জন এফ কেনেডী বিমানবন্দরে অবতরণ করে, অভিবাসনের বৈতরণী পেড়িয়ে, বিমানের জিম্মায় থাকা নিজের বাক্স-পেটরা ফেরৎ নিয়ে বেরুতে মোট সময় লাগলো আধ-ঘন্টা। এয়ারট্রেনে চেপে ফেডারেল সার্কেলে এসে গাড়ী ভাড়া করলাম। আগে থেকেই বুকিং দেওয়া ছিল, আংশিক ভাড়াও পরিশোধ করা ছিল। এখন শুধু আমার ড্রাইভিং লাইসেন্স খতিয়ে দেখে আর ক্রেডিট কার্ডের তথ্যাদি রেখে সরল বিশ্বাসে গাড়ীটা দিয়ে দিল আমায়। যতদিন এখানে থাকবো, ততদিন গাড়ীটা আমার সাথে থাকবে; যাবার দিন আবার গাড়ী ফেরৎ দিয়ে বিমানে চড়বো। আমেরিকায় নিজের গাড়ী না থাকলে বেশ ঝামেলায় পড়তে হয়। একটু দূরে কোথাও যেতে হলে ট্যাক্সি ছাড়া গতি নেই। যদিও এখন উবার-এর দৌলতে ট্যাক্সি পাওয়ার ঝামেলাটা নেই, কিন্তু তা’ও বেশ খরচ সাপেক্ষ। ইউরোপের দেশগুলোতে আবার এ সমস্যা ততটা নেই। ওখানে বাস-ট্রেন-পাতালরেল-ট্রাম ইত্যাদি গণপরিবহন যোগাযোগ ব্যবস্থাটা এতই ভাল যে, গাড়ী পোষাটাই বরং একটা উটকো ঝামেলা। খোদ নিউ ইয়র্ক সিটি, অর্থাৎ ম্যানহ্যাটন, কুইন্স, ব্রুকলিন, ব্রংস ও স্ট্যাটেন আইল্যাণ্ড, এই পাঁচটা বারোজ-এ যাঁরা থাকেন, তাঁদের ক্ষেত্রেও একথাটা চলে। যদিও আমাদের মত যাদের হাঁটার অভ্যেস নেই, পরের রাস্তায় যাওয়ার জন্য যারা আমরা রিক্সা ডাকি, তা’দের জন্য গাড়ী বা ট্যাক্সী ছাড়া গতি নেই।

বিকেলেই জাতিসঙ্ঘে একটা অনুষ্ঠান রয়েছে। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচীর মাধ্যমে বাংলাদেশ পোলিও, হাম, হেপাটাইটিস-বি ইত্যাদি দূরীকরণে অভূতপূর্ব সফলতা লাভ করায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সম্মানিত করা হবে। তাড়াতাড়ি কাপড় বদলে রওয়ানা দিলাম ম্যানহ্যাটনের সেকেণ্ড এভিনিউর উদ্দেশ্যে। জাতিসঙ্ঘের সাধারণ অধিবেশন চলাকালীন এ সময়টাতে নিউ ইয়র্কের এই অঞ্চলটাকে একেবারে নির্মক্ষিক সুরক্ষাবেষ্টনীতে ঘিরে রাখা হয়। জাতিসঙ্ঘের প্রধান কার্যালয়ের আশেপাশের রাস্তাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। ১৯০টি দেশের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, উর্ধতন নেতৃবৃন্দ এসময়ে এখানে অবস্থান করেন। অভেদ্য পুলিশী সুরক্ষায় আবদ্ধ থাকা এ অঞ্চলে যানজট এড়াতে গাড়ী ব্যবহার না করে গনপরিবহন ব্যবহার করতে শহরবাসীকে আগে থেকেই সতর্ক করে দেওয়া হয়। আমি মাইল খানেক দূরে গাড়ী রেখে পায়ে হেঁটে এসে উপস্থিত হলাম জাতিসঙ্ঘের সুবিখ্যাত প্রধান কার্যালয় ভবনের সামনে। ভেতরে ঢুকবার পাস আগে থেকেই ছিল। পুলিশকে সেই পাস আর আমার একটি ছবিসমেত পরিচয়পত্র (এক্ষেত্রে আমার ড্রাইভিং লাইসেন্সটি) দেখিয়ে প্রবেশ করলাম জাতিসঙ্ঘে।

এই সেই জায়গা, যেখানে দুনিয়ার তাবৎ জ্ঞানী-গুণী, রাষ্ট্রপ্রধান, নেতা-নেত্রীর আনাগোনা হয়। এখানকার সভাঘরগুলোতে যেমন বঙ্গবন্ধু-নেলসন ম্যাণ্ডেলা এসেছেন, আবার সাদ্দাম-গাদ্দাফী-ইদি আমিনেরও বিচরণ ঘটেছে। সেইসব হল আর করিডোর দিয়ে যখন হাঁটছিলাম, গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল!

গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাক্সিনেশন-এর অনুষ্ঠানটি শুরু হলো সভাকক্ষ নং ১-এ। আমরা যারা প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী, তা’রা জড়ো হ’লাম সেখানে। শিশুমৃত্যুর হার কমানোর ক্ষেত্রে এবং টিকাদানে বাংলাদেশের সাফল্যের একটি ভিডিও-চিত্র যখন দেখানো হচ্ছিল আর উপস্থিত সভাসদ্গণ তা’তে হাততালি দিচ্ছিলেন, তখন গর্বে বুকটা ভরে যাচ্ছিল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্দেশ্যে মানপত্র পাঠ করা হলো এবং পুরষ্কারটি তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হলো। উচ্চ-নিরাপত্তার কারণে ছবি তোলা সবসময়ে সম্ভব হচ্ছিল না, কিন্তু তারপরও পুলিশের চোখ এড়িয়ে দু-একটা তুললাম বৈকি!

প্রায় ২১ ঘন্টার সফরের পর গা-হাত-পা আর চলছিল না। যে আত্মীয়ের বাড়ীতে আশ্রয় নিয়েছি, তা’ ঘন্টা খানেক দূরে লং আইল্যাণ্ডে। রাত হয়ে গেল ফিরতে ফিরতে। পথে থেমে কিছু খেয়ে নিলাম। সময়ের তালগোল পাকিয়ে গিয়েছে, তাই বুঝলাম না গতকালের ঘুম আজকে দিলাম, নাকি পরের দিনেরটা আগাম ঘুমালাম। শুধু এটুকু বুঝেছিলাম, জোরে জোরে নাক ডেকেছি নিশ্চিত!

সৈয়দ আলমাস কবীর
লেখক: প্রেসিডেন্ট, বেসিস