দক্ষিণাঞ্চল জুড়ে বৃষ্টিপাতের সাথে সাথে নদ-নদীগুলোতে জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। বরিশাল আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, উপকূল জুড়ে দিনভর ভারিবর্ষণের সাথে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আবহাওয়া অফিসের পর্যবেক্ষক আবু জাফর সকাল ১০টায় জানান, ঘূর্ণিঝড় বুলবুল খুলনা ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থান করায় সারাদিন ভারি বর্ষণ হবে। জোয়ারের সময় ৫ থেকে ৭ ফুট পানি বৃদ্ধি পাবে।সকাল ৯টা পর্যন্ত বরিশাল আবহাওয়া অফিসের রেকর্ডে গত ২৪ ঘণ্টায় ১৩৯ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। শনিবার সকাল থেকেই ভারি বর্ষণের সাথে প্রবল বাতাস শুরু হয়। সকাল ১০টা নাগাদ বর্ষণের পাশাপাশি বাতাসের তীব্রতা বেড়েই চলছিলো।

বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার কন্ট্রোল রুমের সর্বশেষ শনিবার রাত ১২টা পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী ৬ জেলার প্রায় ১৩ লাখ মানুষ ও লক্ষাধিক গবাদি পশু ২ হাজার ৪৩৬টি সাইক্লোন শেল্টারে আশ্রয় নিয়েছে।

বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার ইয়ামিন চৌধুরী জানান, ঘূর্ণিঝড় বুলবুল মোকাবিলায় প্রতিটি জেলায় জেলায় জেলা প্রশাসকদের নেতৃত্বে এ বিষয়ে তদারকি করা হচ্ছে। এতে সহযোগিতা করছে আইন-শৃখলা রক্ষাকারি বাহিনী ও সিপিপির সদস্যসহ স্বেচ্ছাসেবকরা।

ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচী সিপিপি’র বরিশাল আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মোঃ আব্দুর রশীদ জানান, দেশের উপকূলীয় এলাকার ১৩টি জেলার ৪১টি উপজেলায় সিপিপি’র মোট ৫৫ হাজার ৫১৫ জন স্বেচ্ছাসেবক কাজ করছে। এছাড়াও বরিশাল সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ৩০টি ওয়ার্ডে দুর্গতদের জন্য ৯৭টি আশ্রয়কেন্দ্রে মানুষ আশ্রয় নিয়েছে।
বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার ইয়ামিন চৌধুরী জানান, বিভাগের ২৪শ আশ্রয় কেন্দ্রে সাড়ে ৮ লাখ মানুষ আশ্রয় গ্রহণ করেছে। বরিশাল নদী বন্দর কর্মকর্তা আজমল হুদা মিঠু সরকার জানিয়েছেন, ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে শনিবার থেকে বরিশাল নৌ-বন্দর থেকে সকল ধরনের নৌ-যান চলাচল বন্ধ করেছে বিআইডব্লিউটিএ।

প্রশাসনসহ বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া শনিবার রাত পর্যন্ত বরিশালে আশ্রয় কেন্দ্রে প্রায় লক্ষাধিক মানুষ, পটুয়াখালীতে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ, ভোলা প্রায় ৪ লাখ মানুষ আশ্রয় গ্রহণ করেছে। তবে উপকূলের বিভিন্ন স্থানে সাইক্লোন সেন্টারগুলোতে মানুষের আশ্রয় নেয়ার খবর পাওয়া গেলেও অধিকাংশ মানুষ বাড়ি ঘর ছেড়ে আশ্রয় কেন্দ্রে যায়নি বলে জানা গেছে।

রাঙ্গাবালী সংবাদদাতা জানান, উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলায় ১২টি চরে আশ্রয় কেন্দ্র নেই। তবে দুর্যোগ মোকাবেলায় সকল ধরণের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় প্রশাসন। প্রশাসনের দাবি, আশ্রয় কেন্দ্র না থাকা চরগুলোর মানুষদের নিরাপদে সরিয়ে আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে ১০ নম্বর সংকেতের মাইকিং করা হলেও আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে তেমন মানুষজন উঠছে না। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার রাঙ্গাবালী ইউনিয়নের চরকাশেম, চর মাদারবুনিয়া, কলাগাছিয়া চর, চরকানকুনি, ছোটবাইশদিয়া ইউনিয়নের চরইমারশন, চরনজির, চরতোজাম্মেল, কাউখালী চর ও চালিতাবুনিয়া ইউনিয়নের চরলতা নামক ৯টি চরে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র না থাকায় সেখানকার মানুষের দুর্যোগকালীন অনেক বেশি ঝুঁকি রয়েছে। এ উপজেলার চালিতাবুনিয়া ইউনিয়নের মধ্য চালিতাবুনিয়া, বিবির হাওলা ও গরুভাঙা গ্রামের পাঁচ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধ বিধ্বস্ত থাকায় এবং একমাত্র ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রটি নদী ভাঙনে বিলীন হয়ে যাওয়ায় সেখানকার মানুষদের মধ্যে দুর্যোগ আতঙ্কে রয়েছে বলে জানা গেছে। এ উপজেলার মোট ১২টি চরে আশ্রয় কেন্দ্র নেই। সেখানে প্রায় ১০ হাজার মানুষের বসবাস। তাই সেখানকার মানুষের দুর্যোগ ঝুঁকি বেশি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাশফাকুর রহমান বলেন, ঘূর্ণিঝড় বুলবুল মোকাবেলায় আমরা সকল ধরণের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। মানুষদের সতর্ক করতে মাইকিং করে ৫৪টি সাইক্লোন শেল্টারে আশ্রয় দেয়া হয়েছে।

ভোলা প্রতিনিধি জানান, জেলার মনপুরা উপজেলার কলাতলি চরের সাইক্লোন শেল্টার, ঢাল চরের সাইক্লোন শেল্টারে ও ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে অনেকে আশ্রয় নিয়েছেন। চর কুকরি-মুকরি চেয়ারম্যান হাসেম মহাজন জানান, স্থানীয় মানুষজনদেরকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রেড ক্রিসেন্টের সাইক্লোন শেল্টারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

মনপুরা থানার ওসি শাখাওয়াত হোসেন জানান, সেখানকার ৩৭টি সাইক্লোন শেল্টার সহ মোট ৭৪টি আশ্রয় কেন্দ্রে কয়েক হাজার মানুষ তাদের গবাদি পশু নিয়ে আশ্রয় নিয়েছে।

তিনি জানান, উপজেলা চেয়ারম্যান, নির্বাহী অফিস সহ পুলিশ চরকলাতলী, ঢালচর, চরনিজাম, কোরালিয়া, চরপাতিলা, বাসনচর ও মাঝেরচরে গিয়ে মানুষদের আশ্রয় কেন্দ্রে যাবার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

পটুয়াখালী, বরগুনা সহ উপকূলীয় এলাকার নদী ও সাগর বেষ্টিত মানুষের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে। উপকূলের এসব বাসিন্দাদের প্রকৃতির সাথে লড়াই করে বাঁচতে হয়। ঘূর্ণিঝড় ধেয়ে আসছে এমন সংবাদে অনেকেই উৎকণ্ঠা নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছুটলেও কেউ কেউ বসতভিটার মায়া ছেড়ে যেতে চাচ্ছেন না আশ্রয় কেন্দ্রে।