তিতির আজকে স্ত্রী হয়ে আসবে তন্ময়ের। মুনিয়া আসবে ওর মেয়ে হয়ে। তন্ময় শুধু ভাবলো কিভাবে এসব হুট করে হয়ে গেলো।

শুক্রবার দুপুরে তিতিরকে আহমেদ চাচা নিয়ে যাওয়ার পরে আর কিছু জানাননি সেদিন। গতকাল ডেকে পাঠালেন তন্ময় কে। সকালেই নাশতা করতে করতে কথা বললেন। তিতির ছিলো না সামনে। মুনিয়াকে নিয়েই ব্যস্ত ছিলো ঘরে। রানীর মা খেয়াল রাখছিলেন। হাল্কা একটু জ্বর এসেছে তিতিরের। হয়তোবা টেনশনে বা উত্তেজনায়, বা ভয়ে। মুনিয়া সুস্থ আছে। রানীর মা ওকে কোলে রাখার জন্য শিমুলকে বাসায় আনিয়েছেন। শিমুল রানীর মা’য়ের ভাতিজি। প্রাইমারি স্কুলে পড়া শেষ করে এখন রানীর মায়ের কাছে এসেছে হাই স্কুলে পড়তে। আহমেদ সাহেব ভর্তিও করিয়ে দিয়েছেন বাসার কাছের হাই স্কুলে। নিজে কাজ না থাকলে মাঝেমধ্যে আবার খোঁজ খবর নেন শিমুলের পড়াশোনার।

আহমেদ চাচা সরাসরি তিতিরের সাথে তন্ময়ের বিয়ের কথা বললেন। উনিই যে সব ব্যবস্থা করেছেন তাও জানালেন। সুনন্দা আর সুপ্রীতির জানা আছে, সেটাও বললেন। তন্ময় শুনে যাচ্ছে আর অবাক হচ্ছে। সবকিছুই সবাই-ই জানে, অনেক কিছু সবার জানা হয়ে গেছে, তাও এক দিনের মধ্যে অথচ ওকেই কেউই কিছু জানায়নি। সবকিছু শুনে তন্ময় বের হলো বাড়ী থেকে। একবার গাড়ীতে স্টার্ট দেবার আগে দোতলায় তাকালো। কাউকে খুঁজছিলো চোখ জোড়া। কিন্ত কাউকেই দেখতে পায়নি কোথাও।

ব্যাংকে গেলো তাড়াতাড়ি। অনেকটা টাকা ক্যাশ তুলে নিলো। সুনন্দ আর সুপ্রীতি জানায়নি। তবুও তন্ময় নিজেই এবার বোনদের জন্য কাপড় কিনতে বের হলো, জামাইদের কথাও মাথায় আছে। মনে মনে ভাবলো, আমাকে সারপ্রাইজ দিবি, আমি তোদের বড় ভাই, দেখ এখন আমি কি সারপ্রাইজ দেই তোদের। ও খুব ভাল করেই জানে দুইবোনের দৌড়, তাই কোথায় কি কিনতে যেতে পারে খুব ভালই জানা আছে তন্ময়ের নিজেরও। ড্রাইভ করতে করতেই একবার মিন্টুকে ফোন করে দুইটা স্যুট রেডি করতে বলে দিলো দুই বোনের জামাইয়ের জন্য। একই রঙের, সাথে শার্ট, টাই বলে দিলো। মিন্টু পাঠিয়ে দেবে বাড়ীতেই বিকেলের মধ্যে। আছে ওর কাছে স্টক। আর যেহেতু বোনের জামাইদের জন্য, তাই T.M. Lewin এর Barberies Wool Mill Collection থেকে Charcoal Grey Brondesbery ডিজাইন এর স্যুটই বলে দিলো। বুধবার বিকেলেই অফিস থেকে বেরিয়ে দেখেছিলো এই নতুন কালেকশন বাসায় ফেরার পথে। তাই নিজের জন্য যা পছন্দ করেছিলো, সেটাই অভি আর রাতুলের জন্যই চাইলো। ভীষণ ভালবাসে ছেলে দুইজনকে। মানেও এরা দুইজন বড় ভাইয়ের মতো। জামাইদের জন্য শেষ হতেই বোনদের জন্য কেনাকাটার চিন্তা করলো মনে মনে। ওদের বিয়েতে কেউই ল্যাহেংগা পায়নি শ্বশুর বাড়ী থেকে, মনে আছে সেটা, বলেওছিলো একসময় দু’জন। ভাইয়ার বিয়েতে একরকম ল্যাহেংগা পড়বে। এখন এক বেলায় এতকিছু। শামীম ভাইকে কল দিলো। খান ব্রাদার্স, স্টকে কি আছে জেনে সরাসরি গেলো। শামীম ভাই বলে দিয়েছেন। কি কি দেখাতে হবে, সেটাও, তাই সহজেই হলো। ম্যানেজার মুখতার আসতেই বলেও দিলো সুনন্দা সুপ্রীতি এসেছিলো, আধ ঘন্টার একটু আগেই গেছে। এখন আবারও মুখতার নিজেই সবই রেডি করে রেখেছে, এক্সক্লুসিভ কালেকশন থেকে। খুব ভারী না, আবার কম কাজেরও না, পিটা কাজের চাপানো পাথর, চুমকী, তারের কাজ মিলানো একেকটা ল্যাহেংগা দেখে দুইটা একই রঙের ডার্ক বারগেন্ডি, নিলো দুই বোনের জন্য। অনেক খুঁজে মুনিয়ার জন্যও একটা ছোট্ট ল্যাহেংগা কিনলো। এইটা অবশ্য গোলাপী রঙ! বেবী পিংক! গয়না কিনে নিতে দোপাট্টা একটা সাথে নিলো। রঙের জন্য। ডার্ক রুবির সেট পাওয়া যাবে। মনে হয়। দেখাই যাক, কি পাওয়া যায়। রানীর আর রানীর মা’য়ের জন্যও কাপড় কিনে নিয়েছে। গত পাঁচ বছর ধরে এই দু’জন মানুষ রেঁধেবেড়ে খাওয়াচ্ছেন তন্ময়কে। বাড়ীর বিয়েতে একটু ভাল কাপড় কিনে দিতে পেরে সেজন্য একটু আনন্দই লাগছিলো। বোনদের বিয়ের সময়েও দিয়েছে। ওরাও খুবই খুশী হয়।

“ভাইয়া, তুমি কোথায়?” সুনন্দার ফোন। ড্রাইভ করছে বলে শুধু হ্যান্ডসফ্রি দিয়ে কথা বলছে। পাঁচটার দিকে বাসায় থাকতে বলেই কেটে দিলো সুনন্দা। বেশী কথা বলেনি। আহমেদ চাচার সাথে কথা হয়েছে সেটা চেপে গেলো দেখে মজাই লাগলো তন্ময়ের। আচ্ছা আসুক বিকেলে। সব কেনাকাটার পরে একটা শান্তি লাগছে, যে আজকে টাকা ছিলো বলে সব কিছু কত সহজে করে ফেললো, অথচ বোনদের পড়ানোর সময়ে পরীক্ষার ফিস দিতে হবে ঠিকঠাক সময়ে, তাই তন্ময় একসময় দুপুরে শুধু দুইটা সিংগাড়া খেয়ে থাকতো, কাজের ঝামেলায় সময় করতে পারছে না বলে অজুহাত দিয়ে সরে থাকতো।

চার ঘন্টা ধরে শপিং শেষ করে বাসায় ফিরে শাওয়ার নিতেই সুনন্দা আর সুপ্রীতির আগমন। ভাইয়ার ঘরে ঢুকে জড়িয়ে ধরে দুইবোন।

“আরে পাগলিরা, থাম, কি হয়েছে?”
“তোমার বিয়ে ঠিক করেছি, আহমেদ চাচার সাথে মিলে।”
“তাই নাকি? কবে ঠিক করলি, আমাকে তো বললিও না, এখন আমি যদি ভেগে যাই, তাহলে?”
“ভাইয়া, সবসময়ই ফাজলামি করবা না, ভাগবা কেন? তুমি তিতির আপাকে পছন্দ করো না?”
“জানিনা তো? হঠাৎ তিতিরের কথা কেন?” আলগা একটা ভাব নেয়ার চেষ্টা করলো তন্ময়।
“ভাইয়া, ভাল হবে না কিন্ত!” বলতে বলতেই ড্রেসিং রুমের আলমারির দিকে যাচ্ছিলো সুনন্দা। ভেতরে ব্যাগ দেখেই চিৎকার, ” ভাইয়ায়ায়ায়ায়ায়া!!!! এইসব কি? তুমি আমাদের বললা নে কেন? আমরাও যেতাম তোমার সাথে বিয়ের শপিং করতে”
“নিয়ে আয় এখানে, ব্যাগগুলো আলাদা আলাদা করে আনা শেষ করার আগেই রানীকে ডাক দিলো তন্ময়। আসার পরে ওর জন্য কেনা শাড়ী, গয়না তুলে দিতে সুনন্দাকে দিলো ওর হাতে। রানীর কাপড় চোপর দেখে তো দুই বোন খুউব খুশী। রানীকে বলে দিলো তাড়াতাড়ি গোসল করে সেজে নিতে। বেশী সময় পাবেনা।
তারপর রানী চলে গেলে তন্ময় একবার জিজ্ঞেস করলো অভি আর রাতুলের কথা। আসছে বলাতে একটু নিশ্চিত হলো তন্ময়। এবার বোনদের জন্য কেনা লেহেংগা আর গয়নার ব্যাগগুলো দিলো দু’জনকে। খাটে বসা ছিলো দুই বোন ভাইয়ের দুই পাশে। অবাক আর খুশী হয়ে দুই বোন জড়িয়ে ধরলো ভাইকে। জিজ্ঞেস করলো ও কি কিনেছে তিতিরের জন্য? তন্ময় সরাসরি বলে দিলো, তোরা যা কিনেছিস, তারপর আর আমার কিছু কেনার নেই। দুইবোনের কথা বন্ধ, তুমি জানলা কি করে!!! তন্ময় শুধু বললো, তোরা ভুলে যাস কেন আমার বোন তোরা, কোথায় কি শপিং করিস কি কিনতে যাস, আমি ঘরে বসেই সব খবর পেয়ে যাই। খুশী হলো দুই বোন। বললো, কি কি কিনেছে, তন্ময় শুধু দুই বোনকে মুনিয়ার জন্য কেনা ড্রেসটা দিলো, ওদের মাথায় হাত, আল্লাহ কি করে ভুলে গেলাম পুতুল এর জন্য কিছু কিনতে!! আরও লজ্জা পেলো ভাইয়ের কাছে নিজেদের জামাইদের সব শার্ট স্যুট দেখে!

ফোন করলো এবার তন্ময় অভি আর রাতুলকে, দুজনেই যে কতটা দুষ্টুমির মুডে আছে বুঝলো কল ধরতেই। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলো, এসে ঢুকেই সব দেখে পুরোই লজ্জা পেয়ে গেলো। অভি তাড়াতাড়ি করে ঘরের বাইরে গিয়ে শেরওয়ানি, পাঞ্জাবী সব নিয়ে ঢুকলো। পাগড়ি আনার কথা ভুলে যায়নি, আসলে কালচে মেরুন শেরওয়ানি র সাথে মেলানো পাগড়ি পায়নি। তাই আনেনি। শুনে তন্ময় বললো, বাঁচলাম, একটা কিছু থেকে রেহাই পেলাম।

সবকিছু দেখে দুই বোন তাড়াতাড়ি করে প্যাকেট খুলে ওদের আনা ডালাতে করে শুধু সাজিয়ে নিলো। আহমেদ চাচার জন্য কেনা শেরওয়ানি সেটও নিলো। রাতুল আর সুনন্দা নিয়ে গেলো পৌঁছে দিয়ে আসতে, আর সুপ্রীতির রইলো অভির সাথে ভাইয়ের কাছে।

সুনন্দা আর রাতুল আহমেদ চাচার ড্রইং রুমে একজন বয়স্কা মহিলাকে দেখে একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলো, তখনই চাচা আলাপ করিয়ে দিলেন, ওনার একমাত্র ছোট ভাইয়ের বউ, তিতিরের মা! সুনন্দা তো অবাক! সবকিছুই এখন আরও অবাক করে দিচ্ছে। আহমেদ চাচাও যে এত কিছুর সাথে জড়িয়ে ছিলেন ভাবতেই পারছেনা সুনন্দা।

সুনন্দা অপেক্ষা করছিলো মিতা আপুর জন্য। মিতা আপু খুব সুন্দর করে ঘরে এসে নিজের হাতে বউ সাজিয়ে দেন। সবাইকে অবশ্যই না। শুধুই নিজের আপনজনের জন্য। অসম্ভব গুণের মহিলা মিতা আপু। একদিকে স্কুলের চাকরি, সাথে বেনুকা’র কাজ সামাল দেয়া, আবার দুই বাচ্চাকে মানুষ করা। মাহবুব ভাই আর্মিতে, এভিয়েশন কোরে। ঢাকায় পোস্টিং থাকলে মিতা আপুর কাজ আরেকটু বেশী থাকে, আর্মির ডিনার অ্যাটেন্ড করার। আজকে তিতিরকে সাজানোর কথা বলার পরে, উনি নিজের কাজ বাদ দিয়ে খুশী মনে রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। এত তাড়াতাড়ি বিয়ে ঠিক হবার কথা শুনে, নিজেই দায়িত্ব নিয়েছেন সবকিছু কিনে নিয়ে আসবেন। তিতিরকে উনিও ভীষণ পছন্দ করেন ইউনিভার্সিটি লাইফ থেকেই। জুনিয়র বলেই স্নেহের মাত্রাটা একটু বেশীই।

মিতা আপু পাঁচটা নাগাদ চলে আসলেন। এতক্ষণে তিতিরের ঘরে গেলো মিতা আপু আর সুনন্দা। তিতিরের মা’কে আহমেদ চাচা আপাতত সামনেই বসিয়ে পাহারা দিচ্ছেন। খুব একটা নরম গোছের না, তাই আহমেদ চাচাও যথেষ্ট শক্ত হয়েই কথা বলে যাচ্ছেন।

সবকিছুর মাঝেই একবার খানার অর্ডার দিয়ে দিয়েছেন ফখরুদ্দিনে। রফিকের সাথে কথা বলে খোকনকে বলে দিয়েছেন। সময়মতো সব এসে পড়বে। বাড়ীর সামনের লনে প্যান্ডেল লাগানো শেষে এখন চেয়ার টেবিল সাজাচ্ছে। খোকনই সব কিছু গুছিয়ে করাচ্ছে। এই একটা সুবিধা, রফিকের কাছে বলে দিলে আর কিছুই করতে হয়না। এখন অবশ্য অনেক বিয়েতেই এভাবে সব রেডিমেড পাওয়া যায়, অনলাইনে বলে দিলে। আহমেদ সাহেব পুরনো দিনের মানুষ, তাই পুরনো মানুষ রফিকের ওপরেই আস্থা রেখেছেন বাড়ীর একটা মাত্র বিয়েতে।

তন্ময় বাড়ী থেকে আর বের হয়নি। শুধু একবার কথা বলতে ফোন করেছিলো তিতিরকে। কল ধরেনি। ব্যস্ত ছিলো হয়তো বা। সুনন্দা বলেছে, সাজানো শুরু করেছে। আর কিছুক্ষণ পরে ওদের কয়েকজন বান্ধবী আসার পরেই ও চলে আসবে। আহমেদ চাচার অফিসের অ্যাডমিন ম্যানেজার আঞ্জুমান আপুও চলে এসেছেন। এখন সুনন্দা যেতে পারে। গয়নাগুলো আহমেদ চাচার কাছেই দিয়ে গেলো। চাচাও আবার তিতিরের মা’য়ের কাছে দিলেন আর বললেন না পড়াতে। সন্ধ্যায় বিয়ে পড়ানোর পরে পড়াতে বলে দিলেন।

তিতির সারাদিন একাই ঘরে নিজেকে বন্দী করে রাখে। রানীর মা খাওয়া নিয়ে গিয়ে জোর করে খাওয়াচ্ছেন। মুনিয়াকেও আদর করে কোলে কোলে রাখছেন। তিতিরের জীবনের এই দুইটা দিন যেন দুই যুগের চেয়েও বেশী সময়। মিতা আপুকে নিয়ে সুনন্দা যখন তিতিরের ঘরে এসে ঢুকলো, তিতিরকে ঘরে না দেখে রানীর মা’কে ডাক দিলো। অস্থির হয়ে দু’জন খুঁজতে গিয়ে খেয়াল করলো, মুনিয়া ঘরে নাই, শিমুলের কাছে সাড়া পেলো, মুনিয়া ঘুমাচ্ছে। একটা অস্থিরতা কমলো। কিন্ত তিতির কোথায় গেলো? আহমেদ চাচা, তিতিরের মা দৌড়ে ছুটে আসলেন ওপর তলায়। চাচা’ই জিজ্ঞেস করলেন বাথরুমে কজেয়াল করেছে কিনা কেউ? করেনি বমাত, উনি নিজে গিয়ে ধাক্কা দিলেন বুঝলেন ভেতর থেকে বন্ধ। ডাকাডাকি করেও কোন সাড়া না পেয়ে নীচের থেকে অন্যা লোকদের ডাকলেন। জোরে ধাক্কা দিয়ে দরজা ভেঙে ফেলে খুলে দেখতে বললেন।

তিতির!!!! মা!!!!! বলে চিৎকার করে ড্রাইভার কে বললেন জলদি গাড়ী বের করতে, রাতুল তাড়াতাড়ি করে তিতিরকে পাঁজকোলে করে বেরিয়ে সুনন্দাকে আর তিতিরের মা’কে নিয়ে গাড়ীতে উঠতে বললেন আহমেদ চাচার জীপে।

আহমেদ চাচাও চললেন সবার সাথেই। অস্থিরতায় খেয়াল করেননি, গাল ভেজা, চোখে ঝাপসা লাগছে।
মা’রে, তোর সুখের কথা ভেবে, মুনিয়ার কথা ভেবেইন্তো সবকিছু করছি রে মা! মনে মনে বলতে বলতেই হাসপাতালের দিকে যাচ্ছেন রাতুলের সাথে গাড়ীতে!

তৌফিকুল করিম সুহৃদ

লেখক:
Director
Fingertips Innovations Ltd.