সারি সারি গাছ তাতে পাতা নেই,শূধূ ফূল,মনে হবে তুলতুলে সাদা চাদর। মৃদু হাওয়া এলেই দুলে ওঠে চাদর। হাওয়ায় ওড়ে ফুলের পাপড়ি। যেন তুষার ঝরছে নীরবে।
সাকুরা ফুলের মৌসুমে জাপান যেন এক স্বর্গীয় রূপে ধরা দেয়। আমাদের যেমন আছে বসন্ত উৎসব, ওদের তেমন সাকুরা উৎসব। বিশেষ আয়োজনে মুখর হয়ে ওঠে সারা দেশ। আনন্দের আবেশ ছড়িয়ে পড়ে সবখানে। সারাদিন সারারাত এখানে ওখানে চলে আনন্দের নানা আয়োজন। সাকুরা গাছের নিচে চাদর পেতে বসে থাকে সবাই। সঙ্গে থাকে নানা ধরনের খাবার। চলে পানাহার, নাচ-গান। সে এক অন্যরকম আমেজ! জাপানে এই সাকুরা উৎসবকে বলা হয় হানামি। ইংরেজিতে যেটা চেরি ফেস্টিভ্যাল।
বিশেষ বিশেষ এলাকায় বড় উৎসবের আয়োজন হয়। আর ছোট ছোট উৎসব সব এলাকায় চলতে থাকে। পার্কে, নদীর ধারে সবখানেই বসে আনন্দ আয়োজন। যেখানে সাকুরা গাছ, সেখানেই উৎসব। সাকুরা গাছ নেই এমন কোনো জায়গা অবশ্য চোখে পড়ে না। চারটা শহর ঘুরে একই চিত্র দেখেছি। সাকুরার ফুলেল চাদর সবখানেই আছে। কোথাও সাকুরা গাছের সংখ্যা বেশি, কোথাও একটু কম, এই যা। টোকিও, তোচিগি, ফুকুওকা ও ইতোশিমা ঘুরে ঘুরে দেখেছি সাকুরার নানন্দিক উৎসব। আমাদের যেমন আছে কৃষ্ণচূড়া, জারুল, হিজল ও সোনালু, ওদের তেমন সাকুরা। শুধু আমরা ওদের মতো সাজিয়ে-গুছিয়ে গাছ লাগাতে পারি না। সেদিকে আমাদের মনোযোগ নেই। অথচ এরকম দারুণ করে আমাদের দেশটাকেও আমরা ফুলে ফুলে সাজিয়ে তুলতে পারি। জাপানে সাকুরা ফুটলে সারাবিশ্ব থেকে পর্যটক ছুটে আসে সাকুরাময় জাপানকে উপভোগ করতে।
মূলত সাকুরাকে ঘিরেই জাপানে বসন্ত উৎসব হয়। এ উৎসবটা শুরু হয় এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে, চলে মধ্য এপ্রিল পর্যন্ত। হিমহিম ঠাণ্ডার দিন পেরিয়ে আবহাওয়া যখন একটু উষ্ণতা নিয়ে আসে, তখনই শুরু হয় সাকুরা ফোটা। তীব্র শীতের পর দারুণ এক আবহাওয়া থাকে এ সময়! উপভোগ্য হয়ে ওঠে বসন্ত। সাকুরা জানায় স্বাগত সম্ভাষণ।

সাকুরার প্রায় ৪০০ প্রজাতির মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হচ্ছে সোমেয়োশিনো সাকুরা। তারপরই ইয়ায়েজাকুরা, যার রয়েছে অনেক পাপড়ি। আর সোমেয়োশিনো মাত্র পাঁচটি পাপড়ির ক্ষুদ্র একটি ফুল। বসন্তে সাকুরা বৃক্ষে কোনো কলি বা পাতা থাকে না, কেবল থোকা থোকা ফুল। ১২০০ বছরের প্রাচীন শহর কিয়োতোর ‘য়োশিনোয়ামা’ আর নারা নগরের ‘আরাশিয়ামা’ হচ্ছে সাকুরার স্বর্গভূমি!
সাকুরাকে ঘিরে জাপানের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি নানাভাবে সমৃদ্ধ হয়েছে। চিত্রশিল্পী তার কর্মে যেমন সাকুরার আলোড়ন তোলেন, তেমনি কবি-সাহিত্যিকদের রচনা নানাভাবে আচ্ছন্ন হয় সাকুরায়। সঙ্গীতেও আছে এর প্রভাব।
সাকুরার দিনে জাপানের বিভিন্ন শ্রাইনে উৎসব ও প্রার্থনা হয়। সেই আয়োজনে সবাই এমনভাবে অংশ নেন, যেন এটা তাদের জীবনের একটি প্রধান উৎসব। নতুন জামা-কাপড় পরে সপরিবারে, সবান্ধব উৎসবে আসে সবাই। উৎসবকে ঘিরে মেলাও বসে। তাতে নানা পসরা ও খাবার-দাবারের আয়োজন থাকে। ধুম বেচাকেনা চলে। ছোট ছোট স্টল উপচে পড়ে নানা ধরনের পণ্যে। ঠিক যেন আমাদের দেশের বৈশাখী মেলা।

ব্যস্ত মানুষ কিছুটা অবকাশ খুঁজে নেয় সাকুরা উদযাপনে। সাকুরার দিন শেষ হলে আবার যান্ত্রিক জীবনে ব্যস্ততার সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে কাজ-পাগল জাপানিরা।
বসন্তে জাপানে সাকূরার সৌন্দর্য দেখে বিমোহিত সারা জাপান।

সোনালী সকাল ডেস্ক,জাপান

সূমিমা ইয়াসমিন