“স্কুল ছুটির পরে দেখা হবে। আপনি দেরী করবেন না! তাড়াতাড়ি চলে আসবেন! লাঞ্চ করেই আমার দৌড় দিতে হবে, দেরী করা যাবে না। বাই বাই।” কথাগুলি এক নিশ্বাসে বলেই আরিশা লাইন কেটে দিলো। আজকে শাহান এর জন্মদিন, তাই দেখা না করলেই না, সেজন্যই যত কাজই থাকুক, ওর সাথে লাঞ্চ করে পরে বাসায় যাবে। শাহান খুব ভাল বন্ধু, যার কাছে সব কথা শেয়ার করা যায়। যার কাছে মন খুলে কথাও বলা যায়। কখনওই কোনরকম সুযোগ নিতে আসেনি আমার কাছে, মনে মনে ভাবে আরিশা। একটু হাসিও ফুটে ঠোঁটের কোনায়। একটু মোটা বলেই কি শাহান আমাকে নিয়ে কখনওই এমন ভাবে না নাকি শাহানের কথাই ঠিক, যে, আমি কাউকে কখনওই জোর করে ছুঁয়ে দেখিনা, কেউ ছুঁয়ে দিতে বললেই আমি ছুঁয়ে দেখি, তারপরেরটা পরে যা হয়, যেভাবে হয়, সবাই তো প্রমা না!
প্রমা’র কথা ঘুরেফিরে চলেই আসে, শাহান কে নিয়ে চিন্তা করতে গেলে। কি উচ্ছল এক সাথী যে ছিল শাহানের এই প্রমা। একদম দুই পাগলের একসাথে ছন্দতোলা উচ্ছল জীবন ধারা। দুজনেরই সংসার আছে তারপরেও দুজনেই মাতাল প্রেমে মাতোয়ারা। যদিও এখন শাহান জানে কতটা প্রেম আর কতটা স্বার্থ ছিল।
ধুর কিসব উল্টাপাল্টা ভাবছি। নিজের চিন্তাতেই বাভিনা, তাতে আবার মানুষের কথা! পিচ্চিগুলির খাতা দেখা শেষ করতে হবে। নাহলে দেখা যাবে শাহান নিজেই এসে গেছে আমার কাজ গুছানোর আগেই। সময়ের ব্যাপারে ভীষণ রকম পাংচুয়াল শাহান। কখনওই দেরী হয়না। সকালে ছেলেকে স্কুলে দিতেও আসবে ঠিক ঘড়ি ধরে। ঝড় বাদলাতেও নড়চড় হয়না। এত মাথা কাজ করে কি করে মাঝে মাঝে অবাক লাগে। কথা বলছে, এর মাঝে অফিসের কল আসলে সেটা অ্যাটেন্ড করছে, মোবাইলে মেইল চেক করে উত্তর দিচ্ছে, সুপার রোবট একটা, খালি একটু বেশী রোমান্টিক! এই যা! প্রেমে পড়ে গেলাম।নাকি? ধুর!!! কি যে হয় আমার মাঝে মাঝে। তবে মানুষ হিসেবে অসাধারণ তা বলতে দ্বিধা নেই। নিজের জীবন নিয়ে ছকে বেধে চললেও মাঝে মাঝে একটু বেশীই জুয়া খেলে ফেলে। তবে বিপদ আচ করতে পারলে সরেও যায় আস্তে করে। ঝামেলা বাড়ানো পছন্দ না একদম। আমাকেই কি কম শাসন করলো। অবাকই লাগে, ভালও লেগেছে। একদম আপনের মত করে আমাকে আগলে রেখে বিপদ থেকে আমাকে বাঁচিয়ে এনেছেন। কি যে করে ফেলতাম নিজের জীবন নিয়ে। দারুণ সুন্দর করে আমাকে আগলে বুঝিয়ে আজকের আমাকে বেচে থাকতে তাগিদ দিয়ে যাচ্ছেন। আসলেই তো বুড়া বাবা মা কিভাবে….. থাক।আর মনে করতে চাইনা। পাপন এর যা ইচ্ছা করুক, নিজের ভুল নিজে না সামাল দিতে পারলে নিজেই ভুগবে। স্ত্রী হয়ে আমি তো আমার ভাগ্য নিয়ে ভুগবো। ওর কি!
যাক খাতাপত্র দেখা শেষ, এখন হাল্কা করে একটু সাজুগুজু করি। ওয়েস্টিনে গেলে নাহলে ব্যাটারা মনে করবে বুয়া নিয়ে আসছে নাকি শাহান সাহেব! কেন যে ওয়েস্টিনে যেতে চাইলো, কি দরকার ছিল! অন্য কোথাও গেলেও তো হতো। স্প্যাগেটি জ্যাজ ছিল, ফ্ল্যাম্বে ছিল, সল্টজ ছিল, কোরিয়ানা ছিল। থাক, শখ করেছে, আজকে জন্মদিন, তাই না করলাম না। কিন্ত পরে আমি আরেকটা ট্রিট দিবো, আমার বেতন পেয়ে নেই এই মাসের।
এই আরিশা, তোমার ফোন ভাইব্রেট করে নাকি, দেখো, মনে হচ্ছে। নিগারের ডাকে বাস্তবে আসতে হলো আরিশা’র। হুম ফোনই, মেসেজ। এসেছি। ছোট্ট করে নক করা! জানে, আশেপাশে মানুষ থাকবে, তাই আর কিছু লিখে নাই। যাই বের হই।
“হ্যাপী বার্থডে বার্থডে বয়!”
“থ্যাংকস, শুধু শুকনা উইশ?? এই হলো বান্ধবীর সাথে জন্মদিনে লাঞ্চ, এত সুখা সুখা!! হায়রে কপাল রে শাহান!!! দেখ, লাঞ্চে যাচ্ছে, কিন্ত সব ভালবাসা ব্যাটা পাপনেরই কপালে, তোর জন্য শুধুই শুকনা বাতাসা!”
থামেন, পারেনও আপনি, জানেন আমি সুখাই দেই, বেশী কিছু ভিজা দরকার হলে যান, আবার গিয়ে ভিজে আসেন নিজে নিজে….. বলতে গিয়েও বাকিটা হজম করে ফেললাম, মুড খারাপ করানোর দরকার নাই, থাক। এমনিতেই খুব সেন্টিমেন্টাল, তাতে আবার জন্মদিনে ভেজাল করলে, সাড়ে সর্বনাশ!! যেই। মেজাজ, শেষে আমাকে বলবে, লাঞ্চ বাতিল, বাসায় যাও।
“আর কই যাবো ভিজতে, তুমি যদি নাই ভিজাও অন্তত জন্মদিনে, তাহলে আর কেউই ভিজাবেনা।”
“হইসে, থামেন। খুদা লাগছে, চলেন তাড়াতাড়ি, আর দেরীতে গেলে খাবার দিবে না, বলবে বাসনপত্র ধুয়ে দিয়ে যা আগে যারা খেয়ে শেষ করে গেছে।”
“আরে না, এত ভয়ের কিছু নাই, বলে রেখেছি। চিন্তা নাই, আর বুফে ওদের বিকাল পর্যন্ত খোলা থাকে”!
“শোনেন, দয়া করে বেজমেন্টে পার্কিং করতে যেয়েন না, আমার ভয় লাগে, শেষে সামনে দিয়ে কেউ আসলে, দেখে ফেলবে”
“আমি রাস্তাতেই করবো পার্কিং, চিন্তা নাই।”
“একসাথেই যাই”
“হুম, চলো”
“লিফটে খুব ভাল মানুষ হয়ে থাকবেন!”
“জ্বী,ম্যাডাম!”
“উফ অসহ্য, থামেন!”
খেতে বসে হাল্কা কথা, হাসাহাসি, ঠাট্টাতেই সমহ চলে গেলো, এর মাঝেও যথারীতি শাহান সাহেবের এক। কলিগ দূর থেকে দেখে ইশারা করলো, মেসেজ পাঠিয়ে পরে, তাই বুঝলাম।
যেখানেই যাই ওনার পরিচিত মানুষ থাকবেই, অবশ্য রিস্ক কম,ওনাকে সবাই খুব শ্রদ্ধা করে, সেটা বুঝা যায়। আর টিটকারি মারলে, যেই ব্যাটা সামনে মারতে পারেনা, তার কোন বেইলই নাই। সামনে বলতে পারে শাহান সাহেব। আল্লাহ মুখ একটা। কি ভয়ংকর!! কিচ্ছু আটকায় না!
ভয়েই ছিলাম, গিফট পেয়ে না জানি কি ঝারে আমাকে! যাক বাবা বাচা গেলো, ঝারে নাই। অবাকই হলো, আমি পাপনের সাথে ইউরোপ গিয়ে শাহানের জন্য শপিং করেছি দেখে। কি করবো, আমি তো একা একাই সারাদিন ঘুরতাম, পাপন তার ব্যবসার মিটিং আর বিজনেস অযাসোসিয়েটদের সাথেই লাঞ্চ আর ডিনারে ব্যস্ত। আমার কথা কি মনে আছে নাকি। শুধু একরুমে থাকা লেগেছে বলে রাতে ঘরে আসতো। এসেই হায়নার মত খুবলে অত্যাচার করতো। কোন মায়া থাকতোনা, জানতেও চাইতো না আমার ইচ্ছা আছে কি না! ওর ঝাঁপিয়ে পড়ে কাজ শেষ করেই ঘুম। আর আমি তখন নির্ঘুম, হোটেলের জানালায় চোখ রেখে চেয়ারে বসে কাতরাতাম, ব্যাথায়! সেইজন্যই শাহানের কথা মনে পড়তো। জন্মদিন মনেও ছিল তাই এনেছি, ওর পছন্দের বস এর পারফিউম! সাথে একটা টিশার্ট, টমি হিলফিগারের, আর একটা ক্যান হ্যানিকেন, এইটা পাপনের স্টকের। টেরও পাবে না পাপন।
খাওয়া শেষ, এইবার যাই। যাওয়ার আগে খুব ইচ্ছা হচ্ছে
শাহান কে একটু ছুঁয়ে দিতে, খেতে খেতে অবশ্য হাতটা ধরেছিলাম। টের পেয়ে একটু তাকিয়েও ছিলো।।কিন্ত কিছুই বাড়াবাড়ি করেনি।।এইটাই আমার ভাললাগে শাহানের। জানে কতটা কি করতে হবে। এইজন্যই এখন ইচ্ছা করছে, একটু জড়িয়ে ধরতে! শাহান, ধরবো কি?
“একটা কথা বলবো, শুনবেন? ”
“বলো”
“আমাকে একটু হেল্প করবেন?”
“কি হেল্প? ওয়াশ রুমে যাবে? তাই অপেক্ষা করতে বলছো,”
“আরে না!”
“তাহলে?”
“একটা রিকোয়েস্ট করবো”
“করো”
“আমার একটা ইচ্ছা হচ্ছে”
“কি ইচ্ছা? রুম নিতে হবে এখন?” বিটকেলে একটা হাসি দিয়ে আমার দিকে তাকানো, জানে আমি এমন কিছু চাইবোনা, তারপরেও আমাকে খেপাতে মজা পায়! দেই আজকে বাড়ি একটা।
“যেতে চাইলে কি যাবেন নাকি, এখন তো বলবেন কাজ আছে, আগে বলো নাই কেন? সময় করে আসতাম!”
“আরিশা, খালি বলেই দেখো, কাজ সব জাহান্নামে, তোমার ডাক ফেলে কাজ???? কাভি নেহি!!! এই চান্স শালা কোন পাগলে ছাড়ে!!!! আমার প্রিয় বান্ধবী আমাকে চাইছে, আর আমি অজুহাত দিবো? আমি। বেকুব হইতে পারি, কিন্ত মনে হয় না এতটা!”
“ভাই আমার ভুল হইসে, কিছু বলতে যাওয়াটাই।” বলেই হুট করে জড়িয়েই ধরলাম, এই নিরিবিলি লিফটে, শাহান পুরা থমকে গেছে, আমাকে যে ধরতে হবে, তাও ভুলে গেছে, যাক ধরলো অবশেষে। ঘাড়টা বাড়িয়ে ঠোঁটের ইশারায় হাল্কা করে একটা চুমু খেলাম। শাহান, থ্যাংক্স। আমাকে কেউই কখনওই এমন সুন্দর করে ভালবেসে জড়িয়ে ধরেনি। আমার কান্না পাচ্ছে, কিন্ত অসম্ভব আশ্বস্তও লাগছে। মনে হচ্ছে যেন এক নিশ্চিন্ত আশ্রয়! লিফট নেমে এসেছে। দরজা খোলার আগেই দুজনে সরে গেলাম।
“থ্যাংক্স, শাহান!”
“হুম”
গাড়ীতে উঠে, এইবার আমিই হাত ধরলাম।
“শাহান, আমি জানিনা, কেন করলাম, কিন্ত আবার এইটাও জানি, যে, আমার জন্য আপনি যা যা করেছেন তার তুলনায় আমি কিছুই করতে পারিনি। আমাকে যেভাবে আপনি কথায় ভুলিয়ে বাচতে বলেছেন, বাঁচিয়ে রেখেছেন, তাতে, আমিই মাঝে মাঝে বুঝিনা, আপনি আসলেই আমার জীবনে কেউ না! আমার আজকে মনে হলো, আমার জীবনে আপনি, কেউ না হয়েও অনেক কিছুই আপনি করেছেন! আমার জীবনে আপনি অনেকখানিই”
“আরিশা, থামো, প্লিজ, আমি এমন কিছুই করিই, পারিনি তো কিছুই করতে, যা চাও, তার তুলনায় অনেক কিছুই পারিনি, পারিনি এখনো তোমার পাপনকে তোমারই করে আনতে। পারলে বলো, কিছু করেছি!”
“শাহান, থাক না, আজকে অন্তত এখন এসব কথা। আজকে কারো জন্মদিনে আমি চাইনা এসব কথা আসুক। খুব ভাল কিছুটা সময় কাটালাম, তাই একসাথে, এইটাই এখন মনে রাখি, প্লিজ।”
“ঠিক আছে, কিন্ত এখন তুমি। কোথায় নামতে চাও?”
“গুলশান এক এর আলমাস এ, ওইখানে নেমে আমি রাস্তা ক্রস করে নাভানা টাওয়ারে যাবো, দাতের ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট করতে, আম্মার জন্য।”
“আচ্ছা”
“পরে বাসায় গিয়ে পারলে জানিয়ে দিবো, যদি পাপন না থাকে!”
“হুম”
“কি হলো? এত হুম হুম করেন কেন?”
“কিছুনা, ডিয়ার, চিন্তা করছি, আমি সবার কাছে এত ভাল মানুষ হয়ে আছি কেন? আমি নিজেই অবাক! সবাই আমাকে খুব ভালমানুষ ভাবে, পছন্দ করে, আর আমি শালা কিছুই করিনা। এইটা ঠিক না, নিজেকে বদলাতে হবে, এখন থেকে খারাপ হতে হবে।”
“হইসে, থামেন, আপনি হবেন খারাপ! তাহলে তো প্রমা’র জীবন শেষ করে দিতেন, তাই যখন দেন নাই, আর কখনওই পারবেনও না খারাপ হতে। যাই নামি, ভাল থাকেন।”
“আরিশা, নামার আগে হাতটা একটু দাও, একটা চুমু দেই, হাতে”
দিলাম হাত বাড়িয়ে, আসলেই আলগা করে একটা চুমু!
“বাই বাই!”
এই মানুষ হবে খারাপ, কখনওই না। প্রত্যয়ী, নির্ভরশীল একজন সৎ মানুষ, অনেক সুযোগ থাকার পরেও কোন লোভ করেনি এখনো। ক’জন পারে এমন। খুব ইচ্ছা হয় এমন মানুষ কাছে থাকুক, কাছে থাকি।
সব চাওয়া কি আর পূরণ হয়, হয় না, অধরাই থাকে। মনীষার ডাকে বাস্তবে ফিরে আসে আরিশা,ভালবাসার আদর মাখানো ছোট্ট হাতে মায়ের গলা জড়িয়ে আদর খেতে আসলো, আরিশার অশান্ত মন জুড়ে আসে প্রশান্তি!

তৌফিকুল করিম সুহৃদ
লেখক: ডিরেক্টর, ফিঙ্গারটিপস ইনোভেশন লিমিটেড