মরক্কো ভ্রমণের বিষয়টি আগে হতেই ঠিক করা ছিলো।
পশ্চিম সাহারার বিশাল অংশ নিয়ে ছয় লক্ষ দশ হাজার বর্গ কিলোমিটারের দক্ষিণ আফ্রিকার একটি দেশ মরক্কো। লোক সংখ্যা মাত্র তিনকোটি তিরিশ লক্ষ। সে অনুপাতে প্রতি বর্গমাইলে জনবসতি ৮০ জনেরও কম। মরক্কোতে আমাদের রুট ছিলো মারাকেস, বেনীমেল্লাল, ফেজ, মেকেন্স, ভলুবিলিস রাবাত, কাসাব্লাংকা, এসাওরিয়ার ইউনেস্কো কতৃক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ঐতিহাসিক স্থান গুলো পরিদর্শন শেষে আবার মারাকেস সেখান হতে আটলাস পর্বত মালার পাদদেশ, প্রায় এক হাজার পাঁচশত কিলোমিটারের দীর্ঘ পথ ভ্রমন।

এই বছর বই মেলায় যাওয়া হয়নি।
কারণ একুশে ফেব্রুয়ারি ছিলো নির্ধারিত মরক্কোর ফ্লাইট। বিকেল সাড়ে চারটায় চার্টাড বিমানে আরলান্দা হতে রওয়ানা হয়ে সোয়া নয়টায় মারাকেস এসে পৌছুলাম। মাত্র পাঁচ ঘন্টার ননষ্টপ ফ্লাইট। ফেব্রুয়ারির ষ্টকহোম বরফে ঢাকা সঙ্গে কনকনে হিমেল বাতাশ ও ঠান্ডা সে অনুপাতে মারাকেস বিমান বন্দর হতেই গরমের আঁচ পেলাম। ষ্টকহোমে যেখানে মাইনাস আঠারো, মারাকেসে সেখানে প্লাস আঠারো। মরক্কো পর্যটক বান্ধব দেশ তাই ইমিগ্রেশান পার হতে মিনিট পাঁচেকের বেশী লাগলোনা তবে দিকনির্দ্দেশনা গুলো আরবী ও ফরাসী ভাষায় হওয়ায় বুঝতে সময় নিচ্ছিলো। ইমিগ্রেশান হল পার হতেই গাইড এগিয়ে এলেন, এরপর নির্ধারিত হোটেলে যাত্রা।

মরক্কো বিশ্বের সর্বকালের সেরা পরিব্রাজক ইবনে বতুতার দেশ।
তাঞ্জিয়ারে ১৩০৪ সালের চব্বিশে ফেব্র“য়ারেীতে জন্ম নেয়া এই পরিব্রাজক মাত্র বাইশ বছর বয়েসে দেশ ত্যাগ করেন। ইবনে বতুতা ভারতেও এসেছিলেন, তখন দিল্লির সুলতান গিয়াসউদ্দিন তুঘলকের পুত্র সুলতান মুহাম্মদ তুঘলক। ইবনে বতুতার জ্ঞ্যানে মুগ্ধ হয়ে সুলতান মুহাম্মদ তাঁকে দিল্লির মালেবী সম্প্রদায়ের কাজী বা বিচারকের পদে নিয়োগ দেন। পরবর্ত্তী সময়ে তাঁকে রাষ্ট্রদূত করে চীনে প্রেরন করেন, তখন ১৩৪২ সাল। ইবনে বতুতা দীর্ঘ তিরিশ বছর বিশ্বের বিভিন্ন চল্লিশটি দেশ, তিনটি মহাদেশের ৭৫,০০০ হাজার মাইল পরিভ্রমন শেষে মরক্কো প্রত্যাবর্তন করেন। ইবনে বতুতাকে বলা হয় মুসলিম বিশ্বের মার্কো পোলো। দেশে প্রত্যাবর্তনের পর তাঁকে মরক্কোর বিচারক পদে অধিষ্ট করা হয়। ইবনে বতুতার কথা ভাবতে ভাবতেই আমাদের গাড়ি হোটেলের দারপ্রান্তে এসে দাড়ালো। গাইড স্মরন করিয়ে দিলেন আগামী কাল প্রাতঃরাস শেষে সকাল সাড়ে সাতটায় আমরা ঐতিহাসিক শহর ফেজের উদ্দেশে রওয়ানা হবো।

পরদিন সকাল সাড়ে সাতটায় প্রাতঃরাস সেরে হোটেল লবিতে আসতেই গাইড স্বাগত জানালেন।
দুয়ারে প্রস্তুত গাড়ি ঐতিহাসিক শহর ফেজের পথে আমাদের যাত্রা। চমৎকার রোদ, সহনীয় তাপমাত্রা। আমরা বেনী মেল্লাল হয়ে ফেজ যাবো। মরক্কোর এক ছোট প্রভিন্স বেনী মেল্লাল, লোক সংখ্যা মাত্র দুলক্ষ তবে আটলাস পর্ব্বত হতে নেমে আসা ওউযুদ জলপ্রপাতের জন্য বিখ্যাত। চমৎকার হাইওয়ে দিয়ে ছুটে চলেছে আমাদের গাড়ি। এখানকার মাটি ধুসর লাল। বাড়ি ঘরের রংও একই। ছোট ছোট পাথর আর মাটির পাহাড়ে বিস্তৃত খালি প্রান্তর। কোথাও সবুজ কোথাও ধুসর। মাঝে মধ্যে বিশাল বিশাল অলিভ বাগান ও মাঝে মধ্যে গড়ে উঠা বাড়ি ঘর। দেশের সরকার অলিভ ও কৃষির উপর জোর দিয়েছেন, অধিবাসীর ৪৫ % কৃষি, পশু চারন ও মৎস্য শিকারে জড়িত। কৃষিই দেশের তৃতীয় বৃহৎ আয়ের উৎস। প্রাকৃতিক সৌর্ন্দযে ভরা বেনী মেল্লাল, আফ্রিকার তৃতীয় বৃহৎ জলপ্রপাত ওউযুদের পাশ দিয়ে আমরা চলে গেলাম। পরে অবশ্য জলপ্রপাতটি দেখতে গিয়েছিলাম তবে সে অন্য অভিজ্ঞতা। আমাদের গাড়ি ছুটে চললো প্রাচীন নগরী ফেজের উদ্দ্যেশে।

মারাকেস হতে রওয়ানা দিয়েছি সকাল সাড়ে সাতটায়, ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা, বার ঘন্টা এক নাগারে ছোটা। মাঝে বেনী মেল্লালে কিছুক্ষনের জন্য থেমেছিলাম। গাইড জানালেন আরো এক ঘন্টা লাগবে হোটেলে পৌছাতে। ভেতরটা ক্লান্ত হয়ে উঠেছে। আঁধার নেমে এসেছে তবে চারদিক আলোয় আলোয় উজ্বল। মরক্কো সোলার এনার্জী হতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে ও ইউরোপের কয়েকটি দেশে রফতানী করে। একটা ছোট বাঁক নিয়েই গাড়ি এসে দাড়ালো হোটেলের পোর্টিকোয়। বাঁকের মাথায় হঠাৎ করেই দৃষ্টিতে এলো উরফড় ইধৎনধৎু নামে একটি দোকান। দোকানটি বন্ধ, কিসের দোকান বোঝা গেলোনা। তবে দোকানের নামটি ভেতরে গেঁথে গেলো। সি জে ফক্সের জার্নী ইনটু র্বাবেরী নামে একটি ভ্রমন কাহিনী পড়েছিলাম। বিষয় সেটা নয়, ডিডো নামটার ভেতর কেমন যেন এক রহস্য আছে।

মরক্কোয় কয়েকটি এথনিক গ্রুপ আছে, বিশেষ করে আরব, র্বাবেরী ও মিশ্র র্বাবেরী-আরব।
হতভাগ্য রাজ্যহারা রাজকুমারী ডিডো তার অনুসারীদের নিয়ে আফ্রিকার উপকূলে চলে এসে র্বাবের রাজা লারবাসের নিকট হতে এক ভূখন্ড নিয়ে র্কাথেজ নামে এক সমৃদ্ধ রাজ্য গড়ে তোলেন। দান্তের ডিভাইন কমেডীতে হতভাগ্য রাজকুমারী ডিডোর কথা আছে। ডিডোর ভাই টাইরের রাজা পীগমেলীয়ন ডেডোর স্বামীকে হত্যা করলে রাজকুমারী ডিডো আফ্রিকার উপকূলে চলে আসেন। ডিডোর আরেক নাম এলিসা। খৃষ্টপূর্ব আটশত চৌদ্দ সালে কার্থেজ নামে এক সমৃশালী রাজ্য গড়ে তোলে দেশের রানীর সিংহাসন অলংকৃত করেন। প্রাচীন মরক্কো শক্তিশালী রাজ্য কার্থেজের অধিনস্থ ছিলো। রানী ডিডো আত্মহত্যা করেন। খৃষ্টজন্মের একশত ছয়চল্লিশ বছর পূর্বে রোমান রিপাবলিক কার্থেজ অথিকার করে ধ্বংশ করে। পরবর্তী সময়ে রোমানদের দ্বারাই রোমান কার্থেজ আফ্রিকার প্রভাব বিস্তার করে ও ছয়শত আটানব্বই সালে আরবরা সমগ্র এলাকাটি দখল করে নাম দেয় ‘আল মাগরেব’। রানী ডিডো কেন আত্মহত্যা করেছিলেন সে এক রহস্য, কেউ কেউ বলেন ইনিডের প্রেমে ব্যার্থ হয়ে। তবে আজো ডিডো ও র্বাবেরী লোক মুখে বেঁচে আছে।

দীর্ঘ ভ্রমনে শরীর খুবই ক্লান্ত।
ডিনারের পাট চুকিয়ে হালকা গরম জলে গোছল করে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম। প্রায় পাঁচশত কিলোমিটার দৌড়ানোর পর শরীর ক্লান্ত। গাইড বলে দিয়েছেন রাত্রীটাই শুধু বিশ্রাম, সকালে প্রতঃরাসের পর ফেজ, ভলুবিলিস দেখার পর মেকেন্স যাবো। রাত গভীর, ঘরের ভেতর এক ঘূর্ণী বাতাশ। আবছা আলো আধাঁরীতে দূর হতে ভেসে আসছে জলপ্রপাতের টুপ টুপ জল পরার শব্দ। কিছুক্ষণ পর শব্দটা মিলিয়ে গেলো। আবার গভীর ঘুম। ঘুর্নী বাতাশে ডিডোর কণ্ঠ শুনতে পেলাম,‘ ঘড়িতে কটা বাজে?। ডেডোকি আমায় ঘুমুতে দিতে চায়না? সাইড টেবিলের উপর রেডিয়াম দেয়া ওয়াচ দেখে বললাম,‘রাত দেড়টা।’ মনে মনে ভাবলাম এবার বোধ হয় ডিডো বিদায় হবে। না তা নয়, আবার জল পরার শব্দ। টাপুর টুপুর বৃষ্টি পড়ে, নদে এলো বান। ঘুমের ভেতর এ’সব মনে আসছে কেনো? ডেডোকি চলে গেছে? ও আত্মহত্যা করেছিলো কেন? আবার জল পরার টুপটুপ শব্দ। হঠাৎ ডিডোই যেনো আমায় হাত ধরে বিছানা হতে উঠিয়ে কার্পেটের উপর দাড় করিয়ে দিলো। ঘরে বান ডেকেছে। কার্পেটের উপর পায়ের পাতা অবধি গরম জল। ঘুম ততক্ষণে ছুটে গেছে। জল পেরিয়ে বাথরুমে গিয়ে দেখি বেসিন উপচে জল গড়িয়ে টপ টপ করে পরছে মেঝেয়। দ্রুত বেসিনট্যাপ বন্ধ করে জলের উপর দাড়িয়ে রইলাম। বাথরুম জলে ভরে শোবার ঘরের কার্পেট অবধি চলে গেছে।

বাথরুমে যতগুলো তোয়ালে ছিলো সব গুলো ভিজিয়ে নিয়ে জল চিপে টয়লেটে ফেলে ঘর প্রায় জল শূণ্য করে ফেললাম। তবুও মেঝেয় জল সেঁতসেঁতে ভাবটা রয়ে গেলো। ভেবে দেখলাম ঘর ক্লিন করতে আসবে বেলা দশটার দিকে। এখন রাত দেড়টা, অনেক সময়, এর মধ্যে জল শুকিয়ে যাবে। রাজার দেশ, বলা যায়না কি ফেসাদে ফেলে। ডিডোর কথা বললে হয়তো জেলেই পাঠিয়ে দেবে। সকালে প্রতঃরাস সেরে রিসেপশানে চাবিটা ফেরত দিয়ে বললাম,‘জল পরে কার্পেট ভিজে গেছে।’ লবি পার হয়ে হোটেলের বাইড়ে এসে দাড়ালাম। চমৎকার রোদ উঠেছে। বাঁকে দিকে তাকিয়ে দেখলাম উরফড় ইধৎনধৎু একটি পুরানো গহনার সাজানো দোকান, তবে দোকানটি বন্ধ।

লিয়াকত হোসেন

ষ্টকহোম, সুইডেন
২৩-০৩-২০১৮