মিটিং-এর ফাঁকে ফাঁকে একটু ঘোরাঘুরির পরিকল্পনা করেছি। নতুন কিছু দেখার জন্য নয়, পুরোনো কিছু স্মৃতি রোমন্থনের জন্য। ঠিক করলাম, যেহেতু আধবেলা সময় হাতে আছে, আমার আল্‌মা মাটার এনওয়াইইউ-র ট্যান্ডন স্কুল অফ ইঞ্জিনিয়ারিং-টা ঘুরে আসা যায়। ব্রুকলিনের মেট্রোটেক সেন্টার-এ এর অবস্থান। অনেক বছর পর নিউ ইয়র্ক সিটির এই বারো-তে আসলাম। একসময়ে ব্রুকলিন ছিল নিউ ইয়র্কের রাজা; তাই একে ‘কিংস’ও বলা হতো। কালের আবর্তে এবং অব্যবস্থাপনায় সেই গৌরব হৃত হয়েছে। যদিও পাশের বারো-র নাম এখনও ‘কুইন্স’-ই রয়ে গেছে। অবশেষে গত দুই দশক ধরে ব্রুকলিনের চেহারা পাল্টানোর কাজ হাতে নিয়েছেন মেয়রবৃন্দ; তাই আমি যখন এখানে পড়াশোনা করতাম, তখনকার তুলনায় এখন এর রাস্তাঘাট, অবকাঠামো ও নিরাপত্তা-ব্যবস্থা অনেক ভাল হয়েছে বলতেই হবে।

এখানে বলে রাখা ভাল, নিউ ইয়র্ক সিটি পাঁচটি বারো, বা আধা-স্বায়ত্তশাসিত এলাকা নিয়ে তৈরী: ম্যানহ্যাটন, কুইন্স, ব্রুকলিন, ব্রংক্স ও স্ট্যাটেন আইল্যাণ্ড। এই একেকটি বারো-ই কিন্তু আমেরিকার অন্যান্য শহরের সমান কিংবা তা’র চাইতেও বড়, আয়তন ও লোকসংখ্যার দিক দিয়ে বিচার করলে। এজন্যই নিউ ইয়র্ক স্টেটের ডাকনাম হচ্ছে ‘এম্পায়ার স্টেট’। পুরো একটা সাম্রাজ্য আর কি! বারো-গুলোর মধ্যে ব্যস্ততম হলো ম্যানহ্যাটন, যা কিনা ‘নিউ ইয়র্ক’ বলতে সাধারণ মানুষ যা বোঝে। নিউ ইয়র্কের সুউচ্চ আকাশ্চুম্বী অট্টালিকাগুলো সব এখানেই অবস্থিত। কিং কং-এর চড়া সেই এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং, ক্রাইজলার বিল্ডিং, সিটিব্যাঙ্ক বিল্ডিং, গ্র্যাণ্ড সেন্ট্রাল, রকেফেলার সেন্টার, রেডিও সিটি মিউজিক হল এবং খোদ ট্রাম্প টাওয়ার সব এখনেই। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ট্যুইন টাওয়ার দু’টোও এখানে ছিল, যেখানে অধুনা নির্মিত হয়েছে ফ্রিডম টাওয়ার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক যে স্ট্যাচ্যু অফ লিবার্টি, সেটাও এখানে। পৃথিবীর ব্যস্ততম অর্থবাজার ওয়াল স্ট্রীট এই ম্যানহ্যাটনের ডাউনটাউনে। আর, মক্কার পরেই যে জায়গাটিতে দিনেরাতে সবসময়ে লোকে গমগম করছে, সেই বিখ্যাত টাইমস স্কোয়ারও এখানে। তাই, ম্যানহ্যাটন না দেখে থাকলে আমেরিকা দেখা হয় না!

ব্রুকলিনের একটা পুরোনো ঐতিহ্য আছে। এখানকার মানুষগুলো কিছুটা হলেও একটু বেশী সংস্কৃতিমনা। এজন্যই হয়তো অনেক চিত্রশালা চোখে পড়ে এখানে। অনেকে বলে, ব্রুকলিনের লোকদের ভাষাগত একটা টানও আছে। শুনলে বোঝা যায় লোকটি ব্রুকলিনের অধিবাসী। আমার বিদ্যাপীঠটি এখানেই। অনেক বছর পর এসে চিনতে অসুবিধাই হচ্ছিল। যেহেতু অনেক মেকওভারের কাজ চলছে, রাস্তাঘাটের বেশ উন্নতি হয়েছে। দেখে মনে হলো, নিরাপত্তা-ব্যবস্থার মানও যথেষ্ট বাড়ানো হয়েছে। আমার এই পাঠস্থানটি আমেরিকার সবচেয়ে পুরোনো ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলগুলোর মধ্যে দ্বিতীয়, এবং পূর্ব আমেরিকার সর্বপ্রথম কারিগরী বিশ্ববিদ্যালয়। কালের আবর্তে এর নাম বেশ ক’বারই পাল্টেছে বটে, তবে ঐতিহ্যটা ধরে রেখেছে এরা। কিছুক্ষণ ঘুরে ঘুরে দেখলাম নতুনরূপে সাজানো এই ১৬৫ বছরের পুরোনো ইন্সটিটিউশনটিকে। পাস ছাড়া ক্লাসরুমগুলোতে ঢুকতে দিল না নিরাপত্তাকর্মী। অ্যাল্যুমনাই কার্ডটা করতেই হবে বুঝতে পারলাম। আমার নস্টালজিয়া দেখে ঐ নিরাপত্তাকর্মীই বললো যে, ম্যানহ্যাটনের প্রধান ক্যাম্পাসে চলে যাও, ওখানে স্যুভেনিয়রের দোকান আছে। কিছু কিনে নিয়ে যেতে পারবে দেশে স্মৃতি হিসেবে। মন্দ বলেনি লোকটা! দেখি গিয়ে কী কী পাওয়া যায় সেখানে। তা’ছাড়া ঐ ক্যাম্পাসটাও ঘোরা হয়ে যাবে। গাড়ীর জিপিএস-এ দেখলাম আধঘন্টার নীচে লাগবে পৌঁছাতে। রওয়ানা হলাম সে পথে। অবশ্য তা’র আগে ক্ষুধা নিবৃত্ত করলাম মেট্রোটেক বিল্ডিং-এর সামনে এক পিৎজেরিয়া থেকে ১ ডলারের এক স্লাইস পিৎজা দিয়ে। এটাও একটা স্মৃতি রোমন্থনই বটে!

ম্যানহ্যাটন যাওয়ার আগে খুব কাছেই অবস্থিত ওয়াটারফ্রন্ট-এ একটু যেতে ইচ্ছে করলো। এখান থেকে ম্যানহ্যাটনের ডাউনটাউন দেখা যায়। লিবার্টি আইল্যাণ্ডে দাঁড়িয়ে থাকা নতুন অভিবাসীদের স্বাগত করতঃ লেডী লিবার্টির স্ট্যাচ্যুও দেখা যায় এখান থেকে। ১৮৮৬ সালে ফরাসীদের উপহার দেওয়া এই ১৫১ ফিটের সৌম্য মূর্তিটি ভাগ্যান্বেষনে আসা নতুন অভিবাসীদের দিবানিশী স্বাগত জানিয়ে যাচ্ছে। এখনকার মার্কিন সরকারের অভিবাসী-ঠেকাও নীতির সাথে এটা সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। একদিকে লেডী লিবার্টি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে অভিবাসীদের এদেশে আসার জন্য স্বাগত জানাচ্ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ সীমান্তে উঁচু দেওয়াল তৈরী করে নতুন মানুষ যাতে না আসতে পারে, সে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। মজার কথা হচ্ছে, যারা এই কঠোর নীতি বাস্তবায়ন করছেন বা সমর্থন করছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই দুই-এক প্রজন্ম আগে অন্য দেশ থেকেই এসেছেন। খোদ মাটির মানুষ বা ইন্ডিজেনাস মানুষ যদি বলতে হয়, সে হলো রেড ইণ্ডিয়ানগণ। কিন্তু তাদেরকে মেরে, বিতারিত করে অভিবাসীরাই দখল করে এই আমেরিকা তৈরী করেছে। এখন সেই অভিবাসীরাই আবার বলছে, আমরা এসেছি এসেছি, আর কাউকে আসতে দেব না!

ওয়াটারফ্রন্টে গাড়ী রেখে সমুদ্রের পাড়ে কিছুটা হাঁটলাম। দূরে দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন ফেরীতে করে পর্যটকরা লিবার্টি আইল্যাণ্ডে যাচ্ছে। স্ট্যাটেন আইল্যাণ্ড ফেরী দেখলাম; লোকজন নিয়ে ম্যানহ্যাটনে পৌঁছে দিচ্ছে। ঝকঝকে রোদে খুব সুন্দর লাগছিল পরিবেশটা। আগে এখান থেকে ট্যুইন টাওয়ার দেখা যেত। ২০০১-এর ১১ই সেপ্টেম্বরের পর থেকে অনেকদিন পর্যন্ত অসম্পূর্ণ ছিল ডাউনটাউন ম্যানহ্যাটনের আকাশরেখাটা। বছর পাঁচেক আগে আমেরিকার সবচাইতে উঁচু বিল্ডিং ১০৪ তলা-বিশিষ্ট ফ্রিডম টাওয়ার তৈরী করে সে অভাব কিঞ্চিৎ পূরণ করা হয়েছে।

বিখ্যাত ব্রুকলিন ব্রীজ পার করে ম্যানহ্যাটনে পৌঁছালাম মিনিট বিশেকে। এই ব্রুকলিন ব্রীজটিও ঐতিহাসিক এবং অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ। পূর্ব-নদী বা ইস্ট রিভারের উপর ১৮৮৩ সালে এই সেতু তৈরী হওয়ার পর থেকে ব্রুকলিনের সাথে ম্যানহ্যাটনের একটা স্থায়ী যোগাযোগ ব্যবস্থা শুরু হয়।

ওয়াশিংটন স্কোয়ার পার্কের সাথেই নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস। আমেরিকার বিস্ববিদ্যালয়গুলোর সাধারনতঃ দু’রকম ক্যাম্পাস হয়ে থাকে: আর্বান এবং রুরাল। আর্বান ক্যাম্পাসগুলো শহরের মধ্যে অবস্থিত, এবং সাধারনতঃ উঁচু উঁচু কয়েকটা ভবনে এদের সকল কার্যক্রম পরিচালিত হয়। অন্যদিকে রুরাল ক্যাম্পাসগুলো সাধারণতঃ মূল শহরের একটু বাইরে হয়, যেখানে কয়েক একর নিয়ে বিস্তৃত থাকে ক্যাম্পাস। ভবনগুলো তিন বা চার তলার বেশী হয়না, কিন্তু অনেক ছড়ানো ছিটানো থাকে। যারা ব্যস্ত শহর-জীবন পছন্দ করে, তা’রা আর্বান ক্যাম্পাসওয়ালা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়; আবার যারা একটু চুপচাপ পরিবেশ, মাঠ, বাগান ইত্যাদি পছন্দ করে, ত’’রা বেছে নেয় রুরাল ক্যাম্পাস।

এনওয়াইইউ-এর প্রধান ক্যাম্পাসের সুবিধা হলো, যদিও এটা আর্বান, তথাপি প্রায় পৌনে দশ একরের সুন্দর একটা পার্ক এর সাথেই রয়েছে, যার নাম ওয়াশিংটন স্কোয়ার পার্ক। ছাত্রছাত্রীরা যখন ইঁটপাথরের দেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ থাকতে থাকতে অস্থীর হয়ে পড়ে, তখন এই পার্কে বসে তা’রা মুক্ত বাতাসে প্রশ্বাস নেয়। অবসরে সময় কাটায় গাছের নীচে। অবশ্য শীতের সময়, বিশেষ করে যখন বরফ পড়া শুরু হয়, তখন এই পার্কটি সম্পূর্ণ বেকার!

ঘুরে ঘুরে দেখলাম নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির বিভিন্ন ভবনগুলো। এ ক্যম্পাসের সাথে আমার তেমন একটা যোগসূত্র কেই বললেই চলে। কিন্তু যেহেতু আমারই আল্‌মা মাটার, তখন ঘুরতে ভাল লাগছিল বৈকী! বইয়ের দোকানে গিয়ে মগ, লেপেল-পিন ইত্যাদি কয়েকটা স্মৃতিবস্তু সংগ্রহ করলাম।

কয়েকটা টুকটাক জিনিস কেনার ছিল ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার জন্য। ঠিক করলাম কোন একটা ওয়ালমার্ট-এ গেলে সবগুলো একজায়গায় পাওয়া যাবে। গাড়ীর ভূ-অবস্থান যন্ত্রটি বললো, হাডসন নদীর ওপারেই আছে ওয়ালমার্টের এক বিশাল দোকান। হাডসনের নীচ দিয়ে লিংকন টানেলে করে উপস্থিত হলাম সেখানে। আমি তখন নিউ ইয়র্ক ছেড়ে নিউ জার্সিতে। অনেকটা ঢাকা ছেড়ে এসে গাজীপুর! ফর্দমত জিনিসগুলো নিয়ে জিপিএস মহাশয়ার ভরসায় যাত্রা করলাম নিউ ইয়র্কের লা-গর্ডিয়া ম্যারিয়টের উদ্দেশ্যে। আই-৯৫ ইন্টারস্টেট হাইওয়ে দিয়ে জর্জ ওয়াশিংটন ব্রীজ হয়ে প্রথমে ম্যানহ্যাটন, আর পরে সেখান থেকে কুইন্সের লা-গর্ডিয়ায় যেতে নির্দেশ দিলেন জিপিএস মহাশয়া। অন্যমনস্কতার কারণে তিন-তিনবার রাস্তা ভুল করে, একই রাস্তা এবং টোল-গেট কয়েকবার পার করে ৩০ মিনিটের পথ ১ ঘন্টায় পৌঁছালাম।

বাংলাদেশী আমেরিকান বিজনেস অ্যালাইএন্স (বাবা) এ হোটেলে আয়োজন করেছে একটি সেমিনার। মন্ত্রীবর্গসহ আমরা যারা ঢাকা থেকে এসেছি, তা’দের সাথে মতবিনিময় ও দিকনির্দেশনা নেওয়াই এই অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য। বাংলাদেশীদের ব্যবস্থাপনায় অনুষ্ঠান, তাই সাড়ে আটটার অনুষ্টান যথারীতি শুরু হলো পৌনে দশটায়। বক্তব্য দেওয়ার মানুষের অভাব নেই। সংশ্লিষ্ট সকলে একে একে মাইক হাতে নিয়ে এখানকার সমাজে নিজেদের অবস্থান আরেকটু দৃঢ় করার প্রচেষ্টা করলেন। অবশেষে ডাক আসলো আমার। প্রবাসী বাংলাদেশীগণ কী করে আমাদের দেশে বিনিয়োগ করতে পারেন এবং তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের বিকাশে কীভাবে সাহায্য করতে পারেন, এ বিষয়ে কিছু ফরমুলা দিলাম আমি। বক্তৃতা শেষে যখন ভাবছি কেটে পড়বো, তখন একে একে প্রায় ডজন খানেক স্থানীয় ব্যবসায়ী আমায় ধরে বসলেন, কী করে তারা বাংলাদেশের এই তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রযাত্রায় সামিল হতে পারবেন। মনে মনে ভাবলাম, বক্তৃতা তা’হলে মানুষ শুনেছে! যা’হোক, সবার সাথে আলাদা আলাদা কথা বলে, ভবিষ্যতে সবরকম সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম। ততক্ষণে রেস্তোরাঁ সব বন্ধ হয়ে গেছে। অগত্যা চিরাচরিত ম্যাকডোনাল্ড্‌সের ছাইপাশ খেয়েই নৈশভোজ সারলাম।

সৈয়দ আলমাস কবীর
লেখক: প্রেসিডেন্ট, বেসিস