ভালবাসা এক বিশ্বাস, এক বন্ধুত্ব। বিশ্বাস থেকে বন্ধুত্ব শুরু হয়ে তা থেকে একসময় অজান্তেই ভালবাসা আসে জীবনে। রবীন্দ্রনাথ যতই জানতে চান না কেন, ভালবাসা কি কেবলই যাতনাময় কিনা, তিনি নিজেই বারবার প্রেমে পড়েছেন, ভালবেসেছেন, ভালবাসাকে উৎসাহ দিয়েছেন। রবি ঠাকুরের কালের ভালবাসার মাঝে ছিল প্রেমে গভীরতা, ভালবাসা হতো নিপাট। যুগের সাথে বিবর্তন হয়ে এখনকার প্রযুক্তিময় যুগে ভালবাসা অনেকটাই খুদেবার্তাতে এসে ঠেকেছে যেমন, তেমনই ভালবাসা হয়েছে অনেকটাই ঠুনকো। অবিশ্বাস দানা বাঁধে অল্পতেই। প্রযুক্তির অমানিশা, ভালবাসায় ভাঙন ডাকে তাড়াতাড়ি। রবিঠাকুরের কথাতেই বলি, “এরা সুখের লাগি করে প্রেম, প্রেম চাহে না, সুখ মিলে না!”
ভালবাসা যদি গভীর হয়, তাহলে মানুষ দূরে থেকেও কাছেই থাকে মনের মানুষের। অবস্থান করে মনের গহীন গোপনে। ভালবাসায় থাকে এক অনাস্বাদিত রোমাঞ্চ।
ভালবাসায় সুখ থাকে যতটা, তার চেয়েও বেশি হয়তোবা থাকে কান্না, কষ্ট। আসলে বিশ্বাস মাঝে মাঝে ভেঙে পড়ে ব্যস্ততায়। কাজের চাপে। হয়তোবা হাতে হাত রেখে চলা হয়না অনেকটা পথ, ঘুরে বেড়ানো হয়না রিক্সায় দু’জনে। ক্লাস শেষ করে বিগবাইটে বসাও হয়না অল্প কিছু সময়। রাতের আকাশে চাঁদ দেখে ফোনে হয়তো আর তুলনা করা হয়না চাঁদমুখের। কিন্ত তারপরেও ভালবাসা থাকে। উড়ে যায় না। হয়তো ফিকে হয়ে থাকে, কিন্ত নিঃশেষ হয়ে যায়না।
নৌকার পাটাতনে কোলে মাথা রেখে শুয়ে আকাশের নীলের মাঝে খুঁজতে থাকা নীলাম্বরী যদি ঘরে বউ হয়ে আসে, তাহলে হয়তো আকাশের নীল দেখা হয়না, বউ করে আনতে না পারলে তখন আবার আষাঢ়ের বৃষ্টিতে ধুয়ে যেতে থাকে ভালবাসা। সময়ে সেই হারিয়ে যাওয়া মানুষ আর ভালবাসা মন থেকে মুছেই যায়।
আশুলিয়ার ব্রীজে দাঁড়িয়ে, পাগলা হাওয়ার দিনে চুল উড়িয়ে ভালবাসা, নতুন প্রেমে জোয়ার আনে। লং ড্রাইভে বেড়াতে গিয়ে সন্ধ্যেবেলা হাতে হাত রেখে অটোগিয়ারের গাড়ীতে, প্রেমের গানের সিডি শুনতে শুনতে ভালবাসা স্বপ্ন দেখে বেড়ায়।


বিলেতে থেকে, ভালবাসা নিয়ে লিখতে গিয়ে একটা জিনিষ বুঝেছি, ভালবাসার প্রকাশ, ব্যাপ্তি আমাদের দেশের মাটিতে আড়াল হবার জায়গা কম হলেও ভাল। উন্নত বিশ্বের প্রযুক্তিময় জীবনে, কিছু মানুষ ভালবাসা খোঁজে শুধুই শরীরে। পরিণতি থাকে খুব কমই এখানকার ভালবাসায়, অনেকটাই যেন রোজকার খবরের কাগজের মত। পড়া হলেই যেমন ছুড়ে ফেলা যায়, একটু মতান্তর হলেই হয়ে যায় “ব্রেক আপ”! তাতেই আবার ক্ষান্ত দেয়না। দুজনেই নব উদ্যমে নতুনের খোঁজে ছোটে। এটাকে ঠিক ভালবাসা বলা যায়না। সম্পর্ক গড়ে ওঠা একটা সময়ের ব্যাপার। আবেগের ছোঁয়া থাকে সেখানে। আবেগ যদি বেগবান হয়ে যায়, তাহলে সম্পর্ক ভিত পায়না। হারিয়ে যায় টিউবের ভিড়ে। অথবা শুক্রবার সন্ধ্যে বেলার বন্ধু বান্ধবের আড্ডায়, নাচের ফ্লোরে, পানীয়ের বহতায়। শনিবার সকালে ঘুম ভাঙে হয়তো কোনো আগন্তুক এর পাশে। ঘোরে কাটানো সময়ের হিসেব মেলেনা। গভীরতাও পায়না।
আবেশি ভালবাসা বাঙালী খোঁজে, কথাটা পুরো ঠিক না। পশ্চিমারাও খোঁজে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এরা কিন্ত একই ভালবাসার মানুষের সাথেই কাটায়। এমন ছবি খুব বিরল নয়। এদেশেও মানুষ যুগ যুগ ধরে ভালবেসে সংসার করে। রজত জয়ন্তী, হীরক জয়ন্তী করে। মানিয়ে নিয়ে, হাতে হাত ধরেই দিন পার করে।
এবার আসি বর্তমান প্রজন্মকে নিয়ে। ভালবাসা যেন এদের কাছে এক ধরণের খেলা। প্রেম যেন এক ধরণের আচ্ছন্নতা। দু-দন্ডের ভাল লাগা হাসাহাসি থেকে পাগল করা ভালবাসার সূত্রপাত হলেও স্থায়ীত্ব হয় কম, অনেকটাই যেন চাইনিজ জিনিষ। বিয়ে করে ধুমধাম করে। তারপরেই একে অন্যকে আর মেনে নিতে, মানিয়ে নিতে পারেনা। অস্থির এক প্রজন্মের অস্থিরতার ভালবাসা।
সময়ের আবর্তনে মানুষ এখন এতটাই বেগবান যে সম্পর্ক টেকা না টেকাও যেন বেগের সাথে তুলনীয়। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, বোঝাপড়া, সহমত পোষণ অনেকটাই রঙিন ফানুস। পুরোটাই ফাঁপা। সম্পর্ক এখন প্রযুক্তি নির্ভর। ২৪৪১১৩৯ এ বার বার কল দেবার অধৈর্য এখনকার বেলা’কে খুঁজতে দেয়না। বেলাকে ফোনে না পেলে মেলাতে হাজির হয়ে অন্য কাউকে ভাল লেগে যায়। বেলা’রা তখন হারিয়ে যায়। তিনদিন বাড়িতে গিয়ে না পাওয়া বন্ধুর খোঁজে এখন দুশ্চিন্তা কম হয়। ফেসবুকে স্ট্যাটাস থেকে খুঁজে নিয়ে জেনে নেয় কে কোথায় আছে। এমনই হয়েছে আমাদের জীবনধারা।
বড় অসহায় আর একাকীত্ব এই জীবন, কুড়ে কুড়ে আসক্ত করে বিভিন্ন নেশার আশ্রয়ে। সর্বনাশা নেশাই হয় আমরণ ভালবাসা। ফেসবুকের কল্যানে ঠুনকো হয়ে যাচ্ছে আমাদের আবেগ, হাতে হাত রেখে কথা বলা, অপেক্ষার প্রহর কাটানো। সময়ের সাথে সাথে প্রযুক্তির ভরে আমরা নির্ভার হতে পারছিনা। তাই এখন আর “নিশা লাগিল না, বাকা দুই নয়নে নিশা লাগিল না”!
তবুও ভালবাসা চিরন্তন, ক্ষমতা পাওয়ার ভালবাসা, স্বার্থপর ভালবাসা, বিত্তবৈভবের ভালবাসা, লোক দেখানো ভালবাসা, সবই থাকবে। শুধু গভীরতা কমে যাবে।
মানুষ মানুষকে ভালবাসা কমে যাচ্ছে, তবে সন্তানের প্রতি পিতামাতার ভালবাসাই শুধু বাড়ছে। যে মা সন্তান ছাড়া দূরে থাকেন, তার সময় খুব তাড়াতাড়ি কাটেনা। অস্থিরতা থাকে মন জুড়ে। বাবারা ব্যস্ত থাকে নিজেদের কাজে, সন্তান কাছে থাকলেও দেখা হয় পালাপার্বণে!

চলবে ….

তৌফিকুল করিম সুহৃদ
লেখক: ডিরেক্টর, ফিঙ্গারটিপস ইনোভেশন লিমিটেড