কুয়ালালামপুর ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে নেমে তিতির অবাকই হলো ভীষণ। জীবনের প্রথম বিদেশে আসা, এতো দায়িত্ব নিয়ে, এতো বড় একটা দেশে। সাথে সবাই-ই আছে, কিন্ত যে পাশে থাকা সবচেয়ে জরুরী, সে-ই মানুষটাই নেই পাশে। সিনেমাতে দেখেছে সবসময় বিদেশের এয়ারপোর্ট সুন্দর, সেখানে রিসিভ করতে বোর্ডে নাম লিখে দাঁড়িয়ে থাকে, আজকে ওদের জন্য কেউই দাঁড়ায়নি ঠিকই কিন্ত ইমিগ্রেশন কাউন্টারে পাসপোর্ট দিতে দাঁড়াতেই দুই তিনটা প্রশ্ন করে কনফার্ম করেই মুহুর্তের মধ্যে আরও কয়েকজন এসে ওদেরকে স্পেশাল গেস্ট হিসেবে রিসিভ করে একটা আলাদা ঘরে নিয়ে গিয়ে সব ফর্মালিটি পুরো করে দিলো। অপেক্ষায় থাকার সময়েই তিতিরের মনে হলো ফোন অন করতে। অন করতেই ইমেইল অ্যালার্ট, খুলে দেখেই আস্তে করে চাচাকে জানালো। উনি শুনে বললেন, তন্ময় নিজের ছেলের চেয়েও বেশী ভাবে, ওঁর জন্য, ওদের সবার জন্য। মুহুর্তে সবকিছু ব্যবস্থা করে রেখেছে। গুনে গুনে, পাক্কা পঁচিশ মিনিটে সব কাজ শেষ করে সবাইকে নিয়ে ওদের জন্য রাখা গাড়ীর দিকে নিয়ে গেলো। এর মাঝেই মুনিয়ার জন্য আবার একটু খেলনা নিয়ে আসলো। প্লেনেও ওকে খেলনা দিয়েছিলো। এখন আবারও পেলো, মহাখুশী সে। সুনন্দা আর সুপ্রীতিও তিতিরের মতো ভীষণ অবাক হয়েছে। যদিও ওরা এর আগে মালয়েশিয়া এসেছিলো হানিমুন করতে। সবকিছু দেখে তিতিরও এখন একটু ভয় কমলো। আগে ঘাবড়ে গিয়েছিলো, এখন সাহস পেয়েছে ভিআইপি ট্রিটমেন্ট পেয়ে।

এয়ারপোর্ট থেকে বের হতেই দেখে দুইটা নতুন মার্সিডিজ বেঞ্জ এর কালো মাইক্রোবাস অপেক্ষা করছে ওদের জন্য৷ তিতির, সুনন্দা আর সুপ্রীতি একসাথে এক গাড়ীতে আর আহমেদ চাচা নাতিন নিয়ে, মালয়েশিয়া এয়ারপোর্টে আসা প্রটোকল এর সেই লোক আর রানীকে নিয়ে উঠলেন। ওদের স্যুটকেস, জিনিসপত্র অন্য আরেকটা ভ্যানে করে নিয়ে নিলো তুলে। গাড়ীতে বসে ননদ ভাবী যেন অনেক আরাম পেলো, শুরু হলো আড্ডা। আগের বার এসে ওরা কে কোথায় ছিলো, কি কি করেছিলো সে-ই সময়, এইসব গল্প করতে করতেই রাস্তা পার হয়ে যাচ্ছিলো। আনন্দ উচ্ছলতার মাঝেও তিনজনেরই কিছুটা বিষাদে ভরা মন। কারণ কারো সাথেই তাদের স্বামীরা নেই। একটা দিন শুধু রেস্ট নিতে পারবে হয়তো, কারণ একদিন পরেই ওদের ট্রেনিং শুরু হবে। শেষ বিকেলের আলোয় আশেপাশে দেখতে দেখতে চলেছে ওরা পথে। তিতিরের কারো সাথে কোথাও যাওয়া হয়নি, বেড়াতে অন্তত কখনও কোন জায়গায়, বিদেশ তো অনেক দুর, তাই ভীষণ অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছিলো একটু পরপরই। খুব বেশী সুনন্দা আর সুপ্রীতির সাথে আড্ডায় মিশতে পারছিলো না। ওরা আগে এসেছিলো। আর তিতিরের প্রথম। তাই খুব মনখারাপ আর অন্যমনস্ক থাকছিলো। বারবারই তন্ময়কে মিস করছিলো। আজকে বুঝতে পারছে তিতির, তন্ময় কতখানি আছে ওর মন জুড়ে। এই কয়েক সপ্তাহের মাঝেই সবকিছু পাল্টে দিয়েছে তিতিরের অন্ধকার জীবনের।

অল্পসময়ে ওরা এসে পৌঁছে গেলো ওদের থাকার জন্য বাড়ীতে। কয়েকজন লোক অপেক্ষায় ছিলো। গাড়ী ঢুকতে দেখেই সবাই-ই মেন এন্ট্রেন্সে এসে দাঁড়ালো। আহমেদ চাচার গাড়ীর পেছনে তিতিরদের গাড়ীর পেছনেই মালপত্র নিয়ে ভ্যানও এসে বাড়ীর আরেকটা পাশ দিয়ে নেমে গেলো বেসমেন্টে। প্রটোকল অফিসার করিম দানিশ আলাপ করিয়ে দিলো ওদের সাথে। যদিও এইসব ব্যবস্থা তন্ময়ের বিজনেস পার্টনারের করে রাখা, তাই তিতির কিছুটা জানে। বিজনেস পার্টনারের জন্য এদিক ওদিক তাকিয়ে খোজ করতেই জানতে পারলো উনি আসবেন পরে, ওরা সবাই নেমে আসলো গাড়ী থেকে।

বিশাল বাড়ীটা যেন একটা ছবির মতো। পাহাড়ের ঢালে একটু উঁচুতে। আর সামনের ঢালে উল্টো দিকে দুরে দেখলো লা মেরিডিয়ানের রিসোর্ট হোটেল। আরও খানিক দুরে, পুত্রাজায়া। ঘরগুলো ঘুরে দেখছিলো, তিতির, সুনন্দা আর সুপ্রীতি। বাসায় ঢোকার সাথে সাথেই কমলালেবুর রস দিলো সবার জন্য, এমনকি একটা ছোট কার্টুনের একটা গ্লাসে মুনিয়ার জন্যও। রানীর কাছ থেকে এখানের সাপোর্ট স্টাফ মারিয়াম। মুনিয়াকে সোফায় বসিয়ে সুন্দর করে হাত ওয়াইপ্স দিয়ে মুছিয়ে তারপর ওকে ধরতে দেয়ার ভান করে সিপার দিয়ে খাওয়াচ্ছিলো। খুব মায়া লাগছিলো তিতিরের। ওরা ঘুরে দেখছিলো আর হাউস গভর্নেস ইন চার্জ, ভিজয়া, জানাচ্ছিলো কোন ঘর কার জন্য গুছিয়ে রেখেছে। আসলে তিতির জানে এগুলো সবই তন্ময় আগে থেকে ঠিক করে দিয়েছে বাড়ীর প্ল্যানিং দেখে, তিতিরকে জানিয়ে ছবিও দেখিয়ে দিয়েছিলো। সবগুলো ঘরের মজা হলো, সব ঘরের সাথেই লাগোয়া বারান্দা, যথেষ্ট প্রাইভেসি আর অ্যাটাচড ওয়াশরুম।

বাড়ীর বাইরে থেকে একেবারেই বোঝা যাবেনা বাড়ীতে কারা আছে, কিভাবে আছে, অনেক খোলামেলা জায়গা নিয়ে যেন একটা বিশাল টাইপ মিনি বাংলো বাড়ী টাইপ। পুরো রাজসিক ব্যাপার। একটা ঘরে ছোট কট দেখেই বুঝেছে তিতির, যে এই ঘরেই মুনিয়াকে নিয়ে তিতির থাকবে, আপাতত। কটের পাশে অনেক পুতুল দিয়ে সাজানো, মুনিয়ার শখের মিকি-মিনি, গুফি, প্লুটো, ডোনাল্ড, ডেইজি থেকে, ডিজনী প্রিন্সেস আনা, সিন্ডেরেলা, টিগার, পু, আরও কয়েকটা টেডি৷ এখনো ঘরে আসেনি মুনিয়া আসলে দেখে অস্থির হয়ে যাবে। কট দেখে হাসি পেলো, মুনিয়া ঘুমায় তন্ময়ের বুকের সাথে লেগে। কট কোন কাজে আসবে বলে মনে হয় না। যার জন্য মুনিয়া কাছে থাকলে তিতিরকে আদর করতে পারেনা তন্ময়। ঘুম ভেঙে খেলতে চলে গেলে তখন আদর করে। অথবা খেলতে খেলতে কটে ঘুমালে তখন করে। অনেকটাই অধীর হয়ে তিতিরও এখন অপেক্ষা করে তন্ময়ের আদরের। সে-ই আদরে ভালবাসার সাথে থাকে গভীর মায়া, গভীর আবেগ, সবচেয়ে বেশী থাকে আকুলতা, আর যত্ন। কখনও এমনভাবে ভালবাসা পাবে ভাবেনি তিতির। এখন পেয়ে আর হারাতে নারাজ।

জীবন যেন হঠাৎ করেই ওকে সবকিছু দিচ্ছে, খুব তাড়াতাড়ি পেয়ে খুব ভয়ও পাচ্ছে। যদি কোন অঘটন ঘটে আবারও। বারান্দা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে কিসব আজেবাজে ভাবছে। ফোনে রিং বাজতেই সম্বিৎ ফিরলো, তন্ময়। ধরে গিয়েই দেখে ভিডিও কল। ধরেই আবেগে চোখে পানি এসে গেলো তিতিরের। বারান্দায় দাঁড়িয়ে কথা বলতে লাগলো আর বারবার শুধু একটা কথাই বলছিলো তন্ময়কে, মিস ইউ, ভীষণ রকম মিস করছি। তন্ময়ের কথায় হাল্কা করে হুঁ হাঁ করে যাচ্ছিলো। তন্ময় বুঝতে পারছিল, তিতির কতটা ইমোশনাল আর আনমনা হয়ে আছে। এর মাঝেই মুনিয়াকে কোলে করে নিয়ে আসলো রানী আর ভিজয়া সাথে মারিয়াম। কথা বলছে বুঝতে পেরেই, ভিজয়া আর মারিয়াম ঘর থেকে বের হয়ে গেলো, আর রানী মুনিয়াকে নিয়ে আসলো কাছে। মুনিয়া বাব বাব করে একটু দেখেই কটের দিকে চোখ পড়তেই সেদিকে যেতে অস্থির হয়ে গেলো। তিতির যেতে দিলো। তন্ময় মজা পাচ্ছিলো দেখতে। খুবই খুশী হয়ে বলছিলো, আমার মেয়ের পছন্দ হয়ে গেছে ওর সব খেলনা, কথাটা তিতিরের ভীষণ প্রিয়, তন্ময়ের “আমার মেয়ে”। আর কোন চিন্তা নেই। রানীও খেয়াল রাখছিলো সবকিছু। জানালো তন্ময় খুব শীগগির দেখা হবে, অস্থির যেন না হয়। আপাতত ওরা সবাই-ই রেস্ট নিক। একবার চাচাকেও কল দেবে এখনই। ওর পার্টনারের সাথে কথা হয়েছে, এখনই আসতে মানা করেছে, বয়স্ক মানুষ, সেজন্য। কাল সকালে হয়তো নাশতা করার সময় আসতে পারে। একটা মিটিংয়ে যাবে, তাই পরে কল দিতে না পারলে যেন তিতির ঘাবড়ে না যায়। যদিও রাতে দেবেই গুডনাইট বলতে। তিতিরও বাইরে তাকিয়ে লালচে গোধূলির রাঙা আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। মালয়েশিয়ার আকাশ যেন অন্যরকম। আশেপাশে কোন সাড়াশব্দ নেই। অথচ লোকালয় বলেই মনে হচ্ছে যদিও। গাড়ীর হর্ণ ন্মবা আওয়াজও তেমন কানে আসছে না, আসার পথে শুনেছে কিনা মনে করতে পারছেনা।

তিতিরের সাথে কথা শেষ করেই চাচার সাথে কথা বলতে কল দিলো তন্ময়। সবকিছু পছন্দ হয়েছে কিনা জেনে, চাচা খুশী হয়েছেন বুঝে, আর কথা বলে খুব আশ্বস্ত হলো। জানালো খুব তাড়াতাড়ি সব কাগজ গুছিয়ে নিয়েছে। এখন চলে আসতে পারবে কারণ অফিসিয়াল সাইনিং সেরেমনি করতে হবে কুয়ালালামপুর এসে। তন্ময় চাইছে বাংলাদেশের একজন মন্ত্রী অন্তত যেন সেসময় থাকে। যদিও বলছে না এত বড় একটা কাজ বাংলাদেশী কোম্পানী করতে সুযোগ পেয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত খুবই খুশী হয়েছেন। বললো না যে উনিও আসতে সময় বের করতে চেষ্টা করছেন। সেটা হলে তন্ময় সবাইকেই চমকে দিতে পারবে। আপাতত তাই নিয়ে কিছু বললো না। ফোন রেখে, নিজের সব কিছু গোছানো শেষ করেই দেখলো কিছু বাদ পড়লো কিনা! সকালের ফোন কলের কথা কাউকে জানায়নি তন্ময়, শুধু সেখানে না জানালে না সেখানেই জানিয়েছে। সামাল দিয়েছে সব ঠান্ডা মাথায়, সময় চেয়েছে কথা বলার জন্য দুই দিন। আর সেই সময়টাই এখন কাজে লাগাচ্ছে খুব তাড়াতাড়ি করে।

শিমুলকে বললো বের হবে এখনই। বাচ্চা মেয়ে শাড়ী পড়ে বড় হয়ে গেছে। রানীর মা’য়ের কাছে রেখে যাবে আপাতত। পরে বাকি ব্যবস্থা করবে। আপাতত তাড়াতাড়ি এয়ারপোর্টে পৌঁছতে হবে। প্রাইওরিটি দিয়ে ফ্লাইট পেয়েছে, সিংগাপুর হয়ে কুয়ালালামপুর, সকাল সাতটা নাগাদ পৌঁছে যাবে ওদের কাছে। আশা করছে কেউই তখন উঠবে না ঘুম থেকে, শনিবার, ছুটির দিন। সবাইকে চমকে দেবে নাশতার টেবিলে। আজকে টায়ার্ড বলে সবারই ঘুম যেন বেশী হয়। চিন্তা করতে করতেই দরজায় ডাবল লক করে, সিকিউরিটি অপশন অন করে লিফটে নীচে নামতে লাগলো। নামার সময় সব সুইচ অফ করে শুধু ফ্রিজের সুইচ চালিয়ে রেখে গেলো। নিজে সব খেয়াল করে তারপর নেমে এসে গাড়ীতে বসলো। শুধু একবার একটু অন্ধকার বা চুপচাপ থেকে একটা অডিও কল দিয়ে তিতিরকে গুডনাইট বলে দেবে, নাহলে চিন্তা করবে। শিমুলকে চাচা’র বাসায় নামিয়ে দিয়ে এয়ারপোর্টে যেতে রওনা হলো।

এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশন কাউন্টারে, সিকিউরিটিতে বেশী সময় লাগলো না। প্লেনে উঠে সিটে বসতেই টের পেলো গেট বন্ধ করেছে, তন্ময় ই শেষ প্যাসেঞ্জার ছিলো বোর্ডিং করার। প্লেনে উঠেই, দেখা হলো স্কুলের বন্ধু মুরাদের সাথে। ও বউ নিয়ে যাচ্ছে সিংগাপুরে, চেকআপ করতে। একই ফ্লাইটে। যদিও তন্ময় হাল্কা ভাবে কথা অল্পতেই সেরে নিলো, ওদেরকে প্রাইভেসি দিতে, বেশী প্রশ্ন করতে গেলো না। মুরাদের শরীর ভাল না জানে তন্ময়, তাই বেশী জানতে চাইলো না। শেষ মুহূর্তে, হুট করে রওনা হচ্ছে বলে, ফ্লাইটে বসে সিটবেল্ট লাগাতে লাগাতেই প্লেনের নড়াচড়া টের পেলো। এত তাড়াতাড়ি দেশ ছাড়বে চিন্তা করেনি।

একটা ফোন পেয়েই সকালে হুট করেই সব প্ল্যান পাল্টাতে অনেকটা নিজের জীবন বাঁচাতেও এভাবে পালাচ্ছে। একটা উটকো কলে চাঁদা চেয়েই সব ওলোটপালোট করে দিয়েছে তন্ময়ের প্ল্যান। খবরটা মালয়েশিয়ার হাই কমিশনে কাজ করে এমন কোন ছেলের কাছ থেকেই বের হয়েছে। খোঁজ করতে সময় নষ্ট না করে, খোঁজ করতে কাজে লাগিয়ে দিয়ে নিজে সরে যাচ্ছে। যে ফোন করেছে ওকে, বলেছে শনিবার বিকেলে কল দিতে। তখন আর ও দেশে থাকবে না। মুহুর্তে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নাহলে যেই বিপদে ও পড়বে, তাতে অনেক ঝামেলা আর হেনস্থা হতে হবে, তার চেয়ে বেশী টাকা গচ্ছা যাবে। রাতুল আর অভি অবশ্য জানেনা। বলেনি, কারণ কাউকেই ও ঠিক বিশ্বাস করতে পারছেনা। আগে নামুক সিংগাপুর হয়ে কুয়ালালামপুর, তারপর বোঝা যাবে। পরেরটা পরে চিন্তা করবে। আপাতত নিজে সবাইকে নিয়ে এক জায়গায় হয়ে নিক। তিতিরকে কাছে পাবার অপেক্ষা, মুনিয়াকে বুকে নেবার অস্থিরতা, সুনন্দা আর সুপ্রীতির কোন বিপদ না হওয়া, সবকিছুর ওপর নির্ভর করে আছে ওর পৌঁছতে পারা ওদের কাছে।

সিংগাপুর এয়ারলাইনসের স্বভাবসুলভ অন টাইম অ্যারাইভাল হতেই কানেক্টিং ফ্লাইটে যেতে তন্ময়কে নিয়ে গেলো এয়ারহোস্টেস এসে। মুরাদকে শুধু একটা হাত নেড়ে ইশারা করে বলে দিলো চিন্তা না করতে, ভাল হতে তাড়াতাড়ি। প্লেন থামতেই দরজা খুলতেই তন্ময়ের জন্য প্রটোকল এসে ওকে নামিয়ে নিয়ে গেলো সিঁড়ি দিয়ে। গাড়ীতে চড়তেই জানতে চাইলো আর কোন লাগেজ ছিলো কিনা? শুধু স্যুট ক্যারিয়ার, ককপিট কেস আর একটা ল্যাপটপ কেস ছাড়া আর কিছুই নেয়নি তন্ময়। যতটা শুধু হাতে করে সাথে নিতে দেবে। ইকোনমি ক্লাস থেকে সিট না থাকায় বিজনেস ক্লাসে আপগ্রেড করে দেয়াতে আরামে সিংগাপুর পৌঁছে এখন আবার এক ঘন্টার একটা ছোট জার্নি। একই অবস্থা এখানেও। কানেক্টিং ফ্লাইট অপেক্ষায় ছিলো, উঠতেই দরজা বন্ধ করে দিলো। সিটে বসার সাথে সাথেই ট্যাক্সিং করে রানওয়েতে ছুটতে শুরু করলো প্লেন। দৌড়ে দৌড়ে এভাবে প্লেনে ওঠার অভ্যাস ওর হয়ে গেছে কাজের বদৌলতে। এতক্ষণে তন্ময় কিছুটা চিন্তা করার সময় পেলো। রাজনীতি থেকে সরে গিয়ে ভুল করেনি। ও যখন করতো, তখন রাজনীতিই করতো, এই চাঁদাবাজি করেনি। একেবারে করেনি তা বলবে না। করেছে, সেটা কোন ফাংশন করতে, নাটক করতে, বই বা ম্যাগাজিন বের করতে। কিন্ত কাউকে ব্যবসা করতে সুযোগ পেয়েছে বলে চাঁদাবাজি, কখনও না! হতাশ লাগছিলো এইসব ছেলেপুলেদের কথা ভেবে। রাজনীতিকে এরাই নষ্ট করে।

মাঝে এসএমএস করে গুডনাইট বলে দিয়েছিলো ফ্লাইট ঢাকাতে থাকতেই। কল ধরতে পারেনি তিতির। বুঝেছে তন্ময়, মুনিয়াকে নিয়ে জার্নি করে, হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। এখনো মেসেজ সিন হয়নি, যাক মিশন আপাতত সাকসেসফুল। আর এক ঘন্টা পরেই নেমে গেলে সব মজা দেখবে। ঢাকা থেকে ওড়া ফ্লাইটে ঘন্টা দুয়েক ঘুমিয়ে নিয়েছিলো ডিনার সেরেই। এখন তাই ফ্রেশ লাগছে। ফোনে একবার তিতিরের ছবির দিকে তাকিয়ে রইলো অনেকক্ষণ। একটা মায়াভরা চাহনি, লুকানো কষ্ট চেপে থাকা হাসি। তবে শেষ ওর বুকে থুতনী রেখে শুয়ে থাকা ছবিটায় একটা অব্যক্ত সুখের পরিতৃপ্তি যেন ফুটে আছে। এই ছবিটা তন্ময়ের ভীষণ প্রিয়। কাউকে দেখায়নি অবশ্য। দেখাবার মতো না-ও। দু’জনে ভালবাসার খেলা শেষে, হুট করেই তোলা। এলো চুল কপালে অগোছালো হয়ে এসে রয়েছে। পরপর কয়েকটা ক্লিক করে চোখ খোলা থেকে আবেশে বুজে থাকা। নিজেই এভাবে তিতিরের অসাধারণ কয়েকটা ছবি তোলায় মুগ্ধ তন্ময়। দারুণ লাগছে তিতিরকে। শুধুই মায়াবতী না, সাথে কেমন যেন খানিকটা গ্ল্যামারাস লাগছে।

ছবির মুহুর্তগুলো মনে করতে করতেই ফ্লাইট নামার ঘোষণা এলো। জুস আর একটা স্যান্ডউইচ খেয়ে নিয়েছে এই ফাঁকে, প্লেনে। নেমে ইমিগ্রেশন কাউন্টারে গিয়ে পাসপোর্ট রাখতেই একই স্পেশাল প্রটোকল দিয়ে ওকে মাত্র দশ মিনিটে এসকর্ট করে গাড়ীতে নিয়ে গেলো। একটা গ্রে মার্সিডিজ বেঞ্জ, এস ক্লাস, এক্সিকিউটিভ মডেল। ব্যাপার দেখে তন্ময় নিজেই ভিড়মি খাওয়ার যোগাড়। সকাল সাতটা বাজে, গাড়ীতে চেপে দেখলো। ফোনের সিম পাল্টে নিয়ে মেসেঞ্জারে দেখলো, তিতির অনলাইনে আসেনি এখনও। দারুণ খুশী হলো। সবাইকে অবাক করে দিতে পারবে। আধ ঘন্টার মধ্যেই এসে পৌঁছে গেলো বাড়ীতে। গেট খোলার শব্দে চাচা বের হতেই অবাক হলেন। জড়িয়ে ধরতেই তন্ময় সব কথা বলে দিলো দুই মিনিটের মধ্যে। ভিজয়া দৌড়ে এলো। ভুত দেখার মতো চমকে গেলো, কারণ জানতেও পারেনি তন্ময় আসবে। ছবি দেখেছিলো তন্ময় তাই চিনতে অসুবিধা হয়নি। ম্যাডামকে ডাকবে কিনা জানতে চাইলে মানা করলো তন্ময়। আহমেদ চাচার সাথে কথা বললো। সবকিছু শুনে চাচাও ভয় পেলেন কিন্ত খুশী হলেন এভাবে চলে আসায়, বিপদ না বাড়িয়ে। চাচার কাছ থেকে কথা শেষ করে একটা মেসেজ পাঠালো পার্টনার হাজী রাহমান সাহেবকে। মেসেজ পেয়েই উনি কল দিলেন। কথা বললেন। ভীষণ অবাক হলেন এভাবে আসার খবরে। হাই কমিশনের ইমেইল দেখে গাড়ী পাঠিয়েছেন ঠিকই ব্যবস্থা করে, কিন্ত বুঝতে পারছিলেন না কি হয়েছে। তাই এখন সব শুনলেন। তন্ময় চাঁদাবাজি নিয়ে কিছুই জানায়নি, যেমনটা জানায়নি ঢাকার হাইকমিশনে। শুধু ফাইনাল এগ্রিমেন্ট সাইনিং এর কথাই জানালো। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর থাকার ব্যবস্থা করতেই এত হুট করেই চলে এসেছে জানালো। ঘাগু লোক হাজী রাহমান। কথা বাড়ালেন না। শুধু বললেন আজকে দিনের মধ্যে ওঁদের সবার গাড়ীর ব্যবস্থা পার্মানেন্ট করে দেবেন। আর ঘন্টা দুয়েকের মধ্যেই এসে সব কথা সারবেন তন্ময়ের সাথে। তন্ময়ও দু’ঘন্টা সময় পেয়ে খুশী হলো। একটু রেস্ট নিতে পারবে। চাচার সামনে বসেই কথা হচ্ছিলো। তাই চাচা’র সাথেও আরেকবার হ্যালো করে কথা শেষ করলেন হাজী রাহমান সাহেব।

হাজী রাহমান সাহেব আগে যখন ডক্টর মাহাথির মোহাম্মদ প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তখন সরকারি আমলা ছিলেন আর এই প্রজেক্টের মূল পরিকল্পনা করতে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। নিঃসন্তান মানুষ। তন্ময় পরিচিত হয়েছিলো উনি একবার বাংলাদেশে ব্যক্তিগত ভাবে বেড়াতে গিয়েছিলেন সময়। তখনই তন্ময়ের সাথে কয়েকবার কথা বলে এই কাজের খবর দেন নিজে থেকে। পরে এই কাজ পেতে তন্ময়কে পুরো সহযোগিতা করেছেন। বয়সের আগেই রিটায়ারমেন্টে গেছেন। পৈতৃক অনেক সম্পত্তি পাম বাগান আর এই প্রজেক্টের অনেকটা জায়গা ওনার সম্পদ। একটু অন্যরকম মানুষ, তাই সরকারি চাকরি ছেড়ে অন্যকে কাজ পেতে সুযোগ দিতে নিজের সম্পদের কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। সাথে পরিচিত তন্ময়েকে নিয়েছেন। মালয়েশিয়ার সরকারের কয়েকটা ইন্টেরিয়র ডেকোরেশন এর কাজ করেছে তন্ময়ের কোম্পানী। তাতে টাকা বেঁচে যাওয়ার পরে তা ফেরত দেয়ায় বাংলাদেশের তন্ময়ের ব্যাপারে অন্যরকম করে ভেবেছেন হাজী সাহেব। প্রাইভেট পাবলিক পার্টনারশিপ প্রজেক্টে সেজন্যই তন্ময়কে সাথে নিয়ে মেজর শেয়ারহোল্ডার করে ব্যবসা করার সুযোগ করে দিয়েছেন মালয়েশিয়ায়। তন্ময়ের কাছে ৮০% শেয়ার, আর নিজে রেখেছেন ১৫%। ৫% সরকারের। তন্ময় অবশ্য ওর কাছে থাকা শেয়ারে ভাগ দিয়েছে তিতির আর আহমেদ সাহেবকে। কোম্পানীর চেয়ারম্যান আহমেদ সাহেব। ভাইস চেয়ারম্যান হাজী রাহমান। তিতির, ফারজানা মেহজাবীন, ওকেও ভাইস চেয়ারম্যান করেই রেখেছে কোম্পানীতে। হাজী রাহ্মান খুব খুশী হয়েছিলেন তন্ময়ের এই ব্যাপার দেখে। অনেক দোয়াও করেছেন। বলেছেন ওনার দেখা কেউই কখনও নিজের স্ত্রীকে এভাবে কোম্পানীতে কাগজে-কলমে শেয়ার দিয়েছে বলে মনে করতে পারেন না। অনেক বেশী সম্মান করেন তারপর থেকেই উনি তন্ময়কে। তিতির বা চাচা কেউই অবশ্য এসবের কিছুই জানেনা। এত সম্মান করে ভিআইপি হিসেবে এয়ারপোর্টে রিসিভ করানোর এটাও একটা কারণ ছিলো। তিতিরকে আর চাচাকে বোর্ড মিটিংয়ে সারপ্রাইজ দিতে সবকিছুই লুকিয়ে রেখেছে তন্ময় আর হাজী রাহমান সাহেব।

ভিজয়াকে বললো রুমটা দেখাতে, তারপর নিজেই আস্তে করে লক খুলে, ভিজয়ার কাছের ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে, আস্তে আস্তে ঘরে পা দিলো। বাইরের আলোয় হাল্কা আভাসে দেখছিলো, মুনিয়া শুয়ে আছে মায়ের বুকে জড়িয়ে। তিতিরও ওকে ধরেই ঘুমে। দরজাটা আবারও লক করে, ভেতরে ঢুকে গেলো তন্ময়। ব্যাগ আর কেস পাশে নামিয়ে রেখেই খাটের যেই পাশে জায়গা আছে, সেখানে কাত হয়ে শুয়ে তাকালো আবারও তিতিরের দিকে। খাটে একটু চাপ লাগায় তিতির চোখ মেলে তাকাতেই চোখ বড় হয়ে গেলো। হুড়মুড় করে উঠে বসলো। একবার ঘরের চারপাশে তাকালো, আবারও তন্ময়ের দিকে, আবার ফোনের দিকে। ফোন হাতে নিয়ে মেসেজ দেখলো। মেসেঞ্জারে পাঠানো মেসেজ দেখলো। অবাক হতে দেখে তন্ময় রিমোট দিয়ে ঘরের পর্দা হাল্কা ফাঁক করে আলো আসতে দিলো। এবার যেন তিতিরের দুই গাল বেয়ে বন্যা শুরু হলো। তন্ময় খাট থেকে নেমে এগিয়ে এসে ওকে বুকে জড়িয়ে ধরতেই সারপ্রাইজে ভীষণ চমকে গিয়ে, অবাক হয়ে বুকে মাথা রেখে চোখ বুজে থাকলো। তন্ময় হাসছে! এক পরিতৃপ্ত, সুখের অনাবিল এক হাসি। তিতিরও যেন চোখ বুজে শান্তি পেলো ওর আশ্রয়ে মাথা রেখে। মুনিয়া টের পায়নি, ঘুমাচ্ছে। এখন পাশ ফিরে পুতুলটা আঁকড়ে ধরে নিলো, ঘুমের মাঝেই। তন্ময় বুকে চেপে ধরে রইলো তিতিরকে। নিরাপদ আশ্রয় তন্ময়েরও। শান্তি পেলো এতক্ষণ পরে।

তৌফিকুল করিম সুহৃদ

লেখক:
Director
Fingertips Innovations Ltd.