(১)

‘আহেন স্যার, আইজ এত দেরি করলেন ক্যা? আমি তো হেই কহন থনে রিকশা লইয়া বইয়া আছি।’ জমির আলি এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলল। রহমান সাহেব রিক্সায় উঠে বসলেন। কোন কথা বললেন না। জমির আলি একবার তাঁর মুখপানে তাকিয়ে রিক্সার প্যাডেলে পা রাখল। একটু পর রহমান সাহেব বললেন, ‘বুঝলে জমির, খোকাকে নিয়ে খুব ভয় হয় আজকাল। বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে ওঠে। ভাল লাগেনা, বড় অসহায় লাগে।’
‘ক্যান, কি হইছে খোকাবাবুর? আইজ কি বার হেই ব্যাথাডা উঠছিল নাকি?’

‘হ্যাঁ, খুব ভোরে আজ যখন ফজরেরে নামাজ পড়তে উঠেছি, তখন খোকার ঘরের পাশ দিয়ে ওজু করতে যাবার সময় গোঙানির শব্দ শুনতে পাই। সঙ্গে সঙ্গে ভেতরে গিয়ে দেখি খোকা ব্যাথায় কাতরাচ্ছে। প্রায় নীল হয়ে গেছে সমস্ত শরীর, ঘেমে ভিজে গেছে সারা গা। ভয় পেয়ে গেলাম। এর আগে কখনো এত কুঁকড়ে যেতে দেখিনি। সবাইকে ঘুম থেকে জাগালাম, খোকার পাশে গিয়ে বসলাম। বাবুকে পাঠালাম পাশের বাড়ির হারুন ডাক্তার কে ডেকে নিয়ে আসতে। তারপর তিনি ভাল করে দেখলেন খোকাকে। ব্যাথা কমার জন্য ইনজেকশন দিলেন। এরপর খোকা আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে গেলো আবার। হারুন ভাই যাওয়ার সময় বললেন খোকার অবস্থা দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। আমাকে বলে গেলেন বিকালে তাঁর সাথে দেখা করতে। যাবো আজকে – দেখি উনি কি বলেন? সেদিনতো অনেকগুলো রিপোর্ট করতে দিয়ে এলাম।’

জমির আলি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘পিরথিবিতে বালা মাইনষেরা অনেক বেশী কষ্ট পায়। নাইলে আমাগো খোকাবাবুর লাহান সোনার টুকরা ছেলের আইজ এই অবস্থা!’

অফিস গেটে এসে রিক্সা থামল। রহমান সাহেব ভাড়ার পাঠ চুকিয়ে অফিসে ঢুকলেন। আর জমির আলি যাত্রীর আশায় রিক্সা নিয়ে সামনে এগুতে লাগল, বেশ ধীরে ধীরে। অনেক গরম পড়ছে আজকাল। বেশিদূর যেতে হলনা, একটু সামনে এগুতেই একজন যাত্রীও পেয়ে গেল।

রহমান সাহেব একটি বেসরকারি অফিসে চাকরি করেন এডমিন ম্যানেজার হিসেবে। বেতন ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা বেশ ভাল। তাই সংসার ভালভাবেই চলে যায়। দুই ছেলে আর এক মেয়ে নিয়ে ছিমছাম সংসার তাঁর। স্ত্রী শাহানা বেগম একজন গৃহবধূ – অসম্ভব মমতায় আগলে রেখেছেন পুরো সংসারটাকে। বড় ছেলে খোকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় বর্ষ সম্মানের ছাত্র – খুব মেধাবি। এছাড়া ও খুব ভাল বক্তা-ভাল সংঘটক, লেখালেখির হাতও খুব ভাল। মেয়ে লতা, ইডেন কলেজে প্রথম বর্ষে পড়ছে। বিজ্ঞানের ছাত্রি। পরীক্ষার ফলাফল বরাবরই ভাল। ছোট ছেলে রানা, পড়াশোনায় তার ভাইবোনের চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছে, মাত্র ক্লাস এইট এ পড়ছে। পড়াশুনায় খুব একটা মন নেই তার। তবে খেলাধুলায় তার আলাদা সুনাম আছে। খুব ভাল ক্রিকেট খেলে। এ বছর দ্বিতীয় বিভাগে খেলছে উদিতির হয়ে। গত বছর কমলাপুর রেলওয়ে মাঠে এক ফাইনাল খেলায় খেলতে গিয়েছিল নারিন্দা যুব সংঘের হয়ে। দারুন খেলেছিল সেদিন। ব্যাটসম্যান হিসেবে সে সবসময়ই ভাল। ওপেনিং ব্যাটসম্যান। মাঝে মাঝে বল ও করে। অব ব্রেক। সেদিনের খেলায় খুব ভাল খেলেছিল। মাঠে সেদিন উপস্থিত ছিলেন উদিতির ক্রিকেট সম্পাদক। অভিজ্ঞ মানুষ। তাই প্রতিভা চিনতে ভুল করেননি। খেলা শেষ হবার পর রানার সাথে আলাপ করেন। তারপরই এ বছর দলে নিয়ে নেন ওকে।

(চলবে……)

মোস্তাফিজুর রহমান সোহেল

লেখক:
ম্যানেজিং ডিরেক্টর অ্যান্ড সিইও
অ্যাডভান্সড ইআরপি বাংলাদেশ