বাচ্চাদের যাবতীয় ইলেক্ট্রনিক গ্যাজেট ব্যবহার নিয়ে অনেকের অনেক মতবাদ, মতভেদ দেখি। ফেসবুকে বেশীরভাগই আলোচনা হয় ব্যক্তিগত মতামত থেকে। বাস্তবতা থেকে আলোচনা হবার চেয়ে বেশী হয় নিজেদের মনগড়া আলোচনা। অনেকেই বাচ্চাদের কম্পিউটার বা ল্যাপটপ বা ট্যাবলেট ব্যবহার করতে দিতে চান না। কেন, তার কোন যুক্তিসহ কারণ কাউকেই কখনওই দিতে দেখিনি। আসলে আমার মতে মা বাবা ভয় পান। আমাদের দেশে অন্তত। পশ্চিমা দেশে আমিরা যারা বাচ্চাদের নিয়ে থাকি, তারা কিন্ত এসব গ্যাজেটের ওপরই অনেকখানি নির্ভরশীল। এখানে একান্নবর্তী পরিবার কম, সবাইই ব্যস্ততার জীবনে অভ্যস্ত। তাই প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে নতুন নতুন প্রযুক্তিই প্রবাস জীবনে বাচ্চাদের সংগী।
এতে কিন্ত আসলেই দোষের কিছু নেই। আমাদের দেশে থাকাকালীন সময়েও আমি আমার ছেলেকে ছোট থেকেই কম্পিউটার ব্যবহার করতে দিয়েছি। কখনওই মানা করিনি। বাসাতে যে ডেস্কটপ কম্পিউটার ছিল, তাতে পেইন্ট ব্রাশ দিয়ে আঁকতে দিতাম। ভীষণ পছন্দ করতো, করতে করতেই কম্পিউটার সম্পর্কে কোন ভয় কখনওই আসেনি। বরং অনেক বেশী উৎসাহ পেয়েছে। পরিণতি আমি বলবো, ভালই, প্রোগ্রামিং ল্যাংগুয়েজ শিখেছে, স্ক্যাচ দিয়ে প্রাইমারী স্কুলে থাকাকালীন নিজে গেমিং এর প্রোগ্রাম করেছে। পরবর্তী কালে হাই স্কুলে এসে এখন আরও আগ্রহী হয়েছে কম্পিউটিং এ। স্বপ্ন দেখে নিজে গেম বানাবে।
আমি কথাগুলি এজন্যই বললাম, আমার বাস্তবতা থেকে। যে ভয়ের কথা, চোখের সমস্যার কথা রেডিয়েশন এর কথা বিভিন্ন আলোচনায় আসতে দেখি, তাতে হতাশ হই। আমাদের প্রজন্মের মানুষ যদি এমন ভাবে, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ তো অন্ধকার হবে, আলোকিত হবার সম্ভাবনা কম।
ছেলের মতন করে আমি এখন বলবো মেয়ের কথাটাও। আমার মেয়ে ছোট থেকেই বেশ চটপটে। তাই ওর আটমাস বয়সের সময় আমি যখন ওকে একটা ট্যাবলেট কিনে দেই। শুরুর দিকে কয়েক মাস ওকে আমি, ওর ভাইয়া ওকে ইউটিউব থেকে রাইমস বাজতে দিতাম। শুনে শুয়ে শুয়ে হাত পা ছুড়তো। বছর দেড়েক বয়স হবার পর থেকে, নিজে নিজেই দেখতাম ইউটিউব অন করে ফেলে। অবাক হতাম। তখনো জানতাম না, সামনে আমাকে আরো অনেকটাই অবাক হতে হবে। গত কয়েক মাস ধরে বিলেতী আইন মোতাবেক আমার মেয়ে স্কুলে যাচ্ছে, নার্সারীতে। স্কুলের টিচারদের খুব প্রিয়, নিজেও স্কুল খুবই পছন্দ করে। না যেতে পারলে মাঝে মাঝে বেশ বিরক্ত হয়, বিরক্ত করে। এখনো বুঝতে পারেনা স্কুল যে ছুটি থাকে মাঝে মাঝে। তাই ছুটির সময় খুব অস্থির করে।
আসল যে কথাটা বলার জন্য ভূমিকা দিলাম, এবার সেই কথাতে আসি। ছোটবেলা থেকে বাসায় ট্যাবলেট থেকে রাইমস শুনে শুনে অনেক কিছুই শিখেছে নিজে নিজে। তাই স্কুলে যখন কোন রাইমস বা কোন কিছু দেখে, সাথে সাথে খুব সহজেই তা ধরতে পারে। আমি খুব খুশী হয়েছিলাম, যেদিন স্কুলে ওকে আনতে যাবার পরে টিচার বললেন, আমরা dinosaur এর বানান কিছুটা বলতেই তাজমিন পুরোটা বলে দিয়েছে। ও তখম একটু লজ্জা পাচ্ছিলো, কিন্ত আমি খুশী হয়েছিলাম। এখন তিন বছর পাচ মাস বয়সে, স্কুলে যতটাই শিখে আসে, অবাক করে দিয়ে ও নিজে নিজেই নিজের ট্যাবলেট এ ইউটিউব থেকে খুঁজে নিয়ে তা দেখে, ফনোটিক্স শেখে।
নিজের অভিজ্ঞতা থেকে কথাগুলি শেয়ার করছি সবার জন্য। আমার খুব ইচ্ছে আমাদের দেশের এখনকার প্রজন্ম প্রযুক্তিনির্ভর হোক, প্রযুক্তিবিদ্বষী না, প্রযুক্তি ভীতি যেন না আসে। তাতে করে হিতে বিপরীত হবে। মেধাবী জাতি হয়েও আমরা ভীতুই থাকবো। আমাদের প্রজন্ম কে সামনের দিকে এগুতে হলে প্রযুক্তি ভালবেসে শিখতে হবে, জানতে হবে। আমাদের স্কুলে ছোট থেকেই তাই বাচ্চাদের জন্য বিভিন্ন প্রোগ্রামিং ল্যাংগুয়েজ খেলার ছলেই শিখাতে হবে। খেলতে খেলতেই প্রযুক্তির প্রতি ভালবাসা আসবে। ভয়ের কিছুই নেই। ইংরেজি, প্রযুক্তি, এই দুটো জিনিষ আমাদের দেশের ছেলেবুড়ো সবাই ভয় পেয়ে পেয়ে বেড়ে ওঠে। সেই ভয় কাটাতে হবে। মাতৃভাষার সাথে সাথে বিদেশী একাধিক ভাষা যেখানে বিদেশী স্কুলে পড়ুয়া ছেলেমেয়ে বাংলাদেশেই শিখতে পারে, তাহলে কেন সাধারণ ছাত্রছাত্রী শুধু ইংরেজি শিখতেই ভয় পাবে! কেন ভয় করবে কম্পিউটার বা প্রযুক্তিকে? ভয় কে জয় করেই যে দেশের দামাল ছেলেরা দেশকে স্বাধীন করেছে, আমরা সেই স্বাধীন দেশের বাসিন্দা হয়ে কেন এত ভীতু হবো। এটা স্বাভাবিক না। তাই আমাদের প্রজন্মকে সামনের দিকে আগাতে দিতে হবে। কম্পিউটার, প্রোগ্রামিং, ইংরেজি ভাষা, এসব ভয় পেয়ে গুটিয়ে থাকার, অজুহাত দেবার দিন শেষ। এখন সময় ভাল করে শেখার। সাহস করে বাচার। তাই বাচ্চাদের, আমার মতে প্রযুক্তি থেকে দূরে রাখার কিছু নেই। খেলার ছলেই শিক্ষা ভাল হবে। কম্পিউটার কখনওই ক্ষতি করবেনা। স্বাস্থ্যগত বা শিক্ষাগত, কোনটাই না। এখন কম্পিউটার থেকে রেডিয়েশন কম হয়, দরকার হলে সরকার পদক্ষেপ নেবে সঠিক মাত্রার উচ্চপ্রযুক্তির কম্পিউটার আমদানীর দিকে। হয়তো দাম কিছুটা বাড়বে, কিন্ত জাতির ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল তো হবে। সেটা অনেক বেশী জরুরী।


আমি এত কথা মোটেও নিজের ছেলেমেয়ের গুণ গাইতে করছি না। আমি করলাম শুধুই বাস্তব চিত্র তুলে ধরতে। বিদেশে যদি বাচ্চারা কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ট্যাবলেট নিয়ে বড় হতে পারে তাহলে আমাদের দেশের বাচ্চাদের কি দোষ? ওরা কেন বঞ্চিত হয়ে থাকবে? আমরাই কি তাহলে নিজেরা বাধাটা তৈরি করে রাখছিনা ওদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ার ক্ষেত্রে!!! এই প্রশ্নটাই বারবার নিজেকে করি। আমাদের দেখার ভঙ্গি পালটানো দরকার, জরুরী, তাহলেই, আসলেই আমরা এগিয়ে যাবো।

তৌফিকুল করিম সুহৃদ
লেখক: ডিরেক্টর, ফিঙ্গারটিপস ইনোভেশন লিমিটেড