সুনন্দা’র কোলে বসে খেতে খেতেই তিতিরের দিকে তাকালো মুনিয়া। কোলে উঠতে একটু হাত বাড়ালেও আবার সুনন্দা খেলনা দিতেই ব্যস্ত হয়ে গেলো। খাওয়া শেষ করিয়ে তারপর সুনন্দা কোলে বসিয়েই মুখ মুছিয়ে দিয়ে মা’য়ের কাছে দিলো। তিতিরও খুশী মনেই কোলে নিলো। সুপ্রীতিও এসে দাঁড়ালো পাশে। মুনিয়ার সাথে সুপ্রীতিও একটু খেলা দিলো। সবার সাথেই একটা হাসিমুখ দিয়ে মুনিয়া সবারই মন জয় করে ফেলেছে। আদরের জন্য মুখিয়ে থাকে, কোলে তুলতে হাত বায়ারালেই একগাল হাসি দিয়ে লাফ দেয় কোলে যেতে। সব ছোট বাচ্চাদের মতো মুনিয়াও সহজেই খুশী হয়ে যায় আর আদরে পেয়ে আপন হয়ে যায় সবার।

সবাই মিলে নাশতা করবে আজকে একসাথে। তাই আজকে সবাই-ই তন্ময়ের ফ্ল্যাটে। নাশতার টেবিলে সবাই মিলে প্ল্যান করছিলো, তন্ময় আর মুনিয়াকে বাইরে বেড়াতে পাঠানো নিয়ে। তন্ময় থামিয়ে দিয়ে বললো, পরে হবে, আপাতত না, সময় বুঝে ওরা দু’জন মিলে ঠিক করে বেড়াতে যাবে কোথাও মুনিয়াকে নিয়েই। যদিও তন্ময় বলেনি, তিতিরের সাথে করা প্ল্যান। দু’জন যাবে বেড়াতে, কয়েকদিনের মধ্যেই। মালয়েশিয়া। গুছিয়ে তারপর সবাইকে বলবে। আগে কিছুই বললো না দেখে তিতির একটু তাকিয়েছিলো তন্ময়ের দিকে।

ব্যাপারটা খুবই ভাল লাগলো তিতিরের, ওদের দু’জনে মিলে প্ল্যান করা কথা তন্ময় সবাইকে বলে দিলো না। আসলেই আস্তে আস্তে শ্রদ্ধা, সম্মান বাড়ছে তন্ময়ের জন্য। মানুষ হিসেবে এই সামান্য ছোট ছোট ব্যাপার, অনেক বড় করে দেয় মানুষকে অন্যের কাছে। সবসময়ের না পাওয়া, অশ্রদ্ধা, অসম্মান, অপবাদ থেকে মুক্তি পেয়ে, এক অন্য জগতে যেন মাথা উঁচিয়ে আছে তিতির আজকে। একজন মানুষের সামান্য আচরণ দিয়েই সেটা বুঝতে পারছে। এই সকালেই মনটা খুশীতে ভরে গেলো!

নাশতা করে আড্ডা মারার সময় আহমেদ চাচার ফোন আসলো। তন্ময়কে বললেন তিতিরকে আর মুনিয়াকে নিয়ে ফিরানী গিয়ে ওনার বাড়ীতে একবার থেকে আসতে। রীতি মেনে করতে চাইলেন। তন্ময় আপত্তি করেনি। বলেছে যাবে। তবে তাহলে ওনাকেও যে আসতে হবে মেয়েকে নিতে সেটাও মনে করিয়ে দিলো। সেটা নিয়ে বলাতে আহমেদ চাচাও বললেন একটা অনুষ্ঠান উনি করবেন শীগগির, মেয়ের বিয়ে বলে কথা। তিতির আরও একটু সুস্থ হয়ে নিক, সময়টা চাইলো তন্ময়। আসলে চাইছেনা তিতিরের মানসিক চাপ বাড়াতে, মানুষের কথায় ওকে আর হেনস্থা হতে দিতে চায়না। এই ব্যাপারে তন্ময় বেশ টনটনে। তিতির আর মুনিয়ার ব্যাপারে এখন থেকে তন্ময় অনেক সাবধানে থাকবে, যেন কোনরকম কষ্ট কেউই না পায়।

বাইরে যাবার ব্যাপারটা নিয়ে কাউকে বেশী কথা বলতে দিলো না ঠিকই। কিন্ত আহমেদ চাচার কাছে কাজের ব্যাপার নিয়ে মালয়েশিয়ার কাজের কথা কিন্ত ঠিকই আলোচনা করলো। উনিও অবাকই হলেন। মনে মনে খুশীও হলেন যে, ভিল সিদ্ধান্ত উনি নেননি। ঠিক মানুষের কাছেই কোম্পানীর হাত বদল হয়েছে। যদিও উনি জানতেন আগেই, তন্ময় পারবে সামনে এগিয়ে নিতে। বাকিদেরকে উনি শুধু দিলেন, ওনার দায়িত্ব থেকে, যেন তন্ময়ের পাশে থাকে সবসময়, সবাই-ই।

মালয়েশিয়ার কাজের ব্যাপারে বেশ অনেকদিন ধরেই তন্ময় ইমেইল চালাচ্ছে, ওখান থেকে অনেককিছু আনে যেহেতু, তাই ওখানে কাজের জন্যও ওখানকার পার্টনারদের সাথে কথা বলেছে। এতটা সিরিয়াস যে তন্ময়, সেটা উনি ভাবেননি আগে। আজকে বুঝলেন আবারও, তন্ময় কথা বলে কম, কাজ করে চুপচাপ। বাংলাদেশে ফিরে আসার আগে একসময় আহমেদ সাহেব নিজেও ভেবেছিলেন, মালয়েশিয়ায় সেটেল করতে যাবেন। পরে আর যাওয়া হয়নি। দেশেই ফিরে এসেছিলেন। আজকে ওনার পরিচিত মানুষদের কথা ভাবলেন, তন্ময়ের কাজে সাহায্য করতে পারে, কারা আছে সেই ব্যাপার মাথায় রেখে। তাড়াতাড়ি খোঁজ খবর করতে হবে। যেন ছেলেটার একটু কাজে লাগে।

তন্ময়ও এদিকে তিতির আর মুনিয়াকে নিয়ে একটু বের হতে চাইলো। সুনন্দা, সুপ্রীতিও বেরিয়েছে, কিছু কেনাকাটা করবে বলে। অভি রাতুল তো নাশতা সেরেই বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে গিয়েছে। দুপুরে খেতে আসবে না বলে গিয়েছে দুই জামাই। বোনদদের বলেছে, খেতে একসাথে। শনিবারে সবাই-ই খুব আড্ডার মুডে থাকে। এখন তন্ময় আর তিতিরও মুনিয়ার পাশে। পুতুলটা ঘুমাচ্ছে। তাই ওরা ঘরেই বসে কথা বলছিলো। নানা বিষয় নিয়ে হাল্কা আলাপ, কোন সিরিয়াস আলোচনা না। বের হবার কথা বলাতে, তিতির একটু লজ্জা পাচ্ছিলো, বলছিলো না, রাতের পরে একটু অন্যরকম লাগছে নিজের, সেজন্য। কোমরে হাল্কা ব্যাথাও লাগছে , বলে লজ্জা বাড়াতে চাইছিলো না। তন্ময় ব্যাপারটা বুঝতে পারেনি। তাই আরেকটু অনুরোধ করলো, বের হতে। দুপুরে বাইরে দুই বোনকে নিয়ে তিতিরকে দিয়ে খাইয়ে দিতে চাইছে। তিতির অবাক হয়ে বললো, ওর তো টাকা নেই এত। তন্ময় অবাক হলো। বললো, এই ব্যাপারে আর কখনও যেন আর না ভাবে। রোববারে দু’জন ব্যাংকে গিয়ে অ্যাকাউন্ট করে দেবে যেন কখনও এইসব ভয় আর না থাকে। সাথে পাসপোর্ট করিয়ে নেবে।

শেষ পর্যন্ত বের হলো দু’জন। তিতির আর মুনিয়াকে সাথে নিয়ে তন্ময়। তিতিরের কথাতেই বের হলো। কারণ তিতিরও বুঝতে পারছিলো, সুনন্দা আর সুপ্রীতির সাথে সখ্যতা বাড়াতে হলে আজকেই একটু কাছে টানা ভাল। তাই বাসা থেকে খুব দুরে যেতে চাইলো না কেউই। ফোনে দুবোনকেই আসতে বলে দিলো তিতির, রেস্টুরেন্টের নাম ওদেরকে বলতে বললো। ভাবীর কাছে ওরা প্রথম ট্রিট পাবে, তাই রুফটপ এই যেতে চাইলো। তিতির আপত্তি করেনি। ওর সামান্য সঞ্চয় কিছু আছে, সে-ই টাকা থেকে বিল দিতে চাইলে, তন্ময় বললো, অসুবিধা নেই। দিতে পারে। শুধু বের হবার সময়, আস্তে করে একটা খামে করে কিছু টাকা তন্ময় তিতিরের কাছে দিলো, ব্যাগে রেখে দিতে। তিতির একটু ঘাবড়ে গেলেও, রাখলো খামটা, যত্ন করেই। একবারও জিজ্ঞেস করেনি, কত আছে, তন্ময়ও বলেনি কত দিয়েছে।

মুনিয়াকে খাইয়ে নিয়ে বের হয়েছে, তাই খুব খুশী। খুব শান্তিতে বেড়াতে বের হয়েই একটু পরেই অবশ্য ওর অল্প অল্প ঢুলুনি এসেছিলো। বাইরে দেখছিলো খুব অবাক হয়ে, গাড়ীতে মায়ের কোলে বসে। তিতিরের কোলে। পাশে তন্ময় ড্রাইভ করছে। ভীষণ সাবধানে। গাড়ী পার্কিং-এ রেখে, তন্ময় মুনিয়াকে কোলে তুলে নিয়েছিলো। বাবার কাঁধে মাথা হেলিয়ে একটু পরেই মুনিয়া ঘুমিয়ে পড়তে পারে ভেবে, ওর বাগীটাকেও সাথেই নিয়ে নিলো। তিতিরকে ঠেলে নিতে দেখে, রেস্টুরেন্টের ভেতর থেকে একজন এগিয়ে আসলো সাহায্য করতে। ভেতরে যেতেই ম্যানেজার নিজেই এসে নিয়ে গেলো ওদেরকে। তন্ময় বলেও দিলো সুনন্দা আর সুপ্রীতির কথা, আসবে ওরাও। একটু নিরিবিলি দেখে এক পাশে ওদের বসার ব্যবস্থা করে’ দিলো। মুনিয়া ঘুমিয়ে গেছে দেখে আস্তে আস্তে খুব সাবধানে তন্ময় ওকে বাগীতে শুইয়ে দিলো। পরম নিশ্চিন্ত ঘুমে আছে মুনিয়া। অল্প সময়ের মধ্যেই দুই বোন এসে পড়লো। ভাবীর সাথে ওদের সখ্যতা গভীর হতে খুব সময় লাগলো না, লাগার কথাও না। ভাইবোন সবাই-ই একই রকম মিশুক। ভাবীর জন্য আনা গিফট দিলো ভাবীকে। তিতির অবাক হয়ে গেলেও লজ্জা পেলো বেশী। সাথে ওদের জন্য কিছু না নিয়ে খালি হাতে আসায় ভীষণ অস্বস্তি লাগতে লাগলো। তন্ময়ের দিকে তাকাতে ও একটু হাল্কা করে ইশারা করে বোঝালো যে পরেও দিতে পারবে। তাড়াহুড়ো করতে হবে না। একসাথে লাঞ্চ করে সবাইকে নিয়ে ফিরে এলো তন্ময়। ঘরের ফিরে তন্ময়কে আস্তে করে জিজ্ঞেস করলো, কখন ও একবার যাথে যেতে পারবে সুনন্দা আর সুপ্রীতির জন্য কিছু কিনতে। তন্ময় বললো যাবে নিয়ে। আপাতত চিন্তা না করতে। ওরা রাগ করবেনা। তবুও তিতিরের অস্থির আর লজ্জা লাগছিলো। অগত্যা মুনিয়া ঘুমাচ্ছে বলে, তাড়াতাড়ি করে তন্ময় আর তিতির আরেকবার বের হলো। তিতিরের ইচ্ছে মতো, তন্ময় গয়না কিনে দিতে রাজি হলো। বললোও যে, দুই বোনকে একই রকম দুটো সেট দেবে। তন্ময় গাড়ী সিগন্যালে থামিয়ে তাকিয়ে রইলো। পকেট খালি করার ইচ্ছা বাদ দেয়া যায় কিনা বলাতে তিতির শুধু বললো, অন্তত ওর কাছে থেকে পাওয়া প্রথম গিফটটা যেন তন্ময় একটু মেনে নেয়। পরে তন্ময়ের কথামতো দেবে। আজকে একটু ভাল করে দিতে স্বাধীনতা চাইলো তিতির। বলার অবস্থা দেখে তন্ময়ও না করতে পারলো না। শুধু একটা ছোট শর্ত জুড়ে দিলো, সেট দুইটা না, তিনটা হতে হবে, তাও একই। বাকিটা যদি দোকানে পাওয়া যায় তাহলেই হলো।

কথামতো তিন সেটই নেয়া হলো। সাথে তিনটা একই রকম শাড়ী। এখনকার শাড়ীগুলোতে একটা সুবিধা আছে, রেডিমেড ব্লাউজ থাকেই, ফ্রি সাইজ এর, হাল্কা করে সেলাই দিয়ে সাইজবঠিক্নকরে নেয়া যায়। অনেকটাই কোলকাতায় পাওয়া দামী শাড়ীর দোকানের মতো। সবকিছু নিয়ে বাড়ী পৌঁছে দেখে সুনন্দা আর সুপ্রীতি চলে এসেছে। ভাবীকে সাজাতে চাইলো দু’জন। তখনই তিতিরও আস্তে করে দুই ননদকে কাছে বসিয়ে, ওদের জন্য কেনা গিফট সব দিলো। একই রকম জিনিস ভাবীও নিয়েছে দেখে ভীষণ খুশীও হলো ওরা দুইবোনই। এই খুশী দেখে জীবনের একটা দিন খুব বেঁচে থাকার শখ হলো তিতিরের। অনেক আপন কিছু মানুষ যেন এখন আশেপাশে আগলে রেখেছে তিতিরকে। এক প্রশান্তির বাতাস যেন ছুঁয়ে গেলো তিতিরের চারপাশে।

রাতে বাসায় সবাই আসবে, সেজন্য তন্ময় রাণীর কাছে বললো ঘর ঠিক করে রাখতে। খানার অর্ডার আগেই দিয়ে দিয়েছে। নিয়ে আসবে সন্ধ্যা বেলায়। ঘরে এসে ননদদের আর ভাবীকে এভাবে একসাথে খুশী দেখে ভীষণ ভালো লাগলো তন্ময়েরও। ভাইকে দেখে খানিকটা লজ্জা পেলেও, ছুটে কাছে যেতে দেরী করলো না কেউই। যতকিছুই হোক এখনো দুইবোনের আশ্রয় ভাইয়ের কাছে অসামান্য। যেন একটা বিশাল ছায়া। তিতিরও সুন্দর করে বললো, এখন থেকে যেন সেই ছায়া দেয়ার জন্য সুযোগ তিতিরকেও দেয় দুই বোন। আলাদা করে যেন পর না ভাবে। তিতিরের কেউই নেই, এক মুনিয়া আর তন্ময় ছাড়া। এই কথাতেই সুনন্দা আর সুপ্রীতির ভালো লাগা বেড়ে গেলো। বলেই দিলো, ভাবীই এখন সবকিছু আগে জানতে পারবে। ভাবীর কাছ থেকে ভাইয়ের কানে সব কথা পৌঁছে যাবে। তিতির একের পর এক এমন কথায়, মায়ায় চোখে আজকে বারবার খুব ঝাপসা দেখছে। মুনিয়া, তন্ময় এর সাথে সুনন্দা আর সুপ্রীতির আপন করে নেয়াতে নিজেকে অনেক ভাগ্যবতী ভাবতে লাগলো। সবকিছু জেনেও যেই মানুষগুলো এমন ভাবে আপন করে নিতে পারে, তিতিরকেও তাদেরকে আপন করেই ভাবতে হবে এখন থেকে, অন্তত না ভাবার কোন কারণ তিতির খুঁজে পাবে না। সেটা নিশ্চিত।

সবাই মিলে রাতে খাওয়ার পরে যখন তন্ময়, তিতির আর মুনিয়াকে নিয়ে চাচার বাড়ীতে যাবে, তখনই তিতিরও ওর কাছে থাকা চাবিটা সুনন্দা আর সুপ্রীতির হাতে এক করে দিয়ে রেখে গেলো। বললো, আসলে পরে তখন যেন দেয়। আসার আগ পর্যন্ত দুইবোনই যেন এখানেই থেকে সব করে। কারণ এটা ওদেরও বাড়ী। এতক্ষণ তিতির যেমন একের পর এক দেখে অবাক হয়েছিলো, ঠিক তেমনই এখনো তন্ময় আর সবাই-ই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। গাড়ীতে উঠে তন্ময় জিজ্ঞাসু চোখে তাকাতেই তিতিরও বললো, মা থাকলে কি আমি চাবি নিয়ে যেতাম, মা’য়ের কাছে রেখেই তো যেতাম, মা নেই, তাই বোনরা দেখবে! আর বিশ্বাস যদি বোনদেরকেই না করে তিতির, কাকে করবে? রানীকে? তা তো না, তাহলে??? তন্ময়ের অবাক হওয়ার পালা থামেনা। সবাই কেমন যেন একই রকম মানসিকতার। একটা সংসারে এমন হলে সবকিছুই ভাল হতে বাধ্য।

মা হয়তো বেঁচে নেই, কিন্ত এখন তিতিরকে পেলে কি ভাবতেন, সেটা একটু কল্পনা করার চেষ্টা করলো তন্ময়। কেন যেন মা কখনও তিতিরকে মেনেই নিতে চাননি। কোন কারণ কখনও বলেনওনি, কিন্ত তবুও তিনি সবসময়ই তিতিরের ভীষণ বিপক্ষে ছিলেন।

ছোট মুনিয়া ঘুমিয়ে গিয়েছিলো বলে, তিতিরের মা, কাছে নিতে চাইছিলেন। তিতির বা তন্ময়, কেউই রাজী হলো না। তাই কটে করে তিতিরের ঘরেই ঘুমাতে দিলো। সারাদিনের ধকলের পরে শেষ পর্যন্ত দু’জন একসাথে হওয়াতে, তিতির একটু জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে করুণ চেহারা করতেই, তন্ময় বুঝে গেলো, কি বলতে চাইছে তিতির। কিছু না বলে আস্তে করে কপালে আদর করে ঘুমাতে বললো তিতিরকে। আজকে আর আদরের জোর করলো না। যদিও আদর, দুজনেই খুব পেতে চাইছিলো। সারাদিন পরে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই এখন আবার কোমরে ব্যাথাটা হাল্কা করে টের পেলো। বললো না কিছুই, তন্ময়কে, জানে বললে অস্থি হবে। এই কয়েক ঘন্টায় মানুষটাকে ভালো করেই বুঝে গেছে তিতির। কোন কথায়, কাকে, কিভাবে কত সহজে মনে করে সব কিছু থেকে আগলে রাখতে পারে।

শুধুই একটু কাছে ছুঁয়ে থাকার চেষ্টা করতে, তন্ময় ওকে বুকেই টেনে নিলো। কেমন একটা প্রশান্তি যেন ছুঁয়ে গেলো সবদিক থেকেই। সারাদিনের ঘটনা একটা একটা করে সাজিয়ে চিন্তা করতে করতেই তিতির আল্লাহর কাছে শোকরানা জানালো। এমনভাবে সবকিছুই হাতে এনে সুখী করে দিলো বলে। এই সুখ যেন কপালে থাকে তিতিরের, সেই দোয়াই করলোও নিজের জন্য।

এক সপ্তাহ আগেও তিতির যখন চিন্তা করছিলো, মেয়েকে রেখে কিভাবে স্কুলের চাকরী করবে, কিভাবে সামাল দেবে মুনিয়াকে সারাদিন। এক দুইজনের সাথে কথাও বলবে চিন্তা করছিলো, ও যেখানে থাকে সেখানে আশেপাশের মানুষের কাছে। আবার ভয়ও পাচ্ছিলো যদি কিছু হয়ে যায়। সবকিছু মিলিয়ে ভীষণ রকম নার্ভাস ছিলো। তারপর হুট করেই কিভাবে যেন তন্ময়ের আবির্ভাব, তার চেয়েও বেশী হুটহাট করে বিয়ে হলো তন্ময়ের সাথে। কত কিছুই যে চিন্তা করেছিলো সেইসময়। সব চিন্তাই এখন যেন রাতের আঁধারের পরের ভোরের আলোর মতো আলোকিত হয়ে গেলো।

কষ্টের জীবনে তিতিরের একমাত্র সাথী ছিলো মুনিয়া। আজকে সেই মুনিয়ার মুখে হাসি দেখে, আর তন্ময়ের বুকে ঘুমিয়ে পড়তে দেখে, তিতির ভীষণ রকম অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। মুনিয়া এমনিতেই মানুষের ব্যাপারে খুবই সেন্সিটিভ, সহজে কাউকে পছন্দ করেনা, কিন্ত করলে ভীষণ ভালো করেই করে। তন্ময়, সুনন্দা আর সুপ্রীতির পরে, আহমেদ সাহেবের সাথেও সখ্যতাটা বেশ গভীর মুনিয়ার। নানা বলে কথা। নানাও সেটা খুব উপভোগ করেন। সকালেই উঠে উনি মুনিয়াকে নিজের কোলে করে নিজের কাছেই নিয়ে এসেছেন। আজকে তো চলেই যাবে। তাই যতটা সময় পাওয়া যায় আদর করে দিতে চান। তিতির তন্ময় কে ঘুমাতে বলে উনি মুনিয়াকে ঘুমের চোখেই কোলে করে এনে নিজের খাটে নিয়ে খেলা দিতে থাকলেন। মুনিয়া অবশ্য ঘুম পুরো হবার পরে ভাঙেনি বলে, বারবার ঢুলে পড়ছিলো। তাই দেখে আহমেদ সাহেবও আবার শিমুলকে দিয়ে দুধ খাইয়ে ঘুমিয়ে যেতে দিলেন। নিজে পাশেই বসে রইলেন, মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে। নানার আদরে মুনিয়াও খুব তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে গেলো, একটা ছোট পুতুল হাতে বন্দী করে। গত কয়েকটা দিনে আহমেদ সাহেবও লক্ষ্য করে দেখেছেন। তাইনখেয়াল রাখেন এই ছোট পুতুলটা যেন মুনিয়ার কাছে কাছেই থাকে সবসময়।

মুনিয়াকে নিয়ে যাবার পরে, তিতির নিজেই এসে একটু আদর করলো তন্ময়কে। অনেকটা যেন আগুনে ঘি পড়লো, তন্ময় নিজেও সাথে সাথেই তিতিরকে আপন করে নিতে লাগলো। দুজনেই যেন লাগামহীন এক অদম্য ভালবাসার উন্মত্ততা উপভোগ করতে লাগলো। অনেকদিনের অনাস্বাদিত প্রেমের জোয়ারে তিতির যেমন নিজেকে ভাসিয়ে দিচ্ছে, ঠিক তেমনই তন্ময়ও তিতিরকে আকণ্ঠ ভালবাসার আবাহনে অবগাহিত করতে থাকলো। তিতিরের খড়কুটো ধরে বেঁচে থাকার মাঝে যে মানুষটা,আশ্রয় দিয়ে, সম্মান দিয়ে, মর্যাদা দিয়ে ঘরে স্ত্রী করে এনেছেন, তাকে তিতিরও আজীবন ভালবাসতেই উদগ্রীব। নিরাভরণ দুই শরীরের ছন্দময় ভালবাসার উত্তাপ সবকিছু পুড়িয়ে যেন খাঁটি করে তুলছিলো। তিতিরও আবেগে আপ্লুত হয়ে শক্ত করে খামচে ধরে থাকছিলো তন্ময় কে। তন্ময়ের কোলে বসে আদর পেতে পেতে, তন্ময়ের সারা পিঠে তিতিরের নোখের আঁচড় গভীর ভালবাসার চিহ্ন এঁকে দিচ্ছিলো। তন্ময় এঁকে দিয়েছে ওর ভালবাসার চিহ্ন তিতিরের গভীর গোপনে, তিতির নিজেও খুব যত্নের সাথে হাত বুলিয়ে ভালবাসার সেই চিহ্নকে আগলে রাখলো। আরও কিছুক্ষণ দুজন ভালবাসার গভীর চুমুতে আচ্ছন্ন রইলো। এই গভীর চুমু যেন অনেক প্রতীক্ষিত ভালবাসার এক প্রকাশ। গভীর গোপন অভিসারে লিপ্ত দুজন ভালবাসার মানুষের যেন আবেগের এক অফুরান যাত্রা।

তৌফিকুল করিম সুহৃদ

লেখক:
Director
Fingertips Innovations Ltd.