ধানমন্ডিতে হটহাট রেস্টুরেন্ট এখনো আর আছে কিনা জানিনা, তবে ওখানে বসেই কফি আর স্যান্ডউইচ খাওয়া হয়েছিল সাতানব্বইয়ের একদিন দুপুরের পরে। হাল্কা কিছু কথাবার্তা, তারপরে কিছুক্ষণ গাড়ীতে করে ঘুরে বেড়ানো, হাল্কা বৃষ্টিতে গাড়ীর গ্লাস নামিয়ে হাতে বৃষ্টির ছাট লাগানো। বৃষ্টিটা খুবই কম সময় ছিল। এতটা ট্রাফিক জ্যাম তখন ছিলোনা ঢাকায়। আশুলিয়া পর্যন্ত রাস্তাটুকু যেতে খুব একটা সময় লাগেনি। নামতে না চেয়েও গাড়ী থেকে নেমে দাঁড়িয়ে টলটল পানির স্রোত দেখা।
ছুটির দিন ছিল না। তাই রাস্তায় দাঁড়াতে অসুবিধা হয়নি। পথের ধারে দাঁড় করানো গাড়ীতে কে হেলান দিলো, কেউ ততটা খেয়াল করবেনা। করেওনি। নদীর পারের বাতাসে চুল উড়ছিলো। খোলা চুল, কিছুটা অবাধ্যতা থাকবেই। গাড় নীল আর লাল নক্সার একটা খুব সাধারণ সালোয়ার আর সেইটার সাথে মেলানো কামিজ। খুব রেখেঢেকেই নিজেকে উপস্থাপন। দৃষ্টিনন্দন, রুচিসম্মত।
হাতে কিন্ত হাত ধরা হয়নি কখনওই। কথা হয়েছিল কয়েকবারই। তাতেও ছিল দুজনের’ই সীমাবদ্ধতা, এক ধরণের আড়ষ্টতা। আপনি করেই কথা বলেছিলো দুজনে। বন্ধুত্ব হতে সময় দিতে হয়, জানতে হয় দুজনে দুজন’কেই। হুট করে ভাল লাগায় খুব প্রগাঢ় প্রেম এসে যায় না। প্রথম দর্শন এর প্রেম একটা সময়ে আসলেও, বুদ্ধিদীপ্ত মানুষের কাছে কমই আসে সেভাবে। কথায় কথায় দিন পেরুনো তেমন একটা হয়নি। গোপনীয়তা রাখবো বলে কথা দিয়েছিলাম, রেখেছিও সেই অনুরোধ। কোন জোর খাটানো ছিলোনা, ছিল এক ধরণের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, আর সম্মান। অনেক ব্যস্ততা ছিল দুজনেরই। বাড়ছিলো তা ক্রমশই। পরিণতিতে দুজনের মাঝে যোগাযোগ কমেছিলো ঠিকই, কিন্ত ভাললাগাটা ছিল। হারিয়ে যায়ওনি, মরচেও ধরেনি।
কথোপকথন অনেক দিন পরে আবার শুরু হয়েছিল, যখন দুজনের মাঝে যোজন যোজন দুরত্ব। অবস্থানগত, সময়গত। হঠাৎ করেই আবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দুজনকে দুজনের খুঁজে পাওয়া। এক লহমায় মনে পড়লেও একটু বাজিয়ে নেয়া। পরিশীলিত আলাপন। দূরে থেকেও দুরত্ব বজায় রেখেই হয়েছিল। কেমন একটা অগোছালো, আনমনা ভাব এসেছিল যেন। নাকি বোঝারই ভুল ছিল। তবে হ্যা, সহ্যাতীত পরিবর্তন হয়েছিল তোমার মাঝে। হয়তো কোন গভীর রক্তক্ষরণ ছিল অন্তরে। হারিয়ে যেতে যাইতে সবসময়ই, খুবই ভয়ের কথা যদিও, তবে হাসতাম। তাতে কপট রাগ ছিল তোমার। ছেলেমানুষি অভিমানিনী। গোঁ ধরে জিজ্ঞেস করেছিলে একবার, হারিয়ে গেলে কি করবো? বলেছিলাম কোনভাবে হারাবে তার উপর নির্ভর করবে। দেশ থেকে হারালে চ্যালেঞ্জ করেছিলাম, খুঁজে বের করবোই। আর জীবন থেকে হারালে বলেছিলাম, তুমিই খুঁজে নিও আমাকে। ২০০৮ কি ২০০৯ এ যখন আবার দ্বিতীয় পর্যায় কথার আলাপন করতে শুরু করেছিলাম, আগেই বলেছিলে, যখন তুমি আমাকে কিছু বলবে, তখনই যেন আমি যোগাযোগ করি, উত্তর দেই, কথা বলি। আগ বাড়িয়ে যেন না করি। করিওনি কখনওই, জানতাম করলে রেগে যাবে, তাই রাগাতাম না। রাগাইনি কেন তার অভিমানের জবাবদিহিতা কিন্ত ঠিকই যেচে নিয়েছিলে। আমার সদাহাস্যকর এক উত্তরে বলেছিলে, শুধুই একটা কথা, ভালই! পরে বলেছিলে, পারোও বটে। কি করে পারি, জানতে চেয়েছিলে। তার কোন সদুত্তর হয়তো মনোঃপুত হয়নি তোমার। তাই কথা বেশীদুর আগায়নি। ২০১২ আর ২০১৩ তে শুধুই শুভেচ্ছা পাঠিয়েছিলাম। জানতাম অনুরোধ ছিল, না পাঠানোর। কিভাবে যেন উত্তর পেয়ে গিয়েছিলাম, রাগ ছিলো না। ছিল না কোনই অভিমান বা অনুরাগ। তবে যা ছিল, তা বুঝেও বলতে পারিনি সাহস করে, পারস্পরিক সম্মান করেই। ভীষণ একা হয়ে গিয়েছিলে তুমি, নাকি একা করে নিয়েছিলে নিজেকে। কি জানি, জানতে চাইনি তো, বলবো কিভাবে? এখনো কি বলতে পারবে? আর তো বলার বা জানার কিছু রইলো না। ২০১৩ র জন্মদিনের শুভেচ্ছার পরে বলেছিলে, “ভিনদেশী, কি করে মনে রাখো, কেন রাখো?” কি করে ভুলবো? হাল্কা সম্পর্ক হলেও, সম্পর্কটা যে অনেক গভীর আন্তরিকতা আর ভাল লাগায় ভরা। শুনে আমাকে বলেছিলে, শিউলি ফুলের স্নিগ্ধতা খুব ক্ষণস্থায়ী, বর্ষা আসলেই আসে, ফোটে, ঝরেও পড়ে। হারিয়ে যায়। চারুকলার বাসন্তী উৎসবে, বা শীতের পিঠা খাওয়ার সময়ে রোকেয়া হলের সামনে। মাঝরাতেও হঠাৎ করেই আকাশে তাকাতে। বলেছিলে আমাকে ২০১৩ তে যেন আমি শক্ত হই, শক্ত করি নিজেকে। এই প্রথম বলেছিলে, হাতটা একটু ধরতে পারলে হয়তো ভাল লাগতো সাথে এটাও বলেছিলে, কারটা ধরতে পারলে বেশী ভাল লাগবে!! কেমন যেন অসহায়ের মতন করে বলেছিলে, আমি কখনো কোন অভিশাপ দিয়েছিলাম কিনা মনে মনে। বলেছিলাম, কখনওই না, ভুলেও তা ভাবিওনা। বলেছিলে কখনো এরপরে দেখা হলে ছুঁয়ে বলতে। বলেছিলাম বলবো মাথায় হাত রেখেই। শুনে বলেছিলে, আর দরকার নেই, বুঝেছি। বলতে হবেও না। তারপরেই জানতে চেয়েছিলে, কেন এমন হলো, কেন এমনই হয়? এবার আমি ছিলাম চুপ, নিঃশব্দ আমায় তখন কুঁড়ে খাচ্ছিলো। পারিনি কোন উত্তর দিতে, কিভাবে দেবো, যখন জানিই, তুমি কতটা নিষ্পাপ, নিষ্কলঙ্ক। অনেক ধাক্কা জীবন যখন দিয়েছেই অর্বাচীন ভাবে, তখন তুমি পোড়ামাটির অবয়ব হতে চেয়েছিলে। মিশে যেতে সহজ হবে বলেছিলে মাটিতে। মাটির শরীর মাটিতেই যেন মিশে যায়।
হারিয়ে যাবে বলতে, কখন, কিভাবে হারাবে, বলে যাবার কথা ছিল, দায়িত্ব যথেষ্ট ছিলো, থাকার, না হারাবার। তাও হারিয়েই গেলে। যেতে হবে জানিয়েই গেলে।
সাতানব্বইএ দেয়া কথা ছিলো কখনো হারিয়ে গেলে চিরতরে তবেই যেন মনে রাখি আর বলি, একটা কথা। বলেছিলে তখন শুনতে চাও। কোন ভয় থাকবেনা। কোন আক্ষেপ থাকবেনা। শুধুই মনে থাকবে। শুধুই অনুভব করবে।
সব হারিয়ে না পাওয়ার ব্যথাতুর মনকে কি দিয়ে বোঝাতে, জানা নেই, তবে যতটুকু জানি, চিনি, বুঝি, তাতে বলতে পারি, বুকে চেপে থাকতে থাকতে বুক যে ফেটেই যায়। চিৎকার করে বলতে যেয়েও অস্ফুটেই রয়ে যায়।
সামাজিক সম্মান যেন অক্ষত থাকে, তা নিয়ে ছিলো অনেক বেশী দায়িত্ববোধ, ভীতি। আর আমার ছিলো আছে তোমার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ আর…… আজকে আমি কি চাইলেই পারবো অভিমান করতে? তোমার ওপর? পারছিনা, পারবোও না কখনো।
বাবা’র কোলে সেই গেলে ফিরে। আর কি কাঁদবে বাবা বলে? মা থাকবেন একা হয়ে। পাথর হয়ে। কষ্টে পাথর, নির্জীব। দায়িত্ববোধ আর আত্মাভিমানী তুমি ছিলে সবসময়। অনেক কিছুর সাথে যখন কিছুই করতে পারতেনা, তখনই বলতে নিরাশ হয়ে, হতাশার কথা। বুঝতে সমাজটা কলুষিত কতটা। সামান্য ভুলে অসামান্য ভোগান্তি।
মনে থাকলো সেই ভাল লাগাগুলোই। কানে বাজলো, সেই গুণগুণ করা আজি ঝরঝর মুখর বাদল দিনে, হয়তো সামনে অনেক জন্মদিন আসবে। অনেক শিউলিও ফুটবে, ঝরেও পড়বে। তোমার কবরের ওপরে পড়বে কিনা জানিনা! কেউ গিয়ে দিয়ে আসবে কিনা মনে করে তাও জানিনা। তবে শিউলি দেখলেই মনে পড়বে, তোমার কথাতেই, “ভালো লাগা মুহূর্ত গুলো সবসময় স্মৃতি হয়ে যায়……” আসলেই স্মৃতিই হয়ে গেলো সবকিছুই। সুখের আশায় কি ঘর বাঁধিনু অনলে গেলো যে পুড়ি! আর সেই সুখের আশায় অফুরান অস্থিরতা থাকবেনা। এখন যে সেই সুখটাই পেলে, বাবা’র কোল!!!!

তৌফিকুল করিম সুহৃদ
লেখক: ডিরেক্টর, ফিঙ্গারটিপস ইনোভেশন লিমিটেড