বৈশাখ আসছে, সাজ সাজ রব সারা বাংলাদেশে। বিশেষ করে ঢাকায়। বৈশাখের আয়োজন কয়েক দশক ধরে একটু বেশী মাত্রায়ই হচ্ছে। আসলে এরশাদের সময় থেকে স্বৈরাচার বিরোধিতা করতে শুরু হওয়া মঙ্গল শোভাযাত্রা থেকেই বৈশাখের আয়োজন এক অনন্য মাত্রা পেয়েছিল। আমি জাতি ধর্ম নিয়ে কথা বলতে চাইনা, কারণ, বৈশাখ সবারই, সব বাঙালী’র! যারা ধর্মের দোহাই দিয়ে, বৈশাখ আর বৈশাখী আয়োজন আর উৎসব নিয়ে নানা অজুহাত দেখাতে চায়, তাদের নিয়ে আলোচনা করে সময় নষ্ট করাটাই বোকামো।
মজার ব্যাপার, বাঙালীদের বাইরে, পাঞ্জাবীরাও খুব ধুমধাম করে বৈশাখ উদযাপন করে। সেটা বিলেতে আসার পরে আমি দেখেছি। কলকাতাতেও বৈশাখ নিয়ে উত্তেজনা থাকে, তবে তা শুধুই হালখাতা আর পূজা অবধি। আমরাই বৈশাখ নিয়ে এক উৎসব করি, যা মোটামুটি আমাদেরই দেশীয় বলতে পারি। চারুকলার ছাত্রছাত্রী সবাই দিনরাত পরিশ্রম করে মঙ্গল শোভাযাত্রা বিস্তর রঙিন করতে দম ফেলারও সময় পান না, সেই চৈত্রের শুরু থেকেই। তাদের সেই অক্লান্ত পরিশ্রম আমাদের এক দিনের উচ্ছাস উদযাপন। বাংলালিংক ২০০৫ থেকে বৈশাখে এনেছে আরো অনেক নতুন মাত্রা। আরো অনেক বড় পরিসরে সারাদেশে এই উৎসব ছড়িয়ে দিয়েছে। আগে যা বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে ছোট করে হতো, তা বাংলালিংক এর ছোঁয়া পেয়ে অনেকটাই বড় করে হচ্ছে।
বাঙালী উৎসবপ্রিয় জাতি। আমাদের কিছু একটা উপলক্ষ পেলেই হলো, আমরা তা নিয়ে আমাদের মত করে উদযাপন করি। আর এই বৈশাখের উদযাপন শুধু যে বাংলাদেশে থাকা বাঙালীদের মাঝেই সীমাবদ্ধ, তা কিন্ত নয়। বিদেশী যারা এইদিন ঢাকায় আছেন আর থাকেন, তারাও খুব উৎসাহ নিয়ে এই উৎসবে মেতে ওঠেন। এটাই বাঙালীর বৈশাখী উৎসবের স্বার্থকতা!
বৈশাখ মানেই একসময় লাল সাদা রঙ এর বাহার ছিল। কালের সাথে, সময়ের বিবর্তনে, গরমের মাত্রায়, এখন লালের পাশাপাশি অন্য রঙও আসছে। ফ্যাশনহাউজগুলো এসময় নতুন কাপড় দিয়ে রমরমা ব্যবসা করে চৈত্রেই। এখন মানুষ উজ্জ্বল রঙ এর পাশাপাশি আরাম পেতে হাল্কা কাপড় পছন্দ করে। ফুলের গহনার বাহার, বেড়েছে। আগে সবাই বেলফুলের মালা গাজরা ব্যবহার করলেও এখন নানা রকম রংবেরঙ এর ফুল দিয়ে বানানো মুকুট বেশী পছন্দ করে। যদিও বাচ্চাদের জন্য, আমার মতে এটা বিপদজনক, তবুও সবার উচ্ছাসে কখনওই চাইনা কারো কোন বিপদ হোক। সবাই যখন নানান ভঙ্গী করে ছবি তোলে আর ফেসবুকে দেয়, দারুণ লাগে।
বৈশাখের এক বছরে আমার মনে পড়ে, সারাদিনের নানা আয়োজন নিয়ে, আল মনসুর, আমার বেলাল মামা, একটা অনুষ্ঠান করেছিলেন তখন বিটিভিতে, আর সেই অনুষ্ঠান করতে ভিডিও করেছিলেন আমার ছোট মামা, আর স্থিরচিত্র তুলেছিলাম আমি, তখন ৩৬ টা ছবির ফিল্মে চার রোল ছবি তুলে সেই ছবি ওয়াশ করে, প্রিন্ট করে, ভিডিও’র সাথে মিলিয়ে এডিটিং করে সন্ধ্যে বেলা প্রচার করা, খুব দুরূহ হলেও, করেছিলেন। সব ক্লান্তি চলে গিয়েছিলো আমার নিজের তোলা বিভিন্ন সাজের মহিলাদের, বাচ্চাদের ছবি দেখে দেখে। মজার একটা ঘটনা বলি, সেই ছবি তোলার সময়, ছায়ানট এর অনুষ্ঠান দেখতে আসা একজনের আমি লম্বা বেণীগাঁথা চুলের ছবি তুলছিলাম পেছন থেকে, তখনো জানিনা, উনি কে! যখন হঠাৎ করে প্রোফাইল তুললাম, চোখ ক্যামেরার লেন্স থেকে সরিয়ে দেখি, বেলাল মামারই ছোট বোন, রুনু আন্টি, আমি ডাকতাম বাবুনী বলে। বাবুনীও খুশী হয়েছিলেন, পরে আমার তোলা ছবির প্রিন্ট দেখে। অনেকেরই ছবি তুলেছিলাম, মজার ব্যাপার, সবার কাছেই ছবি তোলার আগেই বলে বলে তুলেছিলাম, শুধুই বাবুনীরটা তোলার আগেই বলিনি, আর তাতেই অবাক আমি!
এখনকার বৈশাখে, ঢাকার বা বিলেতের, তেমন আবেগ দেখিনা। নেই তেমন টানও। বিলেতে গত ছ’বছরে বিভিন্ন বৈশাখী আয়োজন দেখেছি, কিন্ত অবশ্যই বলবো, বাঙালী বৈশাখের আমেজ কম থাকে। এনটিভি’র বৈশাখী আয়োজন অনেক জাঁকজমকপূর্ণ হলেও, সত্যি কথা বলতে প্রাণহীন আর কৃত্রিমতায় ভরা। গত তিন বছরের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি কথাটা। যারা জানেনা ঢাকার বৈশাখ কেমন করে আমরা উদযাপন করি, শুধুই খবর দেখে, বা ভিডিও দেখে তাদের জানাটাও কমই হবে। তাদের কাছ থেকে আমি খুব আশাব্যঞ্জক কিছু আশাও করিনা। কারণ এনটিভির বৈশাখ মানেই হলো সুরে বেসুরে গান আর ব্যান্ড মিউজিক। এই কি বৈশাখ, যা আমরা বিদেশী বা প্রবাসীদের দেখাচ্ছি!
আমি সুইডেনেও বৈশাখ দেখেছি, খুব ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও, পুরোই বাঙালীয়ানা ধাঁচের আর ছোঁয়ার ছিল। বিলেতের বাঙালী উপস্থিতি বেশী হলেও বৈশাখী আয়োজনে বিলেতে সেটা আসলেই বিলেতি বৈশাখই হয়, বাঙালী বৈশাখ কমই হয়।
আমাদের ঐতিহ্য আর কৃষ্টির বাহন, আমাদের বৈশাখ। তাই বিদেশে বৈশাখ কি জানাতে হলে আমি মনে করি বাংলাদেশের বৈশাখ একবার হলেও বাঙালীর উপস্থিত থেকে উপভোগ করা। তাতে অনেক বেশী প্রাঞ্জলতা আসবে, প্রাণ আসবে, ভাঁড়ামো কমবে।

তৌফিকুল করিম সুহৃদ
লন্ডন থেকে