হঠাৎ করেই খেয়াল চাপলো যে পাশের দেশ জার্মানী থেকে একটু ঘুরে আসি। ব্যস, ‘ওঠ্‌ ছুড়ি তোর বিয়ে’-র মত ট্রেনে চেপে বসলাম। আমি এমনিতে কিন্তু হুজুগে বাঙালী নই, তবে বিদেশে এসে বোধহয় বাঙালীআনাটা বেড়ে যায়। তাই আমাকেও হুজুগ পেয়ে বসলো। ইউরোপের এই শেঙ্গেন-ভূক্ত দেশগুলো যেন নিজেদের মধ্যেকার রাজনৈতিক সীমারেখাগুলো ম্যাপ থেকে মুছে ফেলেছে। এদের মধ্যে অবাধ যাওয়া আসা সৌহার্দ্যের সবচেয়ে বড় উদাহরণ। শেঙ্গেন-এর যেকোন একটা দেশে ঢুকলে অন্য দেশগুলোতে যাওয়া মানে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়া। কেউ কোথাও আপনাকে থামাবে না, কিছু জিজ্ঞেসও করবে না! তারপরও তাদের নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় আছে, নিজ নিজ সরকার, অর্থনীতি রয়েছে। এক দেশের মধ্যে দিয়ে আরেক দেশের মাল-বোঝাই ট্রাক গেলে তাদের জাতীয় নিরাপত্তা ক্ষুণ্ণ হয় না। দেশও অন্য দেশের কাছে বিকিয়ে যায় না। অনেকগুলো দেশ মিলিয়ে যেন একটা দেশ। আমি বলি ‘দেশপুঞ্জ’। পাকিস্তান, ভারত, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান মিলিয়ে কি এমন দেশপুঞ্জ কোনদিন সম্ভব?

জার্মানীর ড্যুসেলডর্ফ শহরটা আমার খুব চেনা। প্রতি বছরই আমার এখানে অন্ততঃ একবার আসা হয়। আমার বাঙালী মামা ও জার্মান মামী থাকেন এখানে গত সত্তর বছর ধরে। এঁদের অনুপ্রেরণায়ই (আর স্টেফী গ্রাফের প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে) জার্মান শিখেছিলাম ছোটবেলায় আমি। ভালই বলতে-লিখতে পারতাম। এখন কাজ চালানোর মত পারি। রোববার, তাই দোকানপাট সব বন্ধ। মামা-মামীর সাথে ঘন্টা খানেক গল্পস্বল্প করে রাস্তায় হাঁটতে বেরিয়ে পড়লাম। অদূরেই রাইন নদী। তার তীরে আল্টস্টাড বা পুরোনো শহর। ইউরোপের শহরগুলোর পুরোনো অংশেই যতরকম হই-হুল্লোড়, ভাল রেস্তোঁরা আর পর্যটকদের ভীড়। আমাদের পুরোনো ঢাকাতেও ভাল খাবারের দোকান আছে, কিন্তু বাড়ীঘর, রাস্তাঘাট এতটাই অবহেলিত, যে সেখানে কেউ হই-হুল্লোড় করতে যায়না।

আমার সফরসঙ্গীরা আজ ব্রাসেলস্‌ থেকে গেছেন। আর আমি বাড়ীর পথে। আবার সেই আবু-দু’ভাই! একটা জিনিস ভেবে বেশ আরাম লাগছে যে শৌচকার্যে আর কাগজ ব্যবহার করতে হবে না। জানিনা, বিদেশীরা পানি বাঁচিয়ে করেটা কী! ডিজিটাল যুগে যখন সবকিছু আস্তে আস্তে পেপারলেস হয়ে যাবে, তখন ওরা টয়লেটে যাবে কীভাবে? ব্রাসেলসের হোটেলে অবশ্য ফ্রেঞ্চ বিডে ছিল। কিন্তু সে তো’ আরেক ঝামেলা! শৌচালয়ে ফরাসী দেশ থেকে এরা প্রক্ষালন যন্ত্র আমদানী করেছে ঠিকই, কিন্তু আলু-ভাজা বা ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের ব্যাপারে বেলজিয়রা দাবী করে ফরাসীরাই ওদের এই বিশ্বজয়করা খাবারটা চুরি করেছে। সরু সরু করে আলু কেটে তেলে ভাজাটা নাকি আসলে বেলজিয়ামেই শুরু। কিন্তু কেমন করে কোন ফাঁকে যেন ফরাসীরা সেটাকে নিজের বলে দাবী করে সারা বিশ্বের সাইড-ডিশের রাজা হয়ে গেল। ইশ্‌… আমাদের বাঙালীদের আলুর ঝুড়ি ভাজাটাকে শুধু যদি প্যাকেজিং করতে পারতাম!

যাক্‌গে, বেল-জ্বী-আমে বেল-আম দেখলাম না, ব্রা-সেলস্‌-এ কিছুর সেলও পেলাম না, বুরুজে কোন বুরুজ ছিল না, আর আবুর দ্বিতীয় ভাইয়ের নাম জানতে পারলাম না ঠিকই, কিন্তু এটা বুঝলাম যে জাতিগত দিক থেকে বেলজিয়রা বেশ ভদ্র ও সম্মানিত। সাধে কি আর ন্যাটো-র প্রধান কার্যালয় এ শহরে অবস্থিত? আর যে দেশে টিনটিন-এর জন্ম, সেদেশটাকে আমার ভাল লাগার আর দ্বিতীয় কারণ খোঁজার দরকার নেই!

ডায়েরীর পাতা এবারের মত ফুরলো… নটে গাছটি মুড়লো!

সৈয়দ আলমাস কবীর
লেখক: প্রেসিডেন্ট, বেসিস