মাহে রমজান! মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার মাস শুরু হলো। আমরা সবাই এই মাসে খুব আল্লাহ ভক্ত হই। মাস শেষে আবার যেই কে সেই। আসলে আমাদের তো স্থিরতা কম, তাই এমন হয়।
রোযার মাসে আল্লাহ মানুষকে সব কিছুতে সংযমী হতে বলেছেন। বেশী বেশী নামায পড়তে, কোরআন শরীফ পড়তে বলেছেন। আমাদের ছোটবেলায় মোটামুটি একটা নিয়ম ছিল, রোযার সময় যেন কোরআন শরীফ একবার খতম দেয়া যায়। তারাবীহ নামাযের খতম তো থাকতোই। সেই তারাবীহ পড়ার সময়েও সাধারণত হুজুরকে আগে বলে দিতাম আমরা, কোনদিন তাড়াতাড়ি শেষ করা লাগবে, খেলা আছে, টিভিতে কোন নাটক আছে, ম্যাকগাইভার আছে, এইসব অজুহাতে।
বিলেতে যখন ইফতারের সময়, বাংলাদেশে আমরা সেই সময় তারাবীহ পড়া শেষ হয়ে যেত প্রায়সময়। ন’টা কিংবা দশটায়। এখন কখন হয় ঠিক জানিনা।
আমি স্বামীবাগে থাকার সময় তারাবীহ পড়ার সময়, আমি আর সুজন সবসময় একসাথে দাঁড়াতাম। সবসময় এই অলিখিত নিয়মটা ছিল। সুজন, আমার ছোট হলেও, আমার সাথে খুব ভাল বন্ধুত্ব ছিল, এখনো আছে। মাঝেমধ্যে, তৌফিক, বাপ্পা, বা জয়ও থাকতো। শব ই বরাত এ মসজিদে যেতাম না, কিন্ত তারাবীহ পড়তে যেতাম।
আমাদের ছোটবেলার অবস্থা এখন নেই, এখন তারাবীহ নামায নাকি সাত দিন বা দশদিনের চুক্তিতে শেষ হয়। আল্লাহর নামাযের সাথেও কত চুক্তি। আহারে। কই যাই!! আসলে সবকিছুই বদলে যায়। সময় বদলে দেয়। সময়ে মানুষ পরিবর্তন হয়ে যায়। নিয়মও বদলে নেয়। বদলে যায়। যেভাবে সুবিধা হয় নিজেদের, সেভাবেই নিয়ম করা হয়।
সামাজিক জীব হিসেবে, মানুষই সবকিছু বেশী বদলায়, নিজেও তাই নিজেকে বদলায়। সামাজিকতা বাড়ে। আসলেই কতটা বাড়ে, তা বলাই বাহুল্য। এখনকার বাস্তবতা থেকে বলা যায়, সামাজিকতা বলতে শুধুই ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম, টুইটার! এই প্রজন্ম সামাজিকতার সংজ্ঞাতে এইগুলিকেই বলবে। কয়েক বছর আগেও এমন ছিল না। মানুষ, আত্মীয় পরিজন নিয়েই বেশী ব্যস্ত থাকতো। সামাজিকতার সংজ্ঞা তখন ছিল, চাচা ফুপু, মামা খালা, ভাইবোন মিলে একসাথে হওয়া, একান্নবর্তী পরিবার ব্যবস্থা না থাকলেও একসাথে ঈফ্তার, ঈদ উপলক্ষে একসাথে খাওয়া, জন্মদিন, মৃত্যুদিন আসলে একসাথে হওয়া। এখনকার প্রজন্ম, দুঃখজনক হলেও সত্যি এসব জানেনা, জানবেও না। আসলে আমাদেরই ব্যর্থতা। আমরাই হয়তো শেখাইনি, শেখাতে পারিনি।
স্মার্ট ফোন আসার পরে থেকেই আমাদের সামাজিকতা বাড়াতে গিয়ে, আমাদের অবক্ষয় আসলে বাড়ছে। বাড়ছে আমাদের নিজেদের মাঝে ভেদাভেদ। আমরা অল্পতেই হয়ে যাচ্ছি অসহিষ্ণু।
যে কথায় ছিলাম সেখানেই আসি। রোযার মাসে এখন আমাদের সামাজিকতা, আমাদের আপ্যায়ন, ব্যায়ের হার যেভাবে বাড়ছে, তাতে রোযার মাস সংযমের মাস বলে মনেই হয়না। একজন আরেকজনে যেন এক ধরণের অঘোষিত প্রতিযোগিতা হয়, না বলতেই। কে কতগুলি ইফতার পার্টিতে যেতে পারলো, কতজন কে দাওয়াত করলো, কোথায় খাওয়ালো, এইসব নিয়েই। এই কি আমাদের সংযম?
আগে ইফতারের সময় পুরানো ঢাকায় ফকির মিসকিন আসতো, সুর করে ইফতার চাইতো। আমি বলছিনা সেই ভিক্ষাবৃত্তি চলুক, কিন্ত মানুষ তাদেরকে সামর্থ্য অনুযায়ী দিতো। তাতেই মনে হতো কিছু সওয়াব তো পাওয়া গেলো। এখন হয়তো সেই ডাক শোনা যায় না। হয়তো আমাদের মানুষদের সেই অভুক্ত থাকার সময় শেষ। অবশ্যই বলবো, আলহামদুলিল্লাহ। ভাল লক্ষণ। কিন্ত এখন যা হয়, তা কি আদৌ সংযমের কোন উদাহরণ! সেহরী পার্টি, পাচ সাত বছর আগেও কিন্ত ছিলোনা, ইদানীং বেশী হচ্ছে। অনেকটাই তথাকথিত কর্পোরেট কালচারের কথা বলবে সবাই। কিন্ত কর্পোরেট কালচার, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানী কি আগে ছিলো না বাংলাদেশে? তখন আরও বনেদী ভাবে ছিল। বনেদীয়ানা ছিলো। এখন যা হচ্ছে তা বনেদীয়ানা না, অনেকটাই আদেখলাপনা। শুনতে খারাপ, কিন্ত এটাই বাস্তবতা এখনকার।
যাকাত বা ফিতরা দিতেও আজকাল বিশাল আয়োজন! কেন? কোথাও কি কোরআন শরীফে আছে, এত আয়োজন করে দেয়ার জন্য? মনে হয় না, যতটুকু পড়েছি, জেনেছি, তাতে শিখেছিলাম, যদি ভুল না হয়ে থাকে, আমার ডানহাত যেন না জানে আমার বামহাত কি দান করলো! সেই অবস্থা এখন উধাও। এখন যেন ঢাকঢোল পিটিয়ে যাকাত দেয়া, দিতে গিয়ে মানুষ পদদলিত করানো, অনেকটাই ফ্যাশন। ধর্ম পালনেও কত স্টান্টবাজি। এইভাবে ধার্মিকতা দেখানো আসলে কতটা সিদ্ধ, তা আমি জানিনা। শুধু এইটুকুই জানি, আমরা এই শিক্ষা পাইনি। না বাবা-মা’য়ের কাছে, না স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকার কাছে। মিশনারি স্কুলে পড়লেও, আমাদের ইসলামিয়াত পড়ানোর বারী স্যার যা শেখাতেন, তারচেয়ে বেশী শিখেছিলাম, সরকার স্যার, পাল স্যার, রেহানা ম্যাডাম, মাইনুদ্দিন স্যারের কাছে, অনেকটাই গল্পের ছলেই শিখিয়েছেন। এখনো মাথায় সেই শিক্ষাই ঘুরতে থাকে, তাই খুব অসহায় মনে হয় নিজেকে। আসলে কি শিখেছিলাম! যা শিখেছিলাম, তা কতটা ঠিক শিখেছিলাম, নাকি আসলে কিছুই শিখিনি।
বিলেতে রোযার সময় আসলে, সব জায়গায়, বিশেষ করে সুপারমার্কেটগুলোতে এক ধরণের প্রতিযোগিতা শুরু হয়, কে কতটা বেশী সম্মান দেখিয়ে দাম কমাতে পারে, রমজান উপলক্ষে। তাও আবার Tesco, Sainsbury, Asda’ র মত জায়গায়! আর আমাদের দেশে, মুনাফা বাড়াতে, আমরা কি করি? সাধারণ সময়ের চেয়েও অনেক বেশী লাগামছাড়া ব্যবসা করি। মুনাফা করি। অনেকটাই সেই রোযার সময় এক রাকাত নামাযে সত্তর রাকাতের সোয়াব পাওয়ার মতন, এক জিনিষেই সত্তর না হলেও পঞ্চাশগুণ লাভ করতে। কি পৈশাচিক নির্মমতা। ক’জন মানুষ পারে এই লাগামহীন জীবনে মানাতে। ভদ্রতা রেখে বেচে থাকার তাগিদে সবাইই আমরা শুধুই মানিয়েই নিতে চেষ্টা করি এভাবে এসবের সাথে। যেন এইটাই এখন রোযার মাসের শিক্ষা।
অবক্ষয়ের মাত্রা এখন হয়তো আর নাই। তাই মধ্যবিত্ত মানুষের, নিজেকে অনেকেরই এখন মনে হয় অযোগ্য, অসামাজিক। ফলাফল, পরবর্তী প্রজন্ম হচ্ছে, অবাধ্য, বেয়াদব, অজ্ঞানতার শিকার। যাদের নেই জানার আগ্রহ, নেই ভাল কিছু শেখার ইচ্ছা। নৈতিকতা, সম্মান করা, শ্রদ্ধা করা এখন ফেসবুক, টুইটার আর ইন্সটাগ্রামের বদৌলতে বিদেশীদের জন্যই তোলা। আমার এই ফালতু রচনা, তাই এদের ভাষায় অনেকটাই হবে বোরিং, ব্যাকডেটেড। কারো কারো কাছে হয়তোবা, হাসির খোরাক। যদি একটুও ধৈর্য ধরে পড়ে, তাহলে বলবে, LOL!!! How silly this guy is!!!
আসলেই হয়তোবা আমার লেখা, আমার শিক্ষা, সবটাই silly। ঠিকমতো শিখতে পারিনি হয়তো কখনওই কোন কিছু ঠিকমতন! তারপরেও বলবো, জিপিএ ফাইভ পাইনি, হাতেগোণা প্রশ্নব্যাংক থেকেও শিখিনি। তিন ঘন্টা লিখে, মাথা উঁচিয়ে এখনো চলছি, হয়তো এই প্রজন্মের সাথে ঠাটবাট না দেখাতে পারি, শোঅফ করা, স্টাইলিশ না’ও হতে পারি। নিজের যোগ্যতায়, মেধায়, নিজের পরিচয়েই বেচে আছি, বড়দের দেয়া শিক্ষায়, অশিক্ষায় না।
রোযার ফযিলত নিয়ে জ্ঞান দিয়ে ফেসবুক ভরাতে পারিনা, ঈদের শপিং করতে ব্যাংকক, সিংগাপুর, মালয়েশিয়া যাইওনি। ঢাকার বাজারই যথেষ্ট। দেশী উদ্যোক্তা, আড়ং, দেশী দশ, নাগরদোলা, অঞ্জন’স, কেক্র‍্যাফটেই আমাদের ফ্যাশন আটকে থাকতো ঈদে।
সবগুলি রোযা রাখা নিয়ে আমাদের প্রতিযোগিতা চলতো। গ্যাস্ট্রিক, আলসার, বা অন্য কোন অসুখের অযুহাতে রোযার মাসে রোযা না থাকার ছুতা আমরা খুঁজতাম না কখনওই। রোযার মাসে রোযা আর নামাযেই আটকে থেকেছি। বড়জোর ঈদের পাজামা পাঞ্জাবী, শার্ট প্যান্ট পাওয়া পর্যন্ত। ব্র‍্যান্ডেড স্নিকার্স, সু থাকতো কম। মাথায় ছিল, বড় হয়ে পড়তে হয় দামী জিনিষ যোগ্য হয়ে। শো অফ করতে না।
রোযার শিক্ষার অ্যাপ্স হয়তো এখনো পাওয়া যায়নি ডাউনলোড কর‍তে, তাই হয়তো এমন হচ্ছে। আবারো সেই একই জায়গায় আসলাম, আইটি কোম্পানীর দোষ, করতে পারেনি কিছু জরুরী অ্যাপ্স, তাই শিখতেও পারেনি আমাদের স্মার্ট প্রজন্ম!

তৌফিকুল করিম সুহৃদ
লেখক: ডিরেক্টর, ফিঙ্গারটিপস ইনোভেশন লিমিটেড