাতিদের নিয়ে তার ঘরে বসে আয়েস করার কথা।
রিয়া লোকটিকে ডেকে বললো, ‘চাচা একটু বসেন, চা করে দিই।’ লোকটি মোটা চশমার ভেতর থেকে সূক্ষ্মভাবে রিয়ার দিকে তাকালো, তারপর ম্লান একটু হাসি দিয়ে চলে গেল। রিয়া তাকিয়ে রইলো লোকটির চলে যাওয়ার দিকে…।
কিছুটা আনমনে ভাবে সে কাঁথা গায়ে দিয়ে আবার শুয়ে পড়লো। আজ সকাল থেকে তার মনে আকাশ নামটি ঢুকে পড়েছে। রিয়া ইচ্ছা করলেও তাকে মন থেকে বের করতে পারছে না। শুধু ভাবছে, মানুষ এতটা নিষ্ঠুর কেমন করে হয়। এতো আবেগ, এতো ভালোবাসা- কি করে এতো মিথ্যা হয়। আসলে ভালোবাসা কাকে বলে-এই প্রশ্নই সে খুঁঁজে ফিরে মনে মনে …।

আজ দিনটা রিয়ার জন্য ব্যতিক্রম। কেননা আজ সে প্রথম অফিসে জয়েন করেছে। ওই যে মোটা চশমাওয়ালা পিয়নটি রিয়াকে একটি খাম দিয়ে গিয়েছিল। সেটি ছিল তার অ্যাপয়েনমেন্ট লেটার। অফিসের সবাইকে মোটামুটি কো-অপারেটিভ মনে হলো। আর কো-অপারেটিভ না হলেও রিয়ার জন্য কোনো অসুবিধা ছিল না। সে যে কোনো পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে চলতে পারে। প্রথম দিন হওয়ার সুবাদে আজ তার অলস দিন কাটছে। একটু পরপর চা খাওয়া আর কলিগদের সঙ্গে পরিচিত হওয়া ছাড়া বিশেষ কোনো কাজ নেই। রিয়া হঠাৎ খেয়াল করলো, পাশের রুমে ছোট একটি টেবিলে মাথা নিচু করে একটি লোক খুব মনোযোগ দিয়ে কি যেন লিখছে। রিয়ার চিন্তে একটুও অসুবিধে হলো না, লোকটি অন্য কেউ নয়। এক সময়ে ক্যাম্পাসের সবার প্রিয় সেই প্রবাল ভাই।
প্রবাল ভাই রিয়াদের অনেক সিনিয়র। তারা যখন প্রথম ইউনিভার্সিটিতে পা রাখে, তখন তিনি মাস্টার্স ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। মেধাবী, বুদ্ধিমান, ভালো কবিতা আবৃত্তি করতেন। রিয়াদের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে তিনি কবিতা আবৃত্তিও করেছিলেন। একটু-আধটু রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। একবার রিয়া তার বন্ধুদের সঙ্গে ক্যাম্পাসে আড্ডা দিচ্ছিল। হঠাৎ তারা দেখতে পেল প্রবাল ভাই হন্যে হয়ে দৌড়াচ্ছেন। কোথায় যেন গ-গোল হয়েছে। কিন্তু কেন, কিসের জন্য তিনি দৌড়াচ্ছেন কেউ কিছু বুঝলো না। তারপর প্রায়ই দেখা যেত প্রবাল ভাই দৌড়াচ্ছেন। দেখে মনে হতো কেউ তার পিছু লেগেছে, ধরিয়ে দেবে পুলিশের হাতে। শেষে একদিন শোনা গেল, প্রবাল ভাই জেলে গিয়েছেন। মাস্টার্স পরীক্ষা আর তার দেয়া হয়নি। জেল থেকে বের হয়ে তিনি কোথায় যেন হারিয়ে গেলেন। অনেকদিন তার কোনো খোঁজখবর পাওয়া যায়নি। প্রবাল নামটিও আস্তে আস্তে হারিয়ে গেল। ভুলে যেতে লাগলো সবাই এই নামটি। কিন্তু আজ হঠাৎ তিনি এখানে কি করছেন-ভাবতে লাগলো রিয়া। রাজনীতি মানুষের গোছালো জীবনকে কেমন অগোছালো করে দেয়। মেধাবী, প্রাণবন্ত এক যুবকের এই পরিণতি ভাবাই যায় না। খোঁজ নিয়ে জানা গেল এই অফিসে প্রবাল ভাইয়ের বোন চাকরি করে। বোনের কাছে তিনি মাঝে মধ্যে টাকা নিতে আসেন। বোনকে না পেয়ে তাই চিঠি লিখে যাচ্ছেন।

আজ ৫টা বাজার আগেই রিয়ার ছুটি হয়ে গেল। বাসায় যেতে ইচ্ছে করছে না তার। কিন্তু কোথায় যাবে সে। উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটতে লাগলো। যেদিন আকাশের সঙ্গে তার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল, রিয়া কিছুতেই মেনে নিতে পারলো না।
বেশ কিছুদিন ধরে আকাশকে কেমন জানি অচেনা মানুষ মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল আকাশ অনেক অপরিচিত এক মানুষ। রিয়া যে আকাশকে চিনে, সে এ না। অন্য এক লোক। সরাসরি রিয়া তখন আকাশকে প্রশ্ন করে তার শংকার কথা বলেছিল। কিন্তু আকাশ রিয়াকে শক্ত করে ধরে ওই একই কথা বলেছিল, ‘তোমার আকাশ তোমারই থাকবে। কেউ সেখান থেকে নিয়ে যেতে পারবে না।’ কিন্তু সেই সন্দেহ সত্যি হলো কিছুদিন পরই। অনেকবার মনে হয়েছিল, বেঁচে থাকার কোনো অর্থ নেই। আবার ভাবলো, যেখানে ভালোবাসাই ছিল না, তার জন্য মরে গিয়ে লাভ কি। আকাশের কথা রিয়া কারো সঙ্গে শেয়ার করতে পারতো না। কাউকে কিছু বলতে পারতো না। কিন্তু কিছুদিন পর যখন রাগ কমলো, রিয়া সব আত্মসম্মান ভুলে ছুটে গিয়েছিল আকাশের কাছে। বিশ্বাস ছিল, সামনে দাঁড়ালে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। ভালোই হয়েছে, কারণ সেদিন যদি সে আকাশের সামনে না দাঁড়াতো, কোনোদিন আসল সত্য বের হয়ে আসতো না।
রিয়া যে চোখের দিকে তাকিয়ে আকাশকে ভালোবাসার কথা বলেছিল, স্বপ্ন দেখেছিল সেই চোখের দিকে তাকিয়েই আকাশ স্পষ্টভাবে রিয়াকে জানিয়ে দিল, কোনো দিন, কোনো সময় এক মুহূর্তের জন্য সে রিয়াকে ভালোবাসেনি। কখনো সে রিয়ার জন্য ভালোবাসার টান অনুভব করেনি। রিয়াকে তার প্রচ- ভালো লাগে কিন্তু ভালোবাসে না। রিয়াকে একেবারে দূরে ঠেলেও দিতে চায় না সে। বন্ধু হয়ে আজীবন থাকতে চায়।
রিয়া ঠিক বুঝতে পারলো না আকাশের কথা। তাকে খুব অপরিচিত মনে হলো। নিজেকে বড় অসহায় লাগছিল তার। শুধু একটাই প্রশ্ন করলো আকাশকেÑ ‘তবে ভালোবাসা কাকে বলে আকাশ?’ ভালোবাসার কথা বলে বন্ধুÑ রিয়া ঠিক মেনে নিতে পারলো না। রিয়ার মনে হলো আকাশ জানেই না বন্ধুত্ব আর ভালোবাসার সংজ্ঞা। রিয়া ততটা উদার হতে পারলো না। নিজেকে ধিক্কার দিল কেন সে এই আকাশদের মতো হতে পারছে না।

সন্ধ্যে হয়ে গেছে। বিষন্ন সন্ধ্যায় রিয়া হাঁটতে লাগলো সামনের দিকে। টিপ টিপ বৃষ্টি পড়ছে। রিয়া মনে মনে বিড়বিড় করতে লাগলো- Next time when it rains, I will not try to catch the rain drops …

নিশাত মাসফিকা