ঘন্টা দুয়েক ঘুমিয়ে আবারও জেগে উঠে তন্ময় দেখলো খেয়াল করে ঘরে মুনিয়া নেই। শুধু তিতির আর তন্ময়। চোখ মেলতে দেখে তিতিরও তাকালো হাসি মুখে। গুডমর্নিং বলে চা খাবে নাকি জিজ্ঞেস করলো। তন্ময় খাবে না। কাছে ডাকলো ইশারায় তিতিরকে, হাত বাড়িয়ে। শুয়ে থেকেই। তিতির আস্তে ইশারা করলো, না, এখন কিছু না, পরে, সবাই-ই জাগা আর নড়াচড়া করছে।তারপরও তন্ময় একটু আদর চাইলো, অন্তত জড়িয়ে ধরে থাকতে কোলে মাথা রেখে শুয়ে থাকলো তিতিরের কাছে। তিতির লজ্জা পেলেও, আস্তে আস্তে করে মাথার চুকে বিলি কেটে দিচ্ছিলো। তন্ময়ের হাতও আলগোছে তিতিরকে কোমড়ে জড়িয়ে শুয়ে রইলো।

কিছুক্ষণ এভাবে চুপচাপ শুয়ে থেকে তন্ময় উল্টো হয়ে শুয়ে চোখ তুলে তাকালো। দুচোখ ভরে কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখলো তিতিরকে, লজ্জা পাচ্ছিলো তিতির। কি দেখো জিজ্ঞেস করলে, তন্ময়ের উত্তর, বউকে দেখি, নিজের। ঠাট্টা আর ভালবাসার উত্তর শুনে লাজুক চোখে তিতির বললো, কাজ আছে উঠে পড়ো। জোর করে কপাল টেনে নামিয়ে তিতিরকে চুমু দিলো তন্ময়। ঠোঁটের উষ্ণ স্পর্শ দুজনকেই কিছুক্ষণ আবেশিত করে রাখলো। তিতির একটু আদর থামিয়ে ছাড়ালো নিজেকে। তন্ময়ও বুঝলো এখন বেশী আগানো যাবে না। তাই নিজেও উঠে গেলো। ওয়াশরুম থেকে শাওয়ার নিয়ে রেডি হতে লাগলো। কাপড় তেমন কিছু সাথে আনেনি লাগেজ ভারী হবে বলে। চিনোর ট্রাউজার আর পোলো টিশার্ট পড়েই বের হলো ঘর থেকে, পায়ে একটা চটি গলিয়ে নীচে নামতেই সবাইকে একসাথে পেলো। হাল্কা নাশতা করলো। তারপর তিতিরকে হাজী সাহেবের সাথে কথা বললো। উনি এসে অপেক্ষা করতে হয়নি, তন্ময় আর আহমেদ সাহেবের সাথে কথা বলতে বাড়ীর অফিস কাম স্টাডি রুমে গেলো তিনজন মিলে। কিছুক্ষণ পরে তিতিরকে ডাকলো ইশারায়, আর সুনন্দা আর সুপ্রীতির তাকিয়ে বললো, তোরাও আয়। সবাই-ই একসাথে হলে, হাজী সাহেবের সামনেই কথা বললো তন্ময়। জানালো কাজ কি, কার কি দায়িত্ব, কিভাবে কে কোথায় কি করবে। অফিস ওদের দুই সপ্তাহ পরে, কারণ একসপ্তাহ ওরা ট্রেনিং নেবে বাইরে, আর ট্রেনিং শেষে হাজী সাহেবের অন্য একটা কোম্পানীতে সাতদিন ওদের কাজ করা দেখানো হবে। দুই সপ্তাহ পরে সবাই একসাথে কাজ শুরু করবে। তিতির যদিও বড় দায়িত্ব পাচ্ছে, তারপরও সুনন্দা আর সুপ্রীতির কোন অভিযোগ নেই। কারণ ওরা জানে, দাদা প্ল্যান করেই সবকিছু করেন। আর বোনদের ঠকাবেন না। কাজের মিটিং শেষ করে হাজী সাহেব চলে গেলেন। আহমেদ চাচাও ঘরে যাবেন রেস্ট নিতে। বললেন বয়স হয়েছে, এখন এত কাজের প্রেশার উনি আস্তে আস্তে কমাবেন। সব দায়িত্ব এই তিন মেয়ের আস্তে আস্তে বুঝে নিতে হবে। উনি দোয়া করবেন সবার ভালো চেয়ে সবসময়ই।

তিতির, সুনন্দা আর সুপ্রীতির সাথে একসাথে বের হবে বললো তন্ময়, বাইরেই খাওয়াবে ওদেরকে। শনিবার, তাই হাল্কা ভিড় থাকলেও ভালো লাগবে সবারই। মুনিয়াকে রেডি করে নিয়ে বেরুতেই খুব খুশী হলো ও। সবার সাথে বেড়াতে যাবে। বুঝে গেলো। তন্ময় বের হবার সময় তিতিরকে বললো কাপড় চোপড় কিনবে কয়েকটা, কারণ যা নিয়ে এসেছে তা খুব সামান্যই। তাই আজকে একসাথে যাচ্ছে যখন তাই।কিনে নেবে। পেট্রোনাস টাওয়ার শপিং এরিয়াতে গেলো সবাই। সুনন্দা আর সুপ্রীতির সাথে তিতিরও নামলো। যদিও তিতিরের চোখে অপার বিষ্ময় এই টাওয়ার। প্রথম দেখছে আজকে। দিনের আলোয়। মুনিয়াকে কোলে নিয়ে সুনন্দা খুব খুশী মনে ঘুরছে। বাগী’তে বসে থাকতে চাইছে না বলে সুনন্দা ফুপী হয়ে আরও আহ্লাদ দেয় ওকে কোলে নিয়ে। দুজনের কারো বয়সেই যেন ফারাক নেই, এমনভাবে দুজন মেতে আছে। তিতিরকে আল্গা করে হাতে ধরে হাঁটতে পাশে থাকছে তন্ময়। কাল এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে যেঅন খারাপ ভাবটা ছিলো তিতিরের, সেটা এখন একেবারেই উড়ে গেছে। আপন মানুষ হাত ধরে আছে। সুনন্দা আর সুপ্রীতির চাপে তিতিরও লুজ ট্রাউজার আর টপ্স চাপিয়েই বের হয়েছে, শুধু উড়নী রেখেছে একটা। তিতির স্মার্ট, কিন্ত লাজুক ভীষণ, কথাবার্তা বলে চটপট করে, কিন্ত তন্ময়ের সান্নিধ্যে সেটা আবার আগের মতো প্রগলভতা পাচ্ছে। তন্ময় বুঝিয়েছে, অতীত সরিয়ে রেখে সামনে দেখতে, তাতে তন্ময় সবসময়ই পাশে আছে, সাহস দিচ্ছে, দিবেও। সাহসের ফল পাচ্ছে। লাজুক ভাব না কমলেও আস্তে আস্তে নিজেকে মেলে ধরছে তন্ময়ের কাছে।।এটাই তন্ময়ের বিশাল পাওয়া। ভাইয়ের জন্য এম এন্ড এস এ কাপড় দেখতে দেখতে সুনন্দা আর সুপ্রীতি তিতিরের জন্যও কিছু কেনাকাটা করতে দেখাচ্ছিলো, তন্ময় সায় দিলো বোনদেরকে। ওদেরকেও কিছু কিনে দিলো তন্ময়। হঠাৎ করেই দুই বোনের একটু ইচ্ছে হলো তিতিরের হেয়ার স্টাইল।পাল্টানোর জন্য। ওরা যেহেতু স্টাইল করে তাই ভাবীকেও সাথে পেতে এই সিদ্ধান্ত, আর দাদাকে রাজী করাতে সয় লাগলো না। দাদা সায় দিলো, তবে বলে দিলো যেন তিতিরের মতের বাইরে যেন কিছু না করে। আর সেটা বলাই কাল হলো, দুই বোন দাদাকেও ধরব নিয়ে গেলো বিউটি সেলুনের ভেতরে। তিতিরও বেচারা একটু লজ্জা পাচ্ছিলো কি করবে, বুঝতে পারছিলো না। তন্ময় সাহস দিলো। নিজেকে মেলে ধরতে, সবার সামনেই।একটা আলগা চুমু দিতেই দুই বোন উউউউউউ করে উঠতেই তিতির আরও লজ্জা পেয়ে রাঙা হয়ে গেলো। তারপর ওদের তিনজনকেই স্বাধীনতা দিয়ে, যা ইচ্ছে করতে পারমিশন দিয়ে মুনিয়াকে নিয়ে নিজেই কিছু কেনাকাটা করতে বের হলো। মুনিয়াও মহাখুশী মনে বাব এর (পুরো বাবা কথাটা সবসময় বলতে পারেনা) সাথে বাগীতে চড়ে বের হলো। প্রথমেই মেয়েকে নিয়ে টয়স্টোরে গেলো, একটা পছন্দের পুতুল কিনে ওকে ব্যস্ত করে দিলো। যদিও মুনিয়া অবাক হয়ে এত খেলনা থেকে বেছে নিতে হিমশিম খাচ্ছিলো। দোকানীরাও ওকে তুরতুর করে ঘুরে বেড়াতে দিচ্ছিলো, এটা ওটা দিয়ে কনফিউজ করছিলো। মুনিয়া একবার ধরে, আবার একটা হাসি দিয়ে বাব এর কাছে এসে মুখ লুকিয়ে আবার অন্য আরেকটা খেলনা ধরতে যায়। এভাবে বেশ খানিকটা সময় পার করে তারপর একটা পছন্দের পুতুল কিনে বের হলো দুজনে। এর মাঝেই অবশ্য মুনিয়াকে একটু একটু করে জুসের বোতল খালি করিয়েছে। ফুড কোর্ট থেকে আবারও একটা জুস নিয়ে তারপর এদিক সেদিক হাঁটতে লাগলো। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো কিভাবে যেন এক ঘন্টা পার হয়ে গেছে। একটা প্লে জোনে মুনিয়াকে নিয়ে খেলালো তন্ময়। তারপর যখন বের হয়ে আসবে, তখনই তিতিরের কল আসলো, কোথায় আসবে জানার পরে তিনজনেই আসলো অল্প সময়েই। তিনজনের স্টাইল দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে তন্ময় শুধু দুই বোনকে বললো, আমার কার্ডের টাকা রেখেছিস, নাকি সব খরচা করেছিস! তিতির লজ্জা পেলেও দুই বোনই উত্তর দিলো, এই টুকুতেই? এখনো অনেক শপিং লাগবে তাই বেশী খরচও করেনি ওরা। তিনজনই একই ভাবে স্টাইল করাতে খুব মিষ্টি লাগছিলো। তিতিরের চোখেমুখে ফুটে উঠছিলো একটা আনন্দ। তন্ময়ের চোখ এড়ায়নি সেটা। সবাই মিলে ফুড কোর্টে লাঞ্চ করতে ঢুকলো। চিরায়ত মালয়েশিয়ার খাবার খেতে গেলো সবাই-ই, যদিও বিভিন্ন দেশের নানারকম খাবারই এখানে পাওয়া যায়। লাঞ্চ সেরে ফুড কোর্ট থেকে বেরিয়ে এম এন্ড এস থেকে সবকিছু গুলো কালেকশন করে নিলো। ড্রাইভারকে গাড়ী নিয়ে আসতে বলে ওরাও পিক আপ পয়েন্টে এসে দাঁড়ালো। গাড়ীটি উঠে ফুপুর কোলে খেলা করতে করতেই মুনিয়া ঘুমিয়ে গেলো। আর সুনন্দাও বুকে চেপে আগলে রাখলো আদরে। সুপ্রীতির সাথে তিতিরও অল্প কিছু গল্প করতে করতে ওরা বাড়ী ফিরেই বুঝতে পারলো সন্ধ্যা হয়ে আসছে। আহমেদ চাচা বাগানে বসা ছিলেন। সবাইকে ফিরতে দেখে একটু হাসলেন তবে কিছু একটা হয়েছে বুঝেই তন্ময় চাচার কাছে এগিয়ে গেলো। চাচা আশ্বস্ত করলেন কিছু হয়নি, শুধু ভয় পাচ্ছিলেন ওদের ফিরে আসা পর্যন্ত।

বিকেল আর সন্ধ্যা সবাই আড্ডা মেরে কাটিয়ে দিলো। এরই মাঝে তিতির আর তন্ময়ের সাথে ভিজয়ার একটা ছোটখাটো মিটিং হয়ে গেলো। তিতির ব্যস্ত থাকবে দুসপ্তাহ, তাই তন্ময় ভিজয়াকে জানিয়ে দিলো খাওয়া দাওয়া কিভাবে কি করবে, এঁদের সবার জন্য, তা যেন আগেই সবার কাছ থেকে জেনে নিতে পারে। চাচার ডায়েট চার্ট আগেই পাঠিয়ে দিয়েছিলো তন্ময়, তাই ভিজয়া জানে কি করা লাগবে। সুনন্দা আর সুপ্রীতির সাথে আলাপ করে নিতে বললো, যদিও তিতির বললো ওরা তিনজন একই ধরনের খাবারই খাবে আলাদা করে কিছু যেন না করে। ভিজয়া আদিপুরুষ শ্রীলঙ্কার আর ইন্ডিয়ার হলেও, মালয়েশিয়ার মানুষের মতো ভীষণ অমায়িক কিন্ত একটা আলাদা ব্যক্তিত্ব আছে। তন্ময় ওকে বললো, রানীকে আস্তে আস্তে সব কিছু শিখিয়ে দিতে, কারণ ভিজয়া হয়তো বা আরও ভাল কিছু কাজের দায়িত্ব নিতে পারবে তাহলে তন্ময়ের কাজের ক্ষেত্রে। অফিস এন্ড হোম ম্যানেজমেন্টের ওপর ডিপ্লোমা করা আছে আর গ্রাজুয়েশন করেছে ইংলিশ লিটারেচার নিয়ে।

সকালে উঠে অনেক কাজ শুরু করতে হবে। প্রেজেন্টেশন রেডি করতে হবে। ফাইলগুলো গুছিয়ে নিয়ে হাজী সাহেবের সাথে বসা লাগবে। তারপর সরকারি লোকদের সাথে কথা বলতে শুরু হবে। সবই হয়তো সহজেই কনভিন্স করা সম্ভব হবে, কিন্ত বাংলাদেশের হাই কমিশনের মানুষ কতটা সাহায্য করবে, তা নিয়েই শুধু সংশয় থেকে যায়। তার উপর যখন সেই হাইকমিশন মালয়েশিয়ায়। দেখাই যাক কতটা কি হয়!

আপাতত ঘুমাতে যাওয়ার জন্য গেলো তন্ময়। মুনিয়াকে আদর করে দিলো। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই একটু একটু করে হাসছেও। মনে হয় স্বপ্ন দেখছে। তিতিরও শুতে যাবার জন্য কাপড় চেঞ্জ করে বিছানায় এলো। তন্ময় জেগে আছে দেখে তাকালো। একটু আশ্বস্ত হবার জন্য, সাহস পাবার আশায় তাকানো, দেখেই বুঝতে পারলো তন্ময়। ঘাবড়ে গিয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করলে, তিতির স্বীকার করলো, ভীষণ ভয় হচ্ছে। তন্ময় শুধু বললো, ভয় না পেতে। তিতির অনেক আত্মবিশ্বাসী একজন মেয়ে, সবার সাথে এই কোর্সে যাওয়ার ব্যবস্থা তন্ময় করেছে শুধু আরেকটু ঝালিয়ে নিতে। কারণ তিতিরের সংসার, জীবন সামাল দেয়ার অসম্ভব পারদর্শিতা আছে, তাই ব্যবসায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে যে-ই সামান্য গাইডেন্স দরকার, সে-ই গাইডেন্স আর কম্যুনিকেশন স্কিলস বাড়বে। তাই ভয় না পেতে। হাতটা হাতে নিয়ে হাল্কা চাপ দিলো, জড়িয়ে কপালে একটা চুমু দিলো তন্ময়। তিতিরের আবেগে আজকে ভেসে যেতে চাইলো তন্ময়। তিতিরও আজকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো তন্ময়কে। ভালবাসার জন্য আজকে যেন তিতিরের আগ্রহ বেশী। সেই টানে আজকে তন্ময় আস্তে আস্তে আবেগের জোয়ারে তিতিরকে টেনে নিলো। সুখের সমুদ্রস্নানে দু’জনে এক হয়ে মিশে যেতে লাগলো।

ভোরের আলোয় চোখ মেলে তন্ময় দেখলো তিতির এখনো ওর বুকের ওপর হাতে জড়িয়ে ঘুমাচ্ছে। যতটা সম্ভব না নড়েচড়ে পাশের বেডসাইড টেবিল থেকে মোবাইল নিলো হাতে। সময় দেখে তারপর একটু ফেসবুক ঘাটলো, মেসেঞ্জারে মেসেজ চেক করলো। আননোউন মেসেজের একটা লালবাতি জ্বলে আছে। দেখতে গেলো কে পাঠিয়েছে। “ভালো মানুষ” নামের একজন কে যেন পাঠিয়েছে। নাম ঠিক মতো না থাকায় তন্ময় মেসেজটা পড়ার গুরুত্ব দিলো না। এমনিতেই এখিন একটা বিপদের গন্ধ আছে ঢাকায়, তাই অযথা ঝামেলা বাড়াতে চাইলো না। বিশেষ করে এখন যখন সবকিছু একটু একটু করে গুছিয়ে নিজের একটা ভালবাসার পৃথিবী গড়ে তুলতে চাইছে। অনেক কষ্ট করে, বুদ্ধি আর সততা দিয়ে একটা নতুন দেশে সবাইকে নিয়ে থিতু হতে চাইছে। জীবনের কষ্টগুলো থেকে সরে যেতে চাইছে বোনদের সাথে নিয়ে। নতুনভাবে বাঁচতে শিখছে তিতিরকে পাশে পায়ে। আগে যেভাবে বেঁচে ছিলো, সেটা ঠিক বেঁচে থাকার মতো হয়তো ছিলো না। সেই বেঁচে থাকাটা ছিলো শুধুই দায়িত্ব পালনের জন্য। সবার সব দায়িত্ব এখনো পালন করছে, কিন্ত সাথে নিজের জীবনকেও ফিরে পেতে চাইছে।

চিন্তা করতে থাকলো অভি আর রাতুলকেও আনিয়ে নেবে কিনা তাড়াতাড়ি। কারণ ওকে না পেয়ে যদি অভি রাতুলের ওপর চড়াও হয়, বা কিছু হয়ে যায় ওদের নিজেকে সারাজীবন মাফ করতে পারবেনা। আজকে রাতের মধ্যে সব কাজ কতটা আগায়, সেটার ওপর নির্ভর করছে অভি আর রাতুলকে কুয়ালালামপুর আনানো। তিতিরের চোখ খুলছে আস্তে। উঠে গেলো। একটু লজ্জা পেয়েছিলো, তন্ময় আঁকড়ে আটকাতে চুপ করে তাকালো। “তুমি আমারই বউ, আমারই বুকে মাথা হাত রেখে শুয়েছো, তাহলে লজ্জা পাচ্ছো কেন? ” বলেই একটা চুমু দিলো। সকালে আরও কিছু করতে মানা করে উঠে পড়লো তিতির। ওয়াশরুমের দিকে যেতে যেতে একবার মুনিয়াকে দেখলো। তন্ময়ও উঠে এসেছে মুনিয়ার পাশে। ঘুমাচ্ছে দেখে, আস্তে করে ঘরের দরজাটা খুলে নীচে নামলো।

তন্ময়কে নেমে আসতে দেখেই ভিজয়া এগিয়ে এসে শুভেচ্ছা জানিয়ে চা কফি কিছু নেবে কিনা জানতে চাইলো। নেবে না বলে চাচার ঘরের দিকে এগিয়ে গেলো। তাকিয়ে দেখলো চাচা বাগানে হেঁটে বেড়াচ্ছেন। তন্ময় এগিয়ে গেলো। সারাদিনের কাজের প্ল্যান নিয়ে দুজনে কয়েকটা কথা হলো। ভিজয়াকে বললো তিতির, সুনন্দা আর সুপ্রীতির জন্য মার্সিডিজ এর মারকোপোলো’টাকে দিতে বলে দিলো ওদেরকে পৌঁছে দিতে। তন্ময় হয়তো সেই একই গাড়ীতেই বের হয়ে যাবে। চাচা’র জন্য এস ক্লাসের বেঞ্জ ড্রাইভার সহ থাকতে বলে রাখলো বাসায়। হাজী সাহেবের সাথেও এর মাঝে কথা হলো। সব অ্যাপয়েন্টমেন্ট গুছিয়ে শাওয়ার নিতে ঘরে গেলো। তিতিরও এর মাঝেই শাওয়ার নিয়ে বের হয়ে রেডী হচ্ছে। মুনিয়া উঠে পড়েছে। মা’কে রেডী হতে দেখে একটু মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করছে কি হচ্ছে। সচরাচর মা’কে যেভাবে দেখে, আজকে একটু কর্পোরেট ড্রেসআপ করতে দেখে ওরও খানিকটা অবাক লাগলো। এর মাঝেই তিতির মুনিয়াকে কোলে করে বের হলো ঘর থেকে। মা’কে আগলে ধরে ঘাড়ে মাথা রেখে আদর নিচ্ছিলো মুনিয়া।

শাওয়ার সেরে রেডি হয়ে বের হয়ে আসলো তন্ময়। খাবার টেবিলে একটু থমথমে অবস্থা দেখে বুঝতে চেষ্টা করলো কি হয়েছে। সুনন্দার দিকে তাকিয়েই বুঝেছে, হয় ঝামেলা হয়েছে জামাইয়ের সাথে নাহলে কোনো কারণে মন খারাপ। খেতে বসার আগে বোনটার পাশ দিয়ে দাঁড়িয়ে মুখ নামিয়ে গালে একটা চুমু দিতেই ঝরঝর করে কেঁদে দিলো সুনন্দা, সুপ্রীতির গালে চুমু দিয়ে পাশে হাঁটু গেড়ে বোনকে আদর করে সামলালো তন্ময়। বুঝতে পারলো, মন খারাপ বাবা-মা না থাকার জন্য। কিছু বলা লাগে না। তন্ময় জানে কার কিসের জন্য চোখে পানি আসতে পারে। একটু সোজাসরল মেয়ে সুনন্দা, সুপ্রীতিও খুব বুদ্ধিমতী বলা যায় না। তনে একটা কথা ঠিক, কেউই প্যাঁচাতে শেখেনি কিছু নিয়ে। খুবই বড় মনের মানুষ দুবোনই। সেটা তন্ময় খুব ভালো করে জানে বলেই ভয় পায়। খেতে বসলো সুনন্দার পাশেই, বোনও ভাইয়ার জন্য ব্রেড এ বাটার লাগিয়ে দিতে লাগলো। সুপ্রীতিও পাশ থেকে ডিম এগিয়ে দিলো প্লেট্ব। ভিজয়া অবাক হয়ে দেখছিলো আর বুঝতে চেষ্টা করছিলো কি করবে। তন্ময় বলে দিলো ওকে বুঝিয়ে, ভাইকে বোনদের আদর এটা। তিতিরও কিছু নিতে হাত বাড়াতে যাচ্ছিলো দেখে ভাবীকেও কিছু দিতে তাকালো সুপ্রীতি। এই আনন্দ সবাই পায়না। এই আনন্দের মাঝে যে সুখ লুকিয়ে আছে, সে-ই সুখ কেউই না পেলে বুঝতে পারবেনা।

হাল্কা হাসিঠাট্টা করে নাশতা করে, চাচার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বের হলো ওরা চারজন। মুনিয়া সুন্দর করে বাই বাই দিয়ে খেলতে ব্যস্ত রইলো দেখে সবাই-ই খুব আস্বস্ত হলো। বাগানে ছুটে খেতে তার ভীষণ পছন্দ, সেটা বুঝে গেছে সবাই। একটু নতুন করে হাঁটতে পারে, দৌড় দিতে পারে, সেটা ওর কাছে বিশ্বজয়ের চেয়ে কম কিছুনা মোটেই। একটা বড় সুবিধা বাগানের গাছের পাখির কলরবে ওকে তাড়াতাড়ি করে খাইয়ে দিতে পারে রানী।

তিতির, সুনন্দা, সুপ্রীতির ট্রেনিং ইন্সটিটিউট এ নামিয়ে, অফিসের দিকে যেতে শুরু করতেই হাজী সাহে ফোনে জানালেন তাড়াতাড়ি করে পুত্রাজায়ায় চলে যেতে, কারণ এমপ্লয়মেন্ট মিনিস্টার দেখা করতে চেয়েছেন। ভাগ্যিস রেডি হয়েই বের হয়েছিলো, যেন যেকোনো মিটিংয়ে ডাক পড়লে সাথে সাথে যেতে অসুবিধা না হয়।

বিশ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে গিয়ে মন্ত্রী সাহেবের সাথে দেখা করতে ঢুকে পড়লো তন্ময় আর হাজী সাহেব। পরিচিতি পর্ব সেরেই কাজের কথা বলতে লাগলেন মন্ত্রী সাহেব। তন্ময় প্রেজেন্টেশন দেখাতেই উনি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। বললেন, এ-ই কাজ তো হাই কমিশনের করার কথা, সেটা তন্ময় কেন করতে এত ব্যস্ত হচ্ছে। তন্ময় প্রশ্নের জন্য তৈরী হয়েই ছিলো। সরাসরি বললো, “আমার দেশের এই শ্রমিকেরা এই দেশে কাজের জন্য এসেভমছে, তাদের সবকিছু হয় বিক্রি করে, নাহয় বন্ধক রেখে চড়া সুদে টাকা নিয়ে। এরা যদি জেলে যায় এদের প্রত্যেকেরই পরিবার না খেয়ে মারা যাবে। তাই তন্ময় যেহেতু এখানে শ্রমিক নেবেই, এদের কাজে লাগাতে চায়। মন্ত্রণালয়ের কাগজের সাহায্য আর অনুমতি পেলে এদের সবাইকেই এখানে আইনগতভাবে নিয়োগ দিয়ে এদের ভাগ্য উন্নয়ন করতে চায়। ব্যাপারটা মন্ত্রী সাহেবের ভীষণ ভালো লাগলো, তাই বললেন, উনি সব সাহায্য করতে প্রস্তুত এবং সাথে সাথেই তন্ময়ের আগে পাঠানো ই-মেইল বের করে তাতে ওনার অনুমোদন আর সম্ভাব্য যা করার, সব কর‍তে নির্দেশ দিলেন, যেন কোনরকম সময় নষ্ট না হয়। সাতজে সে-ই শ্রমিকরা যেখানে রাখা আছে, সেখানে তাদের পাসওনা থাকলে বাংলাদেশের হাই কমিশনের সাথে কথা বলে কাগজপত্র করাতে বলে দিলেন। মন্ত্রীকে ধন্যবাদ দিয়ে বের হয়েই হাজী সাহেবের সাথে কথা বলেই হাই কমিশনের দিকে যেতে বললো ড্রাইভার কে। হাই কমিশনে কল করে জানলো উনিও পুত্রাজায়ায় মিটিংয়ে আছেন, তাই কোথায় আছেন জেনে তন্ময় নিজেই এগিয়ে গেলো ড্রাইভার কে নিয়ে। ড্রাইভার আবিদি, স্মার্ট, জানেও কোথায় কোন অফিস। তাই ফুটফাট করে নিয়ে যাচ্ছে তন্ময়কে। হাই কমিশনার সাহেবকে পেলেও কথা বলার জন্য অপেক্ষায় থাকা লাগলো কিছুটা সময়। তারপর উনি আবার জানালেন ওনার গাড়ী ওনার বাসায় একটা কাজে গিয়েছে, আসলে তারপর বের হবে অফিসে যেতে। তন্ময় বললো ওর গাড়ীতে নিয়ে যেতে পারবে কিনা তন্ময়, উনি একটু দ্বিধা করতে দেখে, তন্ময় শুধু বললো গাড়ীটা বুলেট প্রুফ, আর এক্সিকিউটিভ ক্লাসের। স্যারের অসুবিধা হবেনা। কেউ বুঝবেও না বাইরে থেকে ভেতরে কারা আছে। ওনার সাথের পিএস সহ অবশেষে কিছুটা গাইগুই করলেও শেষতক উঠে পড়লেন তন্ময়ের গাড়ীতেই। আর ঘন্টা খানেকের মধ্যে পৌঁছে গেলো সবাই-ই। গাড়ীতেই ওনাকে প্রেজেন্টেশন দেখালো তন্ময়, ভেতরের প্রজেকশন সিস্টেম দিয়ে, মন্ত্রী সাহেবেএ ই-মেইল এসে যাওয়ায় সেটাও দেখালো তন্ময়। হাই কমিশনার সাহেব খুশী হয়ে শুধু বললেন, একজন সাধারণ মানুষ হয়ে যতটা কাজ আজকে উনি এই শ্রমিকদের জন্য করল্বন, বাংলাদেশের তথাকথিত বড় ব্যবসায়ী কেউই এই ধরনের কাজের কথা কখনও ভাবেননি। হাই কমিশনের সব সহযোগিতা দেবার আশ্বাস দিয়ে সাথে সাথেই উনি বললেন, গাড়ী থেকে নেমেই উনি আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে ফোন করে জানাবেন। এর মাঝেই যে তন্ময় শাহরিয়ার ভাইকে মেসেজ করেছে, সেটা উনি বুঝতে পারেননি। তাই শাহরিয়ার ভাইয়ের মেসেজটা শুধু ফোন থেকে পড়ে শোনালেন, “GREAT JOB DONE, chotobhai, proud of you. My support is there for everything you need for this venture. Best wishes for your success!” মেসেজটা পড়ে হাই কমিশনার সাহেব বললেন, “ভাই, আপনি একটু আস্তে করেন, আমি তাল মিলাতে পারছিনা আপনাদের এত ডিজিটাল কথা চালাচালির সাথে। স্বীকার করি, আমি কম বুঝি কম্পিউটার, কিন্ত আপনাদের এত তাড়াতাড়ি কাজ হয়ে যাওয়া দেখে আক্ষেপ হচ্ছে কেন এই কম্পিউটার উনি এত ভয় পান, বুঝতে পারেন না বলে!” সহজ অকপট স্বীকারোক্তি শুনে তন্ময় বললো, ভয় পাওয়ার বা ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই। উনি ওনার স্পিডেই কাজ করুন, তাতেই হবে। কারণ আসল বড় কাজ এক বেলাতেই সেরে ফেলেছে তন্ময়।

হাই কমিশনার সাহেবের থেকে লাঞ্চের অনুরোধ আরেকদিন করতে আসবে বলে রেখে, তন্ময় বের হলো এবার নিজের অফিসে যেতে। কাজ করে ফেললো অথচ এখনো নিজের অফিসেই যাওয়ার সময় পেলো না। জালান সুলতান হিসামুদ্দিন এর বিখ্যাত দায়াবুমি কমপ্লেক্সের পঁয়ত্রিশ তলা অফিসের ইন্টেরিয়র কাজ দিয়েই এদেশে তন্ময় কাজ শুরু করেছে, ওদের রিনোভেশনের সময় থেকে। তাই সস্তায় এই অফিস প্লেসটা নিতে পেরেছে, বত্রিশ তলায়, হাজী সাহেবের সাহায্য নিয়ে। এখন নিজের অফিসে এসে লিফটে উঠলো ওপরে যেতে। একটা অন্যরকম উত্তেজনা আজকে হঠাৎ করেই অনুভব করলো এখন তন্ময়। লিফট ওপরে উঠে যাচ্ছে।

তৌফিকুল করিম সুহৃদ

লেখক:
Director
Fingertips Innovations Ltd.