কোন মিশেলিন তারকা-খচিত রেস্তোরাঁয় নয়; হংকং-নিউ ইয়র্ক ফ্লাইটে পরিবেশিত খাবার-দাবার

পৃথিবীর মানচিত্র দেখলে মনে হতেই পারে যে পৃথিবীটা চ্যাপ্টা একটা আয়তক্ষেত্র। বাংলাদেশ থেকে আমেরিকা যেতে হলে, বাঁ-দিক দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ আর তারপর অতলান্তিক মহাসাগর পাড়ি দিয়েই যেতে হবে। কিন্তু, কমলালেবুর মত গোলাকার এই পৃথিবীর ডান দিক দিয়ে, অর্থাৎ পূর্বদিক দিয়েও তো যাওয়া যায় আমেরিকায়। সেক্ষেত্রে অবশ্য আমেরিকাকে ‘পশ্চিমা’ দেশ বলা হবে কিনা, সেটা অবশ্য ভাববার বিষয়! সত্যি বলতে কি, আমেরিকার অনেক বিদ্যালয় বা পাঠাগারে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকাকে মাঝখানে রেখে আঁকা মানচিত্র দেখা যায়। সেক্ষেত্রে প্রাচ্য, প্রাতিচ্য, মধ্যপ্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের সংজ্ঞা নিয়ে পাঠার্থীদের মাঝে দ্বন্দের সৃষ্টি হতেই পারে!

বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে নিউ ইয়র্কে জাতিসঙ্ঘের ৭৪র্থ সাধারণ সভায় যোগদানের আমন্ত্রণ পেয়েই এই আমেরিকা অভিযান। ‘সফরসঙ্গী’ হলেও আলাদা বিমানে যাচ্ছি আমি। এর প্রধান কারণ হলো, দু’দিন আগেই নিউ ইয়র্ক থেকে ফিরেছি। জেট-বিলম্ব কাটিয়ে ওঠার আগেই এই আমন্ত্রণ। তাই একটু জিড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর একদিন পর রওয়ানা হলাম আমি। দেরীতে যাত্রা শুরু করেও মোটামুটি কাছাকাচি সময়েই পৌঁছানোর জন্য উল্টোরথ ধরলাম। পূবদিক দিয়ে জাপান, কোরিয়া, আলাস্কার উপর দিয়ে আন্তর্জাতিক তারিখ-রেখা অতিক্রম করে, যে তারিখে রওয়ানা দিয়েছি, সে তারিখেই পৌঁছে যাবো বলে আশা করছি। এই মুহূর্তে জাপানের রাজধানীর কাছাকাছি প্রায় ৩১,০০০ ফুট উঁচুতে ৫১৫ নটস্‌ (ঘন্টায় ৫৯০ মাইল) গতিতে ‘টাইম-ট্রাভেল’ করছি!

হংকং-এ এর আগে ঘন্টা দেড়েক-এর যাত্রাবিরতী ছিল। এদের জাতীয় বিমান ক্যাথে প্যাসিফিকের বদৌলতে পাওয়া আরামকক্ষে চট্‌পট্‌ মুখহাত ধুয়ে, দু’টো খেয়ে চাঙা হয়ে নিলাম। মনে মনে একটু আশঙ্কা ছিল, হংকং-এ চলমান রাজনৈতিক প্রতিবাদ মিছিল-মোর্চায় বিমানবন্দরে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করবে কিনা। কিন্তু কোথাও কোন অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়লো না। বিমানের গেটের কাছে এসে দেখি প্রচণ্ড ভীড়। প্রত্যেক যাত্রীকে আলাদা আলাদা ভাবে জেরা করে বিমানে ঢোকানো হচ্ছে। জেরার বিষয় হলো, কেন আপনি নিউ ইয়র্ক যাবেন। অনেকটা “না গেলে হয় না?”, এমন একটা ভাব নিয়ে সুরক্ষাকর্মীরা নানান রকমের প্রশ্ন করছেন। কারও কারও ব্যাগ যদৃচ্ছভাবে নিরীক্ষা করা হচ্ছে। বাদামী বর্ণের মানুষ হওয়াতে আমিও বাদ গেলাম না। আমার ল্যাপটপের ব্যাগটিতে বিস্ফোরক আছে কিনা তা’ পরীক্ষা করে তবেই রেহাই দিলেন তাঁরা আমায়।

এরপর অনেকটা ক্ষতিপূরণের মতই শুরু হলো বিমানবালাদের অতিরিক্ত আপ্যায়ন! পানি খাবো নাকি ফলের রস খাবো, সাথে আর কী কী খাবো, এসব জিজ্ঞেস করে করে মাথা খারাপ করে দিল তা’রা। গরম তোয়ালে বা ঠাণ্ডা তোয়ালে দিয়ে মুখহাত মুছবো কিনা, সিনেমা দেখবো কিনা, শীত করছে কিনা, ইত্যাদি আতিথেয়তার চোটে ব্যতিব্যস্ত করে তুলতে থাকলো। এরপর এল প্রাতঃরাশ আর মধ্যাহ্নভোজের খাদ্য-তালিকা।

হংকং-নিউ ইয়র্ক ফ্লাইটে পরিবেশিত খাবার-দাবার

প্রায় হাতে পায়ে ধরে ওদের বলেছি, ওসব পরে হবে, এখন একটু ডায়েরি লিখতে চাই। অনেকটা দয়া করেই বোধহয় পিছু ছেড়েছে তা’রা। সেই ফাঁকেই এই লিখতে বসা। কৃত্তিম উপগ্রহের মাধ্যমে ৪০০ এমবিপিএস গতির ইন্টারনেট সংযোগ আছে এই বিমানে। তাই আকাশে থেকেও মর্ত্যে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছি। এখন ঢাকায় অফিস-টাইম। টুকটাক কাজও সেরে ফেলছি ডায়েরি লেখার ফাঁকে ফাঁকে। ১৫ ঘন্টার যাত্রাপথে এখনও ১১ ঘন্টা বাকি। ভাবছি কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নেই এইবেলা।

সৈয়দ আলমাস কবীর
লেখক: প্রেসিডেন্ট, বেসিস