জাপান থেকে রওনা হয়ে সূর্য যখন চলতে চলতে অর্ধেক পথ পেরিয়ে আসে, তখন বিলেতে আলো দেখা যায়। জাপান আর অস্ট্রেলিয়া কাছাকাছি সময়েই আলোকিত থাকে প্রায়, যদিও শীতকাল দু’জায়গায় দুই সময়ে। আলোর নাচনে সারা পৃথিবী যখন সারা দেয়, তখন মানুষ কোথাও থাকে জীবনধারণ করতে ইঁদুর দৌড় নিয়ে ব্যস্ততার মাঝে, কোথাও কেউ থাকে অবসর বা ছুটি কাটানোতে। আর কেউ বা কোন এক প্রান্তে তখন অন্ধকার বলে রাতের ঘুমে ব্যস্ত থাকে। সময়ের এই ছুটে চলার পথেই সূর্য ব্যস্ত সময় কাটায়।
রোদবৃষ্টি আলোকের এই ঝর্ণা ছড়িয়ে, সময়কে নিয়ে অফুরান ছুটে চলাই জীবনের ধারাবাহিকতা। কখনো যখন মেঘের আড়ালে সূর্য লুকিয়ে থাকে, তখন কিছু মানুষ থাকে সেই বৃষ্টির আবেগে উতলা, আনমনা। কবি যখন এই বৃষ্টির সাথে নিজের সৃষ্টি নিয়ে ব্যাকুল, তখন কিন্ত ঠিকই প্রকৃতির নিঠুরতা কিছু মানুষকে বাস্তব জীবনে ছাদহীন প্রতিকূলতা মেনে নিয়ে বাচতে লড়াই করাচ্ছে। বাস্তবতা এমনই।
গ্লোবাল ওয়ার্মিং হোক আর পরিবেশ দূষণই হোক, প্রকৃতি এখন সব দেশেই বেশ রূঢ়। আপন মর্জিতে সবাইকে ভোগায়। আমাদের দোষ, আমরা পরিবেশ ধ্বংস করছি। পানির অপচয় করছি। দক্ষিণ আফ্রিকা অনেকটাই সেই পানিশূন্যতা নিয়ে কঠিন সময় পার করছে। সেই একই অবস্থা আস্তে আস্তে সারা পৃথিবীর সব দেশেই আনছে অশনি সংকেত। সময় থাকতে আমরা কেউই পরিবেশ নিয়ে মাথা ঘামাই না। তাই সময় চলে গেলে কিছুই করার থাকবেনা, খুবই স্বাভাবিক। বৈশ্বিক আবহাওয়া নিয়ে ট্রাম্প যখন বুড়ো আঙুল দেখিয়ে যাচ্ছে, তখন অন্যরা পরিবেশ নিয়ে চিন্তিত এবং উদ্ধারে শুধু পরিকল্পনা আর আলোচনাই করছেন। কাজের কাজ কতদূর আগাচ্ছে, তা বিতর্কের অবতারণা করতেই পারে। আসলে ভুগবো তো বেশী আমরাই, বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সিংগাপুর, মালদ্বীপ, মরিশাস, এমন সব দেশগুলোই। আমাদের এমনিতেই জনসংখ্যা বেশী, জায়গার তুলনায় আমাদের মানুষ বেশী। তাই আমাদের চিন্তাও বেশী। পরিবেশের এই বৈরী আচরণ আস্তে আস্তে বেশ প্রকট হচ্ছে। সকালের শুভ্রতা আজকাল খুব কমই থাকে, বেশী থাকে আকাশের কান্নাভরা বর্ষণ। বর্ষণের চাপে তলিয়ে যাবে আস্তে আস্তে আমাদের সভ্যতা। হারিয়ে যাবে আমাদের অস্তিত্ব।
পরিবেশ নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা, আমজনতার একদমই নেই। কারণ, আমাদের মত আমজনতাকে যারা এই পরিবেশ নিয়ে কাজ করছেন, তার ঠিকমতন বুঝাতে পারছেন না। ঠিকমতন না বুঝতে পারায় আগ্রহ নেই বলা যায় পরিবেশ রক্ষার ব্যাপারে, উদ্বিগ্নতা তো অনেক পরের ব্যাপার। সমাজকে সচেতন করতে, শিশুদের স্কুলের পাঠক্রমেই পরিবেশ বিষয়ে সময়োপযোগী শিক্ষা দিতে হবে। মান্ধাতার আমলের নিয়মের পাঠ না। আমাদের কীসে ক্ষতি, কীসে রক্ষা, তা নিয়ে সহজ ভাষায় বলতে হবে। কঠিন ভাষা আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ বোঝে কম, তাই প্রয়োগ হয় তার চেয়েও অনেক কম। জানতেও পারেনা ক্ষতির কারণ আর ক্ষতির পরিমাণ কতটা হতে পারে! ব্যবস্থাপনা খারাপ বলেই এমন অবস্থা আমাদের। যতই কিছু হোক না কেন, বাংলাদেশ পরিবেশ নিয়ে যা করেছে, যতটা করেছে, তা নিঃসন্দেহে সারা বিশ্বকে তাক লাগিয়েছে। খাওয়ার পানির সুরক্ষাকরণ, খাবার ঢেকে রাখা, পোকামাকড় নিধন, পাকা পায়খানার প্রচলন আর ব্যবহার, সবকিছুতেই আমরা অনেক আগানো। শিশুদের স্বাস্থ্য আর শিক্ষা আর একটু ভাল করলেই আমরা আরও বড় কিছু করে দেখাতে পারবো। পরিবেশ নিয়েও তাই। আমাদের পারিপার্শ্বিকতা, আমাদের চাহিদা, আমাদের বাস্তবতা আমাদের শিখিয়ে দেয় প্রতিকূলতা মোকাবেলা করার। নাহলে প্রকৃতির আক্রোশ সামাল দিয়ে বড় বড় ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলা করে আমরা টিকে আছি কি করে! সাহস করেই তো, মনের জোরেই তো! আমাদের দেশের মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করতে করতেই সাহস পাচ্ছে বাচার, বাচতে শিখছেও।
আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের দেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করার কথা যখন পরিবেশ সম্মেলনে বলেন, আমার মনে হয় উনি আমাদের দেশের মানুষের সাহসিকতা নিয়ে গর্ব করতে পারেন। প্রাকৃতিক এসব দুর্যোগ থেকে লড়াই করে বেঁচে থাকা জাতি আমরা। বন্যা, ঝড়, ক্ষরা, এসব আমরা ভুগছি, উন্নত বিশ্বের বিশ্বায়ন প্রতিযোগিতার ফল থেকেই। গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর জন্য যতটা পরিবেশ আক্রান্ত হয়েছে, প্রযুক্তিগত উন্নতিতে আর ব্যবহারে যতটা রেডিয়েশন এফেক্ট বেড়েছে, তাতে পরিবেশ খুব দ্রুতই পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। সময় অনেকটাই চলে গিয়েছে। আমাদের এখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। গত দশ পনের বছরে যতটা পরিবেশ বিপর্যয় বেড়েছে, তা বেশ ভয়াল।
অতিরিক্ত গরম, শীত, বর্ষা, ঝড়, এসবই আমাদের নিজেদের তৈরি। আমরা যতই একে অন্যকে দোষারোপ করি না কেন, আমাদের পরিবেশ আমরাই ধ্বংস করছি, আমরাই নষ্ট করছি।
সুকান্তের “দুর্মর” কে উদ্ধৃত করেই লেখাটা শেষ করছি, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে জবাবদিহিতা করার দুঃসাহস আমার আর থাকছেনা……..

হিমালয় থেকে সুন্দরবন, হঠাৎ বাংলাদেশ
কেঁপে কেঁপে ওঠে পদ্মার উচ্ছ্বাসে,
সে কোলাহলে রুদ্ধস্বরের আমি পাই উদ্দেশ
জলে ও মাটিতে ভাঙনের বেগ আসে।

হঠাৎ নিরীহ মাটিতে কখন
জন্ম নিয়েছে সচেতনতার দান,
গত আকালের মৃত্যুকে মুছে
আবার এসেছে বাংলাদেশের প্রাণ।

“হয় দান নয় প্রাণ” এ শব্দে
সারা দেশ দিশাহারা,
একবার মরে ভুলে গেছে আজ
মৃত্যুর ভয় তারা।

সাবাস, বাংলাদেশ, এ পৃথিবী
অবাক তাকিয়ে রয়ঃ
জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার
তবু মাথা নোয়াবার নয়।

এবার লোকের ঘরে ঘরে যাবে
সোনালী নয়কো, রক্তে রঙিন ধান,
দেখবে সকলে সেখানে জ্বলছে
দাউ দাউ করে বাংলাদেশের প্রাণ।।
পরিশেষে এসে কবির সাথে মিলিয়েই বলবো, আমরা ঘুরে দাঁড়াই আমাদের অদম্য সাহস আর বুকের মাঝে ভালবাসার জোরেই। পরবর্তী প্রজন্ম যেন কিছুটা ভাল কিছু আমাদের কাছে প্রত্যাশা করতে পারে তাই আমাদের যেন চেষ্টায় কোন ত্রুটি না থাকে। ভালবাসার সামান্য ছোঁয়া যেন আমাদের কাছ থেকে পায় আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধরেরা!!!!

তৌফিকুল করিম সুহৃদ
লেখক: ডিরেক্টর, ফিঙ্গারটিপস ইনোভেশন লিমিটেড