কবি উইলিয়াম ব্লেক কে বরারবরই আমার বিশেষ কারণে পছন্দ। তার প্রত্যেকটি কবিতার মধ্যে দুটো স্টেজ অর্থ্যাৎ ধাপ খুঁজে পাওয়া যেতো। “Songs of Innocence and of Experience.” -অর্থ্যাৎ একটি জীবনের কম বয়সের ভাবনা আর আরেকটি পরিণত বয়সের ভাবনা। আরেকটু খোলামেলা করে বলি। উইলিয়াম ব্লেক কবিতা লেখা শুরু করেন মাত্র বারো বছর বয়স থেকে। ব্লেকের বাবা চেয়েছিলেন অভাবের সংসারে ব্লেককে তিনি ব্যবসার কাজে লাগাবেন, সংসারে দু পয়সা আয় হবে। কিন্তু মানুষের ভিতরে যে প্রতিভা থাকে, , তাকে সেখান থেকে বের করা কঠিন। ব্লেকের বেলাও ব্যতিক্রম ঘটে নি। দশ বছর বয়সে তিনি ভর্তি হন আর্ট স্কুলে। যা কিছু তিনি চোখের সামনে দেখতেন, তাই তিনি এঁেক ফেলতেন। আর বারো বছর বয়স থেকে সেই আঁকাগুলোই বাণীরূপ দিতে লাগলেন। উইলিয়াম ব্লেকের জীবন নিয়ে লিখতে শুরু করলে শেষ করা কঠিন। সামাজিক অনাচার, মূল্যবোধের অবক্ষয়, ধর্মীয় কুসংস্কার, শিশুশ্রম ইত্যাদি বিষয়ে তার রচনা সবসময় কঠোর অবস্থানে ছিল। স্বাধীনতার জন্য, মানুষের মুক্তির জন্য, মুক্ত বাতাসের জন্য ব্লেক সবসময় চেষ্টা করে গেছেন। বিশেষ করে ১৭৮৯ সালে ঘটে যাওয়া ফরাসী বিপ্লব কবিকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করেছিল।
যে কারণে আজ এই কবির কথা বিশেষ ভাবে মনে পড়ছে তার কিছু কাব্য গ্রন্থ দুটোভাগে বিভক্ত ছিল- একি শিরোনামে দুটো অংশের কবিতা। কবি কয়েকবছরের ব্যবধানে একই বিষয় নিয়ে দুটো ভাগের কবিতা লিখেছিলেন-সংস অব ইনোসেন্স অ্যান্ড এক্সিপেরিয়েন্স। Songs of Innocence হলো সরলতার সঙ্গীত এবং Songs of Experience-হলো অভিজ্ঞতার সঙ্গীত। Songs of Innocence অংশের কবিতায় জীবনের নির্মম নিষ্ঠুর রূঢ় বাস্তবতা কবিতায় স্থান পায় নি। সেখানে জীবন সহজ সরল, সাবলীল, ছন্দময়। কিন্তু Songs of Experience অংশের কবিতায় জীবনের কঠিন বাস্তবতা বেশি স্থান পেয়েছে। যেমন – – Nurses Song কবিতার Innocence অংশে কবিতায় নার্স শিশুদেরকে বাড়ি ফিরতে বলল। সন্ধ্যা হয়েছে তাই। কিন্তু শিশুরা বাড়ি ফিরতে চায় না, তারা আরও কিছুক্ষণ খেলতে চায়। নার্স সহজভাবে রাজী হয়ে গেলো। তাদেরকে খেলতে বললো। শিশুরা আবার খেলাধূলায়, হৈ-হুল্লোরে মেতে উঠলো। কিন্তু একি কবিতার Experience অংশে এ চিত্র ভিন্ন। সেখানে তীব্রভাবে উঠে এসেছে মোল্লা পুরুতদের ভন্ডামী, অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার, শিশুশ্রম, পীড়ন, ধর্মের অপব্যাখা, বাবা-মার কষ্ট, প্রেমের প্রতিবান্ধকতা ইত্যাদি।
আরেকটি কবিতা Introduction সেখানে মেঘ মুলুকের পাহাড় থেকে একটি ছোট্ট শিশু বংশীবাদককে অনুরোধ করে বাঁশী বাজাতে। আর বংশীবাদক তার কথামতো বাঁশী বাজায়। আবার যখন শিশুটি বাঁশী রেখে দিতে বললো, সে বাঁশী রেখে দিলো। অর্থ্যাৎ শিশুটি যা বলছে বংশীবাদক তাই করছে। এর বিপরীতে কোনো কঠিন যুক্তিও দাড় করানো হয় নি। এমনকি মেঘের ভেতর থেকে উঁকি দিয়ে সেই শিশু যখন বংশীবাদকে একটি গান লিখে রাখতে অনুরোধ করলো। বংশীবাদক সুবোধ বালকের মতো তাই করলো। কিন্তু সংস অব এক্সিপেরিয়েন্স গুচ্ছে সেই কবিতাটি নাম করণ করা হয়েছে Infant sorrow নামে। সেখানে শিশুকে দেখা গেছে ধূূলার মধ্যে বেঁেচ থাকার সংগ্রামে লিপ্ত।
সাহিত্য জীবনের বাইরে নয়। জীবনে যাই ঘটে তাই সাহিত্যে স্থান পায়। উইলিয়াম ব্লেকের এই দুটো স্টেজের বর্ননা আমাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিজীবনের বেলায় সত্যি। ছোটোবেলায় বাবা-মার সঙ্গে দাদু কিংবা নানু বাড়ি বেড়ানো, সেই গ্রাম- গ্রামের পথ, গাছ, নদী .. ট্রেনের কু ঝিক ঝিক শব্দ। ভরদুপুরে যখন সবাই ঘুমাতো তখন আস্তে করে পা টিপে টিপে উঠে উঠোনে খেলাধূলায় মেতে থাকা … আর এখন সেই বাড়ি প্রায় জনশূণ্য। কোথায় আমার সেই গ্রামের পথ। বাঁশ গাছের ঝাড়, সেই নদী !!! । এখন দুপুর বেলা খেলার পরিবর্তে একটু বিশ্রাম নিতেই বেশি ভালো লাগে। এটাই হলো সার্কেল অব লাইফ। তবে জীবনের প্রত্যেকটি সার্কেলে বড়ই অদ্ভুদ। সেসময় যে সমস্যাটি অত্যন্ত প্রকোট মনে হয়, বড় হয়ে সেই কথা ভাবলে খানিকটা লজ্জাই লাগে।
আজ আমার লেখার বিষয় সেই সার্কেল অফ লাইফ নিয়ে।
আক্ষরিক অর্থে যদি বলি সার্কেল অব লাইফ কী- জীবন একটি চক্রাকারে ঘুরতে থাকে। যখনই এই ঘুরে যাওয়া থেমে যায়, জীবন তখনই থেমে যায়। জীবন মানেই জন্ম আর তারপর একটি সময় মুত্যু। মৃত্যু অনিবার্য, এটাকে কেউ এড়াতে পারে না। এটাই সৃস্টিকর্তার নিয়ম। অনেক আবার বিশ্বাস করেন, মৃত্যুর পর আরেকটি জীবন থাকে, অর্থ্যাৎ পূর্ণজন্ম। আসলে এই বিষয়ে র্তক কিংবা যুক্তি স্থাপন করার ইচ্ছে আমার নেই। প্রত্যেকে তার নিজস্ব বিশ্বাস নিয়ে থাকুক।
সার্কেল অব লাইফকে দুটোভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। একটা হলো জীবনের কয়েকটি পর্যায়। প্রত্যেকটি পর্যায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর প্রত্যেকটি পর্যায়ের রয়েছে নিজস্ব সৌন্দর্য, রয়েছে কিছু নিয়ম, দায়িত্ব, চ্যালেঞ্জ, অভিজ্ঞতা। যখনই এর ব্যতিক্রম ঘটে তখনই জীবনের ছন্দপতন হয়।
আরেকটি জীবনের এই বিভিন্ন পর্যায়ে আমাদের মতামত, জীবনবোধ, জীবনকে উপলদ্ধি করার ধরন।
খুব ছোটোবেলা আমার চোখে দেখা আমার সেই ছেলেবেলার সুরমা নদীর কথাই বলি। বাবার চাকরি সুবাদে সিলেটে একটি বড় সময় আমার থাকতে হয়েছে। সিলেট শহরের মধ্যেই সুরমা নদী। নদীটাকে আমার এতো বড় মনে হতো, এতো ভালো লাগতো। মনে হতো এই নদীর শেষ নেই। শান্ত, স্থির, নিরিবিল পরিবেশ। নদীর উপর ব্রিটিশ আমলের করা একটি ব্রীজ আছে। অবাক বিস্ময়ে আমি সেই বীজ্রের নির্মানশৈলী দেখতাম। আর বড় হয়ে যখন আমি সেই সুরমা নদীর কাছে গেলাম। আগের সবকিছুই আছে কিন্তু আমার দেখার ধরন পাল্টে গেলো। এখন সেই ব্রীজ, সেই নদীকে ঘিরে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। কেমন জানি এক হট্টগোল এক পরিস্থিতি। আমি চাইলেও ফিরিয়ে আনতে পারবো না ছোটোবেলার সেই পরিবেশকে। এটাই মেনে নিতে হবে। এই মেনে নেয়ার মধ্যেই রয়েছে জীবনবোধ।
একজন মানুষের জানা দরকার জীবনের শেষ ধাপ কোথায়। আমরা যদি এই চক্রাকারে ঘূর্ণয়মান জীবনকে থামিয়ে একটা চক্রে অনেক বেশি সময় থাকি, তখনই অন্যধাপগুলোর আনন্দ উদ্দেশ্য থেকে বঞ্চিত হবো। জীবনের এই ধাপগুলো পূর্ণ করা, ইতি টানা, শুরু করা – সবকিছুই অনেকটাই নির্ভব করে নিজের বিশ্বাসের উপর। দৃষ্টিভঙ্গির উপর। সবকিছু যদি সহজ স্বাভাবিকভাবে নেয়া যায়, জীবনের স্বাদ পরিপূণ ভাবে নেয়া সম্ভব। আসল কথা হলো অতীত সেতো একসময় ফুরিয়ে যাবে। তাকে পেছনে ফেলে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়াই হলো স্বার্থকতা। যতই সেটা নির্মম সত্য হোক সেটাকে মেনে নিতেই হবে। মাথার মাঝখান দিয়ে মাঝে মধ্যে যখন দু চারটে সাদা চুল উঁকি দেয়া যখন শুরু করে অনেকেই খুব মন খারাপ করে ফেলেন। আরে, সেই সাদা স্টিকই হচ্ছে আপনার অনুপ্রেরণা। তার মানে এতোদিন আপনি অন্যের কথা শুনে এসেছেন। এখন আপনার কথা অন্যকে শুনানোর সময় এসেছে। এটাই তো জীবনের আনন্দ।
হলিউডের বিখ্যাত মুভি ‘দ্য কিউরিয়াস কেস অব বেনজামিন বাটন’ যারা দেখেছেন, তারা অবশ্যই বুঝতে পেরেছেন জীবনের সার্কেল উল্টো পথে চললে কেমন ছন্দপতন হয়। মুভিটার কাহিনী ছিল বেনজামিন নামে একজনকে কেন্দ্র করে। যার জীবন শুরু হয়েছিল উল্টো পথে। বেনজামিন জন্ম নিল বৃদ্ধ হয়ে। সে নড়াচড়া করতে পারতো না, কোনো কাজ করতে পারতো না। প্রচন্ড বৃদ্ধরা যা হয়ে থাকেন। সমাজ, পরিবার সব ক্ষেত্রে তার এই সার্কেল ভঙ্গের কারণে ভীষনরকম য্দ্ধু করতে হয়েছে। যতোই তার বয়স বাড়তে লাগলো ততোই সে ইয়াং হতে লাগলো। ভাবছেন এটা তো ভারী মজার। না আসলে তা নয়, এমন একটা পর্যায় আসে যখন বেনজামিনের সন্তানকে দেখতে তার থেকে বয়স্ক লাগলো। সন্তান বাবার কাছ থেকে চলে গেল। তার স্ত্রীকে লাগছে তার মায়ের মতো। স্ত্রীও তার কাছে থাকতে পারলো না। এক পর্যায়ে বেনজামিন ছোটো একটি শিশুতে পরিণত হলো। সে মারা যায় তার স্ত্রীর কোলে শুয়ে। অত্যন্ত করুণ ছিল ঘটনা গুলো। সবকিছু ঠিক আছে শুধু জীবনের চাকা উল্টেদিকে ঘুরতে শুরু করেছিল। মুভিটির পরিচালক বোঝাতে চেয়েছেন জীবনের সার্কেল কতোটাই মূল্যবান।
ঠিক এই মুভিটার মতো অনেকটাই ঘটলো আমাদের দেশে চারবছরের শিশু বায়োজিদের বেলায়। বায়োজিদ একজন শিশুর মতোই উচ্ছল, চঞ্চল। অনুভূতিগুলোও একি রকম। একজন শিশুর মতো সে কাঁদে, মার কাছে আবদার করে, খেলা ধূলা করে। কিন্তু দেখতে শুধু সে আশি বছরের বৃদ্ধের মতো। বায়োজিদেও চাহনি, অঙ্গভঙ্গি বৃদ্ধ মানুষের মতো। শরীর এর মধ্যেই কুঁজো হয়ে গেছে। ঝুলে পডছে শরীরের চামড়া। বায়োজিদের তো কোনো দোষ নেই তার এই অবস্থার জন্য। অত্যন্ত জটিল একটি রোগে সে আক্রান্ত। একধরনের জেনেটিক জিজঅর্ডার হলে সাধারণত এ ধরনের প্রবলেম হয়ে থাকে। একবার ভেবে দেখুন জীবনের সার্কেল উল্টোপথে ঘুরলে কতো বিপত্তি। থমকে যায় সবকিছু। ইচ্ছে করলেও বায়োজিদ এখন স্বাভাবিক জীবনধারন করতে পারবে না।
জীবনকে নদীর ¯্রােতের সঙ্গে যদি ভাবি, এটি একবার চলে গেলে আর ফিরে আসে না। নদীর বাঁকের মতো জীবনের রয়েছে অসংখ্য বাঁক। সেই বাঁকে কখনও আনন্দ, কখনও কষ্ট। এসব পেরিয়ে আমাদের যেতে হয় জীবনের পথে। জীবনের প্রতিটি ধাপ যারা সহজ ভাবে মেনে নিয়েছেন তারাই জীবনকে উপলদ্ধি করেছেন। এভাবেই প্রতিটি মানুষ একেকটি ধাপে শেষে চলে যায় এই পৃথিবী থেকে। বেঁচে থাকে তার কর্ম। তার সৃষ্টি। তাহলে জীবন মানে কী? বলতে পারেন জীবন মানে যুদ্ধ যদি আপনি তা লড়তে পারেন।হতে পারে জীবন মানে সংগ্রাম, যদি সেই সংগ্রামে আপনি পরিশ্রম করতে পারেন। জীবন মানে ভালোবাসা যদি আপনি সহজভাবে সবকিছু ভাবতে পারেন। জীবন মানে স্বপ্ন কিংবা প্রত্যাশা যদি আপনি তা গড়তে পারেন। জীবন মানে জীবন যদি আপনি তা মেনে নিতে পারেন, বুঝতে পারেন এর অর্থ। লেখাটি শেষ করছি অ্যানিমেশন মুভি লায়ন কিং এ ব্যবহৃত স্যার এলটন জনের গাওয়া সার্কেল অব লাইফ গানটির কয়েকটি লাইন দিয়ে-
It’s the Circle of Life
And it moves us all
Through despair and hope
Through faith and love
Till we find our place
On the path unwinding
In the Circle
The Circle of Life …..

নিশাত মাসফিকা