দায়াবুমি কমপ্লেক্সের এক্সপ্রেস লিফট থেকে একটা মেসেজ পাঠালো তন্ময় আরেফিনকে। আরেফিন আগে থেকেই এখানে থাকছে অফিসের কাজের ব্যাপারে। সাথে রুমানা আর সিলভিয়া। এই তিন রত্ন একসাথে কোন কাজে থাকলে, সেই কাজে কোন খুঁত খুঁজে পাওয়া করা যাবে না, এতটা এদের কাজের প্রতি ভালবাসা।

আরেফিন, তন্ময়ের স্কুলের অংকের স্যারের ছেলে। ভীষণ আদর করতেন তন্ময়কে। তন্ময় যখন আহমেদ চাচার অফিসে কাজে ঢুকেছে মাত্রই, সেসময় একদিন নিউমার্কেটের বইয়ের দোকানের সামনে দেখা। তখনই স্যার শুনে বলেছিলেন, ওনার ছেলের কথা আর্কিটেকচার নিয়ে পড়ছে আহসানউল্লাহ ইউনিভার্সিটিতে। ফাইনাল দেবার পরে একদিন তন্ময়ের কাছে এসেছিলো দেখা করতে। কথা বলে ভালো লেগেছিল তন্ময়ের, পরে সুযোগ বুঝে নিজের লোক হিসেবে চাকরী পাইয়ে দিয়েছে।

রুমানা অসম্ভব মেধাবী একজন মেয়ে, বাবামায়ের বড় মেয়ে, ভীষণ মিষ্টি দেখতে, কিন্ত শ্যামলা বলে বাড়ীতে অনেক অশান্তি, কারণ বাংলাদেশের শ্যামলা মেয়েদের বিয়ে হতে অনেক নাজেহাল হতে হয়, চাকরী পেতে হেনস্থা হতে হয়, অল্পতেই অপমান হতে হয়। আরেফিনের ইউনিভার্সিটির সিনিয়র, উনি আরেফিনকে সাথে নিয়ে দুয়েকটা ফ্রিল্যান্সিং কাজ করতেন। আহমেদ চাচার ফার্মে একবার একটা সুযোগ হওয়াতে আরেফিন একটু বলেছিলো তন্ময় কে, একদিন কথা বলে, ওর মাঝে ভীষণ হতাশায় আচ্ছন্ন অবস্থা দেখে, তন্ময় ওকে আরেকদিন আসতে বলেছিল, আর সেদিন বলে দিয়েছিলো, যদি খুব আত্মবিশ্বাসী হয়ে সামনে এসে কথা বলতে পারে রুমানা, তাহলে তন্ময় চিন্তা করবে, সাত দিন সময় বেঁধে দিয়েছিলো। চারদিন পরে একটা এসএমএস পাঠিয়ে পরে ছ’দিনের দিন দেখা করতে আসে। প্রথম দিনের মতো সাদাসিধে ভাবে উপস্থাপন করলেও, চোখে একটা দীপ্তি দেখেছিলো সেদিন তন্ময়। তারপর কাজে নেয়, আস্তে আস্তে সেই রুমানা অনেক ঘুরে দাঁড়িয়ে আজকের রুমানা হয়েছে। মজার ব্যাপার, তন্ময়কে অফিসে সবাই-ই যে বড়দা ডাকে, সেটা এই আরেফিন আর রুমানা ‘র ডাকা থেকেই। রুমানা শুরুটা করেছে। একদিন কাজের ফাঁকে লাঞ্চের সময় তন্ময় একই টেবিলে খেতে বসেছিলো, তখন কথায় কথায় বেশ কিছু ব্যাপারে জানতে পারে তন্ময়। একটা ছেলেকে পছন্দ করতো ভীষণ রকম। রাজনীতি করতোনা, পড়াশোনা শেষ করেনি, ছেলেটা একটা সময় নেশাখোর হয়ে যায়। রাস্তায় ছিনতাই করতো, চুরি করতো, হঠাৎ করেই অনেক পরিবর্তন দেখে সরে গিয়েছিলো রুমানা। মেয়েটা শ্যামলা হলেও দারুণ মিষ্টি একটা হাসি আছে সবসময়ই ওর মুখে। তন্ময়ের ওপরে এতটা বিশ্বাস আর আস্থা আছে যে বাবা-মা কি বললো না বললো, তা নিয়ে মোটেই চিন্তা করে না রুমানা। সবসময়ই তন্ময়ের কথা মেনে নেয়। জানে, উনি কোন ক্ষতি করবনে না। বরং একবার বাসায় পৌঁছে দেবার সময় রুমানার সেই সাবেক মানুষকে শাসিয়েও দিয়েছে। বলেছে আর কখনও ওকে বিরক্ত করতে আসলে পরে নিজে আর হেঁটে বাড়ী ফিরতে পারবে না। সেইদিন থেকেই রুমানা তন্ময়কে বড়দা বলে ডাকে।

রুমানাকে কেন যেন খুব ভালো লেগেছিলো তন্ময়ের। আজকে দেখার পরে মনে পড়লো, আসলে তিতির এভাবে কথা বলতো, সেজন্য পছন্দ করতো রুমানাকে, যদিও এই কথাগুলো একেবারেই বলা যাবে না রুমানাকেও না তিতিরকে তো না-ই। জীবনে সব কথা সবসময় সবাইকে বা বিশেষ কাউকে বলা যায়না। বিশেষ করে এসব কথা বললে, সেটা একটা সময় বাজে একটা তিক্ততা তৈরী করে সম্পর্কে।

মালয়েশিয়া অফিসের কাজ যতটা তন্ময় করেছে অনলাইনে বসে, দুর থেকে, ঠিক ততটাই করেছে এই আরেফিন আর রুমানা এখানে থেকে। দায়াবুমি কমপ্লেক্সের এই অফিস লিজ নেয়ার ব্যাপারে খোঁজ করা, নেয়ার জন্য সবকিছু রেডি করা, তারপর লিজ এগ্রিমেন্ট করিয়ে অফিস সাজানো সব কাজই আরেফিন, রুমানা আর হাজী সাহেবই করেছেন। ডিজাইনের থ্রিডি ইমেজ দেখেছে অনলাইনে প্রেজেন্টেশন মিটিংয়ে যখন দেখাচ্ছিলো ওরা, তখন, আজকেই প্রথম চাক্ষুষ দেখবে।

লিফটের দরজা খুলতেই সামনে রুমানা দাঁড়িয়ে, আজকের হাসিটা যেন আরও অনেক প্রাঞ্জল, আরও বুদ্ধিদীপ্ত, খুবই গর্ব হলো তন্ময়ের। আরেফিন পাশে দাঁড়িয়ে, সিলভিও সাথে। আদর করে জড়িয়ে রুমানার কপালে একটা চুমু দিলো তন্ময়। এই আদরগুলো যদিও সবাই-ই পেতে খুব হিংসে করে, তবুও একমাত্র রুমানা ই পায় তন্ময়ের কাছ থেকে। আরেফিনকেও জড়িয়ে ধরলো। ওর হার্টবিট এতটা জোরে হচ্ছিলো যে তন্ময় বলেই দিলো, কিরে তুই কি শ্বশুরবাড়ীর মানুষের সামনে ইন্টারভিউ দিতে দাঁড়িয়েছিস নাকি, এত ভয় পাচ্ছিস কেন? তারপর রুমানা ‘র দিকে ঘুরে বললো, কিরে, তুই ওকে বকা দিয়েছিস নাকি? রুমানার সহজ স্বীকারোক্তি, “বড়দা, দিয়েছি, দিবোই তো, বলো, তুমি আসবে অফিসে মিটিং সেরে, জানে সবই, তারপরও সকালে আটটা থেকে আমার পেছনে ঘুরছে কি করলে বড়দা খুশী হবেন, কি খাবার আনিয়ে রাখবে, এইসব। আচ্ছা বড়দা, তোমার সাথে এতদিন আমরা কাজ করি, কখনও এই ব্যাপারে তোমার কিছু নাক নেই বা বাড়াবাড়ি করতে দেখিনি, তারপর যদি বিদেশে এসে এমন করে, মনে হচ্ছিলো ধরে কষে কয়েকটা চড় মারি। তাই বকেছি!’ এবার তন্ময় আরেকটু জড়িয়ে ধরে আরেফিনকে আদর করে রুমানা কে বললো, “তুই না দিদি ওর, তাহলে এত বকিস না রে, তোকে ভয় পায়, আমাকে কম পায়। তুই আদরই করিস। নাহলে কাজ করতে গিয়ে সব ভন্ডুল করে দেবে।”

একসাথে সবাই-ই হাসতে হাসতে অফিসে ঢুকলো, আর তখনই তন্ময়ের অবাক হবার পালা। ওর স্বপ্নের নিজের অফিস, ওর কল্পনার মতোই পুরোপুরি ওপেন স্পেস কনসেপ্ট, এক পাশে একটা সাউন্ডপ্রুফ কনফারেন্স রুম। সেটা ট্রান্সপারেন্ট হলেও, গ্লাস টিন্টেড করে ডার্ক করে দেয়া যায়, যেন ভেতরের কিছুই বাইরে থেকে দেখা যায় না। পুরো অফিসের পরিবেশে একেবারেই বাংলাদেশের একটা আবহ। দেয়ালে টেরাকোটা মুরাল, বায়ান্ন থেকে ২০১৮ পর্যন্ত ইতিহাসের একটা খন্ডচিত্র। খুব সুন্দর করে করা মিনিয়েচার যেখানে বাংলাদেশের সব বিখ্যাত মানুষের ছবির ডিজিটাল ডিসপ্লে। বাঁশের বেড়া, শীতল পাটি, গামছার পার্টিশন। ওর বসার জায়গাটা একটা আলাদা গ্লাস পার্টিশনের পরে, সাতটা ছোট ছোট ট্রান্সপারেন্ট গ্লাস রুম। তাতে খুব সুন্দর করে করে করে নেমপ্লেটে নাম লেখা। ওপরে বাংলায় আর ইংরেজিতে নীচে। দারুণ লাগছে।

আহমেদ চাচা এখনো এসে পৌঁছাননি। হাজী সাহেব আগেই চলে এসেছিলেন মিটিং করে। হাই কমিশনের কথা জানাতে চায় সামনে বসে, তাই কল দেয়নি চাচাকে। এখন অফিসের সবার সাথে আলাপ করে নিচ্ছে তন্ময়। বেশীরভাগই অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরা। খুব মনোযোগ দিয়ে কাজ করছে।

রুমে ঢুকে তন্ময় মুনিয়ার সাথে একটু ভিডিও কলে কথা বলে নিলো। রানীর কাছে ভালো আছে। ভিজয়ার সাথেও কথা বললো। তন্ময়কে নিশ্চিন্ত করেছে ভিজয়া। কারণ ভিজয়াও মুনিয়ার কয়েকটা ভিডিও করে পাঠিয়েছে, ও যা যা করছে বাসায়, আর একেকটা কাজে ভিজয়া কতটা অবাক হয় দেখে দেখে। তন্ময় ভীষণ খুশী হয়েছে, ভিজয়া ভিডিও করেছে দেখে আর খেয়াল রাখছে। মুনিয়াও ভিজয়াকে পছন্দ করেছে। এটা বেশী জরুরী ছিলো।

অনেকটা সময় পেরিয়ে গেলেও আহমেদ চাচা এখনো আসছেন না দেখে তন্ময়ের কিছুটা অস্থির লাগছে। এমন তো হবার কথা না। ফোন করছে না কারণ করলেই চাচা জানতে চাইবেন মিটিংয়ে কি হলো, সেটা সামনে থেকে বলতে চাইছে তন্ময়, তাই কলও দিচ্ছে না। অনেকটা সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। নিজের অফিসে বসেই ল্যাপটপের দিকে তাকাচ্ছে আর কাজে ব্যস্ত রাখতে চেষ্টা করছে।

অনেকক্ষণ হয়ে যাওয়ায় ল্যাপটপ থেকে একটু চোখ তুলে বাইরে তাকাতেই হঠাৎ করেই খেয়াল করলো কেউ যেন আসছে রুমের দিকে। না আসার সময় রুমানার কাছে গেলো আগে। কি যেন বললো পরে রুমানার খুব অস্থির একটা দৃষ্টি চোখ এড়ালো না তন্ময়েরও। আরেফিন আর রুমানা একসাথেই রুমের দিকে আসছে। কেন যেন হঠাৎ করেই একটু ঘাবড়ে গেলো তন্ময়।

রুমানা আর আরেফিন রুমে এসেই তাকালো তন্ময়ের দিকে। তন্ময় খেয়াল করছিলো। বুঝতে পারছে কিছু একটা বিপদ হয়েছে। তাই জিজ্ঞাসু চোখে তাকালো। রুমানাই জানালো একটা বিপদ হয়েছে। আহমেদ স্যারের গায়ে গুলি লেগেছে। উনি ব্যাংকে গিয়েছিলেন, সেখানে কারা যেন গোলাগুলি করেছে, সেসময় স্যারের গায়ে গুলি লেগেছে। সাথে সাথে ওনাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছে, গ্লেন ইগলস এ। মাত্রই একজন ফোন করে জানালো ইমার্জেন্সি সার্ভিস থেকে, যেন ওরা তাড়াতাড়ি হাসপাতালে আসে। ফোনের নাম্বার থেকে ওরা অফিসের ঠিকানা খুঁজে বের করে তারপর জানাতে পেরেছে। তন্ময় উঠে হাজী সাহেবের রুমে গেলো। জানাতেই উনি উঠে সাথে করে নিয়ে বের হলেন। আরেফিন আর রুমানাও যেতে চাইলো। তন্ময় মানা করলো, বললো আগে একাই যাই, দেখে লাগলে তারপর জানালে আসার জন্য। শুধু বললো ফোন সাথে রাখতে সবাইকে। ড্রাইভার অপেক্ষায় থেকে পরে পুলিশের উপস্থিতি দেখে নাকি অফিসে কল দিয়েছিলো, তখন অপারেটর বলেছিলো ওখানেই থাাকার জন্য, তাই ড্রাইভার ওখানেই অপেক্ষায় বসে আছে পার্কিং লটে। এখিন রুমানা ওকে আপাতত বাসায় পাঠিয়ে দিলো।

হাজী সাহেব তন্ময়কে নিয়ে সরাসরি হাসপাতালে রওনা হলেন অফিস থেকে যেতে মিনিট পনের সময় লাগার কথা, ট্রাফিকের জন্য একটু সময় বেশী লাগছে। এর মাঝেই হাজী সাহেব হাসপাতালে কল দিলেন, কথা বললেন সেখানকার একজন সিনিয়র অফিশিয়ালের সাথে। সবই শুনে যাচ্ছে তন্ময়, কিন্ত মাথা কাজ করছে না। হাসপাতালে পৌঁছে রিসিপশনের কাছাকাছি যেতেই পুলিশের উপস্থিতি টের পেলো তন্ময়। ওদের পরিচয় দিতেই, হাজী সাহেব আর তন্ময়কে নিয়ে গেলো একপাশে একটা রুমে। জানালো ওরা অপারেশন করতে শুরু করেছে, কনসেন্ট পেপারের জন্য অপেক্ষা না করেই, কারণ তাতে দেরী হলে বিপদ বেশী হবে।।তন্ময় বা হাজী সাহেব কেউই তাতে কোনো আপত্তি করলো না। তন্ময় শুধু শুকনো মুখে একবার থ্যাংকস বললো। গলার আওয়াজ শুনে হাজী সাহেব তাকালেন তন্ময়ের দিকে। তন্ময় বুঝতে পারছে গলায় কান্না চেপে আছে, তবুও শক্ত থাকার চেষ্টা করছে।

পুলিশের আর হাসপাতালের লোকেরা ওদেরকে নিয়ে একটা রুমে বসালো। অপারেশন থিয়েটারের একই ফ্লোরে, কিন্ত খানিকটা অন্য পাশে, ওয়েটিং লবির সাথে।তন্ময়ের পরিচয় বিজনেস পার্টনারের চেয়েও আত্মীয় সম্পর্কে ভাতিজি জামাই জেনে সবকিছুই খুলে বলতে লাগলো। জানতে চাইলো ওনার ভাতিজিকে কি ওরা জানাবে নাকি তন্ময় জানাতে চায়। তন্ময় কিছুটা সময় নিয়ে বললো নিজেই জানাবে, কারণ ওরা মাত্রই একটা ট্রেনিং সেশনে ছিলো শেষ করে এখন হয়তো বা বাড়ী ফিরছে। তাই খানিকটা সময় নিতে চাইছে। এর মাঝে অপারেশন শেষ হয়ে গেলে ভালো হয়।

অনেকক্ষণ ধরে অপারেশন চলছে, পুলিশের লোকেরা জানালো। একজন অফিসার বের হয়ে গেলো জেনে আসার জন্য। তন্ময় বুঝতে পারছে ও ঘামছে। ফোনটা বের করে একটা এসএমএস করলো তিতিরকে। যেন বাসায় পৌঁছে থাকলে জানায়। ফিরতি মেসেজ পেয়ে জানলো ফিরেছে, একটু চিন্তা করলো, জানাবে কিনা। অপেক্ষা করছে ডাক্তার বের হবার, অপারেশন শেষ হলে তারপর জানাবে ঠিক করলো।

পুলিশের কাছ থেকে যতটা জানতে পারলো, দুপুরের দিকে এইচএসবিসি ব্যাংক আর মে ব্যাংকের ব্রাঞ্চে একদল ডাকাত দুপুরে হানা দেয়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা ব্যাংকের ভেতরে ঢুকে এলোপাথাড়ি গুলি ছুঁড়তে থাকে। ভয়ে সবাই নীচু হলেও, একজন সাহসী কাস্টমারের সাথে কিছুটা মারামারি হবার সময় খুবই বাজে ভাবে তারা সরাসরি গুলি করতে থাকে। ক্যাশ থেকে টাকা তুলে বের হচ্ছিলেন আহমেদ সাহেব। তখনই ওনার গায়ে গুলি লাগে। উনি মাটিতে পড়ে যান। যতটা সময় ডাকাতি করেছে, তাতে খুব বেশী কিছু ডাকাতরা নেয়নি বা নিতে পারেনি।

ডাকাতি করে বের হবার সময়ে আরও গুলি ছুঁড়তে শুরু করে। তাতে পড়ে থাকা আহমেদ সাহেবের গায়ে আবারও গুলি লাগে। ওরা চেষ্টা করছে ডাকাতদের ধরতে। ব্যাংকের বাইরে থেকে কিছুই বোঝা যায়নি। গুলির শব্দও আসেনি। মালয়েশিয়ায় এমন ঘটনা তেমন একটা ঘটেনা, তাই ব্যাংকের সামনে আলাদা করে কখনও তেমন কোন সিকিউরিটি থাকে না। ব্যাংকের ম্যানেজারও আহত হয়েছে। ওর গায়ের গুলি বের করা শেষ হয়েছে, অবস্থা এখন ভালো। আহমেদ সাহেবের গুলিও বের করা হচ্ছে, চারটা গুলি বের করেছে, বুক আর পেট থেকে। ডাক্তার বের হয়ে এসে জানালেন। আপাতত উনি কিছুই আশ্বাস দেননি, বলেছেন অপেক্ষায় থাকতে, আর ওরাও অবজার্ভেশনে রাখছে। বয়স্ক মানুষ, তাতে ওনার শারীরিক কিছু কমপ্লিকেসি আছে। তাই ৭২ ঘন্টা রাখবে। পোস্ট অপারেটিভ রুমে, বেডে নিলে পরে তন্ময় দেখতে পারে, যদি চায়। তন্ময় একটু সুযোগ চাইলো, পরে দেখার, কারণ ও চাইছে ওনার ভাইঝিকে নিয়ে আসতে। কারণ ফোনে বলতে চাইছে না। হাজী সাহেবেও একই সায় দিলেন।

তন্ময় তখন বের হয়ে এলো হাসপাতাল থেকে। হাজী সাহেবের ড্রাইভার নিয়ে যাচ্ছে, উনি থাকবেন অপেক্ষায়। পুলিশ ঘটনা বর্ণনা করে বুঝাতে চাইলো যে ঘটনাটা নিতান্তই একটা ব্যাংক রবারি, তন্ময় শুনে গেছে, কিন্ত মাথায় চিন্তা করছে অন্য কিছু।কেন যেন মনে হচ্ছে কিছু একটা খটকা আছে। নাহলে মালয়েশিয়ায় এমন ঘটনা ঘটে না। তন্ময়ের বারবার শুধু ঢাকা থেকে আসবার সময়ের কথা মনে পড়ছে।

ড্রাইভার খুব তাড়াতাড়ি করে বাসায় নিয়ে আসলো। অন্য গাড়ী বাসায় আছে দেখে ও ড্রাইভারকে পাঠিয়ে দিলো। ভিজয়া ছুটে আসলো তন্ময়কে নামতে দেখে। অন্য গাড়ী আগে এসেছে, ড্রাইভার কিছু জানাতে পারেনি, তাই কিছু বিপদ হয়েছে আঁচ করতে পারলো, অবশ্য কিছু জানতে চাইলো না কারণ তন্ময় শুধু বললো, পরে বলবে। ছুটে ওপরে ঘরে গেলো। তিতির মাত্র মুনিয়াকে কোলে নিয়ে ঘর থেকে বেরুচ্ছিলো। তন্ময়কে দেখে মুনিয়া খুশী হয়ে কোলে উঠতে চাইলে তন্ময় মানা করলো, বললো হাসপাতাল থেকে আসছে, একটু হাত ধুয়ে, তারপর চেঞ্জ করে কোলে নেবে। মুনিয়া কি বুঝলো না বুঝলো, ঘাড়টা মায়ের কোলে হেলিয়ে দিলো। তিতির একটু ঘাবড়ে গেছে হাসপাতাল কথাটা শুনেই। অল্প কথায় তিতিরকে ঘটনা জানাতে জানাতেই হাতমুখ ধুয়েই ঘরে কাপড় চেঞ্জ করতে লাগলো তন্ময়। চেঞ্জ করে মুনিয়াকে কোলে নিতেই গলাটা জড়িয়ে ধরে আদর করলো মুনিয়া। অনেকক্ষণ পরে তন্ময় যেন একটু শান্তি পেলো মেয়ের আদরে। তিতির পুরোবথমকে গেছে শুনে।

তিতিরকে সাথে নিয়ে ভিজয়া, সুনন্দা, সুপ্রীতির সাথে পুরো ঘটনা জানিয়েই আবারও বের হয়ে গেলো হাসপাতালের পথে। আজকে সারাদিনের সব ভালো খবর জানানো, সবকিছুই এখন অপেক্ষার প্রহর গুনে যাচ্ছে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আবারও হাসপাতালে পৌঁছে এবার সরাসরি আইসিইউ-র ফ্লোরে চলে গেলো। পুলিশের লোক চিনেছে, আগে দেখেছে বলেই, তাই সহজেই ঢুকে যেতে দিলো ভেতরে। হাজী সাহেবও অপেক্ষায় ছিলেন। বললেন, উনি ভেতরে গিয়ে দেখে এসেছেন। তিতির খুব ঘাবড়ে গেছে হাসপাতালে এসেও। গাড়ীতেও সারাটা রাস্তায় তন্ময়ের হাত ধরে রেখেছে শক্ত করে। তন্ময় ছাড়েনি। সুতির কাপড়ে ব্লকের একটা সালোয়ার কামিজ পরেছে তিতির, ঘরে যা পরা ছিলো। তন্ময় শুধু স্যুট পাল্টে একটা চিনো ট্রাউজার আর টিশার্ট চাপিয়ে চলে এসেছে।

ডাক্তারের কাছে পারমিশন নিয়ে দু’জন একসাথেই ভেতরে গেলো। তন্ময় ভালো করে বুঝতে পারছে, তিতির কাঁপছে। শক্ত করে হাতটা হাতের মুঠোয় নিয়ে রাখলো। আইসিইউ-র কাঁচের গ্লাসের ওপারে শুয়ে আছেন আহমেদ চাচা। তন্ময় তিতিরের হাত শক্ত করে ধরে তিতিরকে স্বান্তনা দিচ্ছে, সাহস দিচ্ছে ঠিকই, কিন্ত মনের মধ্যে যে ঝড় যাচ্ছে তা সামাল দিতে নিজের মনে খুব চাপ পড়ছে। তিতির একবার চাচাকে দেখে তন্ময়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, চাচা কি বেঁচে আছেন আদৌ? কিছু বলতে পারলো তন্ময়, শুধুই বললো, ডাক্তাররা তো আশা করছেন উনি তাড়াতাড়ি না হলেও ধাক্কা সামলে উঠতে পারলে বেঁচে যাবেন। সুগারটা কন্ট্রোল করতে পারলে সহজ হবে। দেখা যাক। আল্লাহ যা ভালো হবে, সেটা করবেন, বলে তিতিরকে আশ্বস্ত করলো। দুজনেই অপেক্ষায় বসে রইলো। এর মাঝেই তন্ময় একবার আরেফিন আর রুমানার সাথেও কথা বলে নিলো। রাত হয়ে গেছে, ইচ্ছে থাকলেও পারেনি সারাদিন কিছু জানাতে। যদিও হাজী সাহেব আগে ওদেরকে জানিয়েছেন কি হয়েছে আর কিভাবে হয়েছে।

পুলিশের দুজন বড় সাহেব এসেছেন কথা বলতে, তন্ময় আর তিতিরের, দুজনের সাথেই। একই কথা আবারও শুনতে হলো তন্ময়ের। এবারে অবশ্য জানতেও চাইলো কয়েকটা কথা, বিশেষ করে ডাকাতদের পরিচয় জেনেছে কিনা, গাড়ী যেটাতে এসেছিলো, সে-ই গাড়ী কোথা থেকে পেলো, ড্রাইভারের লাইসেন্স এর খোঁজ পেয়েছে কিনা! যদিও জানে, কিছুই ওকে আপাতত বলবে না পুলিশ, তবুও যিনি ছিলেন কয়েকটা খবর দিলেন। গাড়ী যেটা ডাকাতির সময় চালিয়ে পালিয়েছিলো সেটা পাম ফরেস্ট এর কাছে পাওয়া গেছে। রেন্টেড গাড়ী। লাইসেন্স নাম্বার যেটা ব্যবহার করেছে বুকিং করতে সেটা অন্য একজনের, তার সাথে কথা বলেছে পুলিশ, জেনেছে যে সে লাইসেন্স হারিয়ে যাওয়ার রিপোর্ট করেছে দুসপ্তাহ আগেই। পুলিশ সেটা ভেরিফাই করেছে। সেই লোক মিথ্যা বলেনি। কারণ লাইসেন্সিং অথারিটি ডুপ্লিকেট লাইসেন্স ইস্যু করতে সবকিছুই আবারও নতুন করে প্রসেসিং করেছে। ডাকাতির সময় ছ’জন ছিলো, আর গাড়ীতে বাইরে ছিলো একজন। সাদা ভ্যানের ফিংগারপ্রিন্ট পুলিশ দেখছে। ওরা সন্দেহ করছে, ডাকাতরা স্থানীয় কেউই না। সম্ভাবনা কম। কারণ মালয়েশিয়ায় মানুষ এই ধরণের কাজে জড়ায় না। কড়া আইন আছে। পুলিশ সন্দেহ করছে, বাইরে থেকে কেউ এসে কাজটা করেছে৷ কিন্ত অবশ্যই স্থানীয় কেউ না কেউ, কিছু সহযোগিতা তো অবশ্যই করেছে। তা নাহলে সপ্তাহের কাজের দিনের ব্যস্ততার সময়ে, কুয়ালামাপুরে এভাবে ব্যাংকে ঢুকে গুলি করে ডাকাতির সাহস কেউই করে না। তবে কিছু চাইনিজ অরিজিনের দুর্ধর্ষ অপরাধী এসব করতে পারে। এদের ব্যাপারে ইতিমধ্যেই পুলিশ খোঁজ করতে শুরু করেছে। ওদের সন্দেহ যদি কোন ড্রাগ অ্যাডিক্ট কেউ জড়িত থাকে তাহলে খবর বের করা সহজ হবে, কারণ এরা নেশার যোগাড় করতে মরিয়া হয়ে অনেক সময়ে নানা অপকর্মে জড়ায়, ধরা পড়ে না সহজে। কারণ এরা অপরাধ করে সমুদ্র পথে মাছ ধরার ট্রলারে করে পালিয়ে যায়। পারতপক্ষে কেউই সিংগাপুর বর্ডারে যায় না। কারণ সেখানে সন্দেহ হলে পুলিশ নারকোটিক্স এর কুকুর দিয়ে পরীক্ষা করে। তাই ধরা পরার ভয় অনেক বেশী সেদিকে।

মনের সব ঝড় চেপে, তিতিরের হাতটা হাতে ধরে থেকেই তন্ময় খুব শক্ত করে পুলিশের অফিসারকে শুধু বললো, কিভাবে করবেন, জানিনা, কিন্ত আমি চাই খুনীদের আপনারা ধরে আনবেন, বিচার করবেন। কারণ আমি এখানে ব্যবসা করতে এসে যদি এমন নিরাপত্তার কারণে এভাবে আহত হই, তাহলে আমি ব্যবসা গুটাবো আর সাথে মিডিয়ার সামিনে জানাবো। পুলিশও তন্ময়কে আস্বস্ত করলো, ওরা যেভাবেই হোক আততায়ীর খোঁজ বের করবেই। কারণ এখানে একজন বিদেশী মানুষ অনেক সম্মানিত হিসেবেই থাকেন। তাই এই ব্যাপারটা ওরাও কোনভাবেই মেনে নিতে পারছেনা। ওরা কিছুটা সময় দিতে বললো। তন্ময় মেনে নিলো। পুলিশ জানালো যে ওরা বাংলাদেশের হাই কমিশন অফিসে জানিয়েছে, ওঁরা সকালে আসবেন। তন্ময় কিছু বললো না। শুনলো চুপ করে। পুলিশ ওদেরকে একটু একান্তে থাকতে দিয়ে সরে গেলো। তিতির বেশ ভেঙে পড়েছে। অনেকটা পাথর হয়ে গেছে। তন্ময় ওকে একটু জড়িয়ে ধরলো। কিছুটা হলেও তিতিরের কাঁপুনি কমলো। তন্ময় কপালে হাত দিয়ে টের পেলো তিতিরের জ্বর। একটু হেলান দিয়ে বসিয়ে একজন নার্সকে ডাকার জন্য উঠতে যেতেই তিতির হাতটা আঁকড়ে ধরে মানা করলো। ঠিক হয়ে যাবে বললো তন্ময়কে। পুলিশের একজন আবারও দরজায় নক করে আসার অনুমতি চাইলো। ভেতরে এসে জানালো যে, কিছুটা আভাস পেয়েছে কারা জড়িত, ধরতে চেষ্টা করে যাচ্ছে তাড়াতাড়ি। একটু অবাক হয়েছে ওরা। কয়েকজন চাইনিজের সাথে তিনজন পাকিস্তানি জড়িত বলে সন্দেহ করছে। একটা বড় টাকার লেনদেনের সময় কিছু গোলাগুলির শব্দে পুলিশ কয়েকজনকে আটকাতে পেরেছে, তাই ওরা সেখানে বাকি খবর নিতে চেষ্টা করছে।

কথা বলার সময়েই হঠাৎ করেই একটা অ্যালার্ম শুনতে পেলো, সবাই-ই। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য পুলিশ কিছু একটা বলতেই ঘরে থাকা অফিসার তন্ময় আর তিতিরকে সাথে আসতে বললো। আইসিইউ-র কাঁচের জানালায় দাঁড়িয়ে দেখছে দু-জনে। সবকিছুই কেমন যেন ওলোটপালোট হয়ে যাচ্ছে। নির্বাক হয়ে থাকা তিতির আরও শক্ত করে তন্ময়ের হাত ধরে জানালা দিয়ে তাকিয়ে রইলো চাচা’র শরীরের দিকে। তন্ময় তাকিয়ে আছে মনিটরগুলোর দিকে। অনেক আধুনিক চিকিৎসার সব মনিটর, কিন্ত কোনোটাই মনে হয় কাজে আসছে না। কিছুই হয়তো কাজে লাগছে না আর ভেতরে।
লেখক:
Director
Fingertips Innovations Ltd.