সবাই-ই তাকিয়ে আছে ভেতরের দিকে। ডাক্তার বেশ অনেকক্ষণ চেষ্টা করলেন। মেশিনে বা ডাক্তারের কোন চেষ্টাতেই কোন রেসপন্স করলেন না। চলে গেলেন অজ্ঞান অবস্থাতেই। ডাক্তার শরীরটা ঢেকে বের হয়ে এসে সমবেদনা জানিয়ে গেলেন আর বললেন, কিছু করতে পারলাম না। তিতির তাকিয়েই আছে অপলক, তন্ময় আর তিতির দু’জনেই ভেতরে গেলো। নিথর শরীরটা, ঠিক যেন ঘুমিয়ে আছেন। তিতির কিছুক্ষণ চাচার দিকে তাকিয়ে থাকলো, তারপর তন্ময়ের দিকে তাকালো। তন্ময় ঘাড়টা একটু ডানদিকে কাত করে দিলো ঢাকা দেবার আগে। একটা ফর্মে সবকিছু ফিল আপ করে সই করে দিলো তন্ময়, আগে পোস্ট মর্টেম করবে, তারপর একবারে গোসল করিয়ে কাফন পড়িয়ে কফিনে দেয়ার ব্যবস্থা করবে। আরেফিন আর রুমানা এসে পৌঁছে গেছে হাসপাতালে। তিতিরের সাথে আলাপ ছিলো না রুমানার, কিন্ত রুমানা এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরতেই তিতির যেন আপন কাউকেই পেলো মনে করলো। তন্ময় তিতিরের সাথে বের হয়ে আসলো হাসপাতাল থেকে। পুলিশের সবাই-ই পাশে দাঁড়িয়ে আছে। কয়েকজন মহিলা পুলিশও আসলেন তিতিরকে সান্ত্বনা দেবার জন্য। যদিও তিতির খুব শান্ত আছে, তবে ওর মনের অবস্থা কতটা কি, সেটা তন্ময় জানে। তাই পাশে থেকেই সব কিছু কাজ গোছাচ্ছে। প্রথমেই হাজী সাহেবকে জানালো, তারপর রুমানা, আরেফিন কে জানালো, ঢাকায় নেয়ার ব্যবস্থা করতে। চাচার সব ইচ্ছে জানে তন্ময়। আরও কিছু যদি জানার থাকে সেটা জানে ওনার ল’ইয়ার কাজী ওয়াসিমুল হক। ওনাকেও কল দিলো সরাসরি। সকালের মধ্যে সব ফর্মালিটি শেষ করে ফেলবে পুলিশ আর হাসপাতালের লোকেরা।

গাড়ীতে করে তিতিরকে নিয়ে বাড়ীরে দিকে রওনা হলো। ফোনে দুপুরের এমিরেটস এর ফ্লাইটে নেবার ব্যবস্থা করতে বললো আরেফিন কে। তাহলে সহজে পৌঁছে যাবে ঢাকায়, আর দাফন তাড়াতাড়ি হবে। ঢাকায় এমিরেটস এর কান্ট্রি ম্যানেজার আবরার লতিফকে একটা কল করলো তন্ময়। সব শুনে শুধু বললো, “ভাইসাব, আপ ভাবীজীকে খায়াল রাখিয়ে, বাকি হাম পার ছোর দিজিয়ে। সব কমপ্লিট করনে কে বাদ হি হাম আপকো কল করকে বাতায়েংগে। আপ টেনশন মাত লো ভাইয়া।” থ্যাংকস দিয়ে কল কেটে দিতেই আরেফিন কল দিলো, ঢাকায় নিউজ এজেন্সিকে জানাবে কিনা, জানাতে বলে দিলো তন্ময়।

তিতিরের হাতটা কিন্ত হাতেই আছে তন্ময়ের, একহাতেই মোবাইল চালাচ্ছে। তিতির গাড়ীতে গা এলিয়ে চোখ বুজে রইলো। ড্রাইভার খুব সাবধানে চালিয়ে তাড়াতাড়ি করে বাড়ী ফিরিয়ে আনলো। গাড়ী থেকে নেমেই তিতিরকে জড়িয়ে ধরে নিয়ে ঘরে আসলো তন্ময়। মুনিয়া সুনন্দার কোলে ঘুমাচ্ছে, তাই ও নড়ছে না। সুপ্রীতি এসে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রাখলো তিতিরকে। সুপ্রীতি ঘরে নিয়ে আসলো তিতিরকে ধরে ধরে। কাউচে, জানলার পাশে বসিয়ে দিলো। তন্ময় বেরিয়ে আসতেই ভিজয়া আস্তে করে একটু জানতে চাইলো কোন রিচুয়াল আছে কিনা আলাদা করে করার, তাহলে সেভাবে ও ব্যবস্থা করবে। কিছুই নেই তেমন, বলে শুধু বললো সবার দিকে একটু খেয়াল রাখতে। কারণ ওকে অনেক কিছু গুছাতে হবে। তাই অফিস রুমে গেলো। ল্যাপটপ সামনে নিয়ে যা যা কাজ করার, জানানোর, বলার, সব করলো একটা একটা করে। সময় কতটা গেছে জানে না। হঠাৎ করে দরজার আওয়াজে চোখ তুলে তাকিয়ে দেখে তিতির সামনে দাঁড়িয়ে! ছুটে কাছে আসতেই তন্ময়ের বুকে মাথা রেখে নিজেকে এলিয়ে দিলো তিতির। একটু কথা বলতে চাইলো। মা’কে একবার ফোন করবে কিনা জিজ্ঞেস করায় তিতির বললো, ইচ্ছে করছে না। শুধু বললো ওকে সাথে নেবে কিনা তন্ময় ঢাকায় যাওয়ার সময়। অবশ্যই নেবে, আর একই ফ্লাইটে যাবে সবাই-ই। শুনে যেন অনেকটা শান্তি পেলো তিতির। শুধু বললো, “আমি ভেবেছিলাম, তুমি আমাকে ট্রেনিং করতে পাঠাবে সকালে।” “প্রশ্নই আসে না। সব বন্ধ। সবাই-ই একসাথে ঢাকায় যাবে। ব্যবস্থা করে ফেলেছে। সেগুলো করতেই অফিসে বসে সব করছিলাম এতক্ষণ!” বলে ল্যাপটপ বন্ধ করে আবারও তিতিরের সামনে এসে দাঁড়ালো। তিতির এক ফোঁটা কাঁদেনি। সেটা মনে আছে তন্ময়ের। তাই একবার সামনে এনে ওকে একটা ভিক্টোরিয়ান সোফায় বসালো তন্ময় আর তারপর নিজেও হাঁটু গেড়ে বসলো, তাকালো তিতিরের দিকে।
“এভাবে তাকাচ্ছো কেন?” তিতিরের প্রশ্নে, তন্ময় শুধু আলতো করে ওর থুতনী তুলে চোখের দিকে তাকিয়ে বললো, “বাবা শুধু তুমিই একা হারালে না, আমিও বাবা’র চেয়ে অনেক বড় কাউকে হারালাম তিতির!” কথাটা শুনেই তিতির শক্ত করে তন্ময়ের হাতটা ধরে কাঁদতে শুরু করলো। তন্ময়ের চোখ ভিজে আসলেও তিতিরের কান্না থামানোর চেষ্টা না করে, নিজের কান্না আবারও চেপে থাকার চেষ্টা করতে লাগলো। অঝোরে কান্নার জন্য তিতিরকে বাঁধা দিলো না তন্ময়। দরকার ছিলো এই কান্নারও। আস্তে উঠে বসলো সোফার হাতলে, জড়িয়ে রেখে কাঁদতে মানা করলো না। বেশ অনেকক্ষণ কাঁদার পরে তিতিরের কান্না কিছুটা কমলে পরে বললো, ওপরে যেতে। কোলে তুলে নিতে চাইলো তন্ময়, লজ্জা পেলো সামান্য। না করলো, বললো, “পারবো হাঁটতে। তুমি সাথে আছো, আমার ভয়ের কিছু নেই।” দুজনে বের হয়ে এলো অফিস রুম থেকে। একবার চাচার চেয়ারটার দিকে তাকিয়ে রইলো দরজাটা লাগাবার আগে, দু’জনের চোখই একই জায়গায়। এতক্ষণ তন্ময় যা কাজ করেছে সবই কিন্ত কনফারেন্স টেবিলে বসেই করেছে। চাচা নেই বলেই গিয়ে চাচার চেয়ারে বসে পড়েনি তন্ময়।

ঘরের দিকে যেতে যেতে একবার মুনিয়ার কথা বললো তন্ময়, তিতির বললো, “সুনন্দা ওকে নিয়ে ওর কাছে রেখেছে। বলেছে থাকুক আমার কাছেই, তুমি টেনশন করো না ভাবীমণি!” শুনে তন্ময় একবার নক করলো সুনন্দার ঘরে। দরজা খুলতেই দেখলো দুই বোনই মাঝে মুনিয়াকে নিয়ে শুয়ে আছে। তন্ময় বললো, কিছু কাপড় গুছিয়ে নিতে, কাল দুপুরে ফ্লাইট ওদের সবার। একসাথেই যাবে সবাই ঢাকায়, সব কিছু গুছিয়ে রেখে আসতে। ট্রেনিং পরে করার ব্যবস্থা করবে আবারও তন্ময়, চিন্তা করতে মানা করলো সবাইকেই। আপাতত সবাইকেই দোয়া করতে বললো, তারপর তিতিরকে নিয়ে ঘরে আসলো। ওকে জানালার পাশের কাউচে বসিয়ে তাড়াতাড়ি করে কয়েকটা কাপড় গুছিয়ে নিতে লাগলো। একটা স্যুটকেসে শুধু মুনিয়ার কাপড়, আর খেলনা নিলো। হঠাৎ করেই দরজায় আওয়াজ হতে, মুনিয়ার কান্নার শব্দ পেলো তন্ময়। লাফ দিয়ে মেয়েকে কোলে নিতেই, কান্না কমে গেলো। বাবাকে ধরে রাখলো শক্ত করে যতটা শক্তি ওর ছোট্ট হাতে আছে। কোলে নিয়ে জানালায় দাঁড়িয়ে ওকে স্টারস দেখাতে দেখাতে রাইমস বলে বলে তন্ময় ঠান্ডা করতে চেষ্টা করলো। বাবা’র কোলে মাথা রেখে রাইমস শুনতে শুনতে আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে গেলো আবারও। আরও কিছুক্ষণ কোলে রাখলো তন্ময়। তিতির একটু নিতে চাইলো। তিতির মুনিয়াকে বুকে নিয়ে বসে রইলো আকাশের দিকেই তাকিয়ে। মুনিয়া নিশ্চিন্ত মনে ঘুমাচ্ছে। মায়ের কোলে গুটিশুটি হয়ে। একজন শিশুর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় বাবা’র আর মা’য়ের কোল।

তিতিরকে কিছুটা সময় মুনিয়াকে কোলে দিয়ে ধাতস্থ হতে দিয়ে তন্ময় সব গুছিয়ে নিতে লাগলো। যতটা সম্ভব আওয়াজ না করে। একাই সবটা গুছিয়ে নিয়ে স্যুটকেসের চেন বন্ধ করে দিলো। ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো একবার ভিজয়ার সাথে কথা বলতে। খাবারের আয়োজন কি করেছে, দেখতে। ভিজয়া জানালো সব গুছিয়ে সবাইকে ডেকে আনবে। চাপাতি রুটি, সব্জি, মাংসের তরকারি আর একটু ক্ষীর করেছে। ওদের জন্য, আর সুনন্দা আর সুপ্রীতির জন্য করেছে স্যুপ, সাথে টুনা সালাদ। পাচ সাত মিনিট সময় চাইলো। শুনে তন্ময় একটু নীচের বারান্দার দিকে গেলো হেঁটে, লনে যাবার সিঁড়ি যেখানে ড্রইংরুম থেকে সরাসরি যাওয়ার। কিছুক্ষণ বসে রইলো সিঁড়ির ধাপে। খুব ইচ্ছে করছে একটা সিগারেট খেতে। ঘরে মুনিয়া থাকে, তাই খাবে না। ভাবনা পর্যন্তই অনেক কিছু থাকে, হয়তো সব ভাবনা পরিণতি পায় না। এই সিগারেট খাওয়ার ভাবনাটাও অনেকটা তেমনই।

পিলারে হেলান দিয়ে বসে বসে বেশী কিছু চিন্তা করতে পারছিলো না। বারবার অনেক টুকরো টুকরো ঘটনা মনে আসছে। কিভাবে আজকে তন্ময় আজকের মানুষ, কে এভাবে সামনে আনলো, এসব।

ভিজয়ার ডাকে ভাবনাগুলো খুব একটা খেই পেলো না। সুন্দর ভাবে সবাইকেই একসাথে করতে পেরেছে ভিজয়া খাওয়ার টেবিলে। রাত প্রায় এগারোটা বাজে। চুপচাপ সবাই-ই খেতে বসেছে। সুনন্দা আর সুপ্রীতির সাথে তিতিরও বসেছে। তন্ময় খেতে ইচ্ছে না করলেও জোর করেই খাচ্ছে। তিতিরের অবস্থাও একই। সুনন্দা আর সুপ্রীতির খাওয়া এমনিতেই অল্প। ঘাসপাতা টাইপ খাওয়া, ডায়েট করার নামে।সেটা নিয়ে আজকে তন্ময় আর এখন কিছু বললো না। অন্যদিন দুই বোন ভালো খোঁচা খায় ভাইয়ের সাথে খেতে বসলে।

খাওয়ার পরে আবারও তন্ময় এসে বসলো সিঁড়ির ধাপে। তিতির দেখলো। কিছু বললো না। ও ঘরে গেলো, কারণ মুনিয়া একা ঘুমাচ্ছিলো। তিতির পাশে গেলে পরে রানী খেতে যাবে, তাই চলে গেলো। তন্ময় বসে বসে কয়েকটা বিষয়ে এলোমেলো ভাবতে শুরু করলো। হঠাৎ করেই কেন চাচা ব্যাংকে গেলেন। কি কারণ বা কাজ ছিলো, আগে তো একবারও বলেননি। ফোনে একটা নাম্বার দেখলো, অনেকটা সময় কথা বলেছেন, কিন্ত নাম্বার সেভ করা না। কিন্ত প্রায় লম্বা সময় ধরে কথা হয়েছে তাও বেশ কয়েকবার। কি কথা, কে এই লোকটা, কিছুতেই চিনতে পারছেনা। কলও দিচ্ছেনা। কারণ ব্যাংকের ঘটনা ঘটার সময়েও কল করেছেন আর কথা বলেছেন মাত্র এক মিনিটের চেয়েও কম সময়। ব্যাপারগুলো ভীষণ অস্বাভাবিক লাগছে কেন যেন! কি হলো হঠাৎ করেই যে চাচা এত কিছু করলেন, কথা বললেন, ব্যাংকে গেলেন, আবারও কথা বললেন। টাকা তুলেছেন কিনা বা টাকা কাকে দিলেন, বা কি করলেন? বুঝতে পারছে না, কারও সঙ্গে আলোচনা করবে কিনা। যাঁর সাথে করতে পারতো সে-ই মানুষ ই আজকে নেই। আপাতত চেপে থাকাটা ভালো মনে হলো। কারণ আগ বাড়িয়ে কাউকে বলে আরও সবার টেনশন বাড়াতে চাইছে না। অপেক্ষা করবে, কিছু হলে তখন দেখবে। আপাতত ফোনটা যেহেতু ওর কাছেই থাকছে, তাই ভাবতে চাইলো না। বারবার স্ক্রিনে চোখ যাচ্ছে। তন্ময়ের কোলে মুনিয়া আর তিতির জড়িয়ে ধরে আছে পেছন থেকে। অসাধারণ একটা ফ্যামিলি ফটো। তন্ময় নিজেও ছবিটা দেখে ভাবছিলো তিতিরের এই হাসিটা সচরাচর দেখা যায় না। একটা ছবিতে সবাই প্রাণ খুলে হাসি দিয়ে আছে। ছবিটা তুলেছিলো হুট করেই সুনন্দা। একসাথে সবাই সেইদিন বেড়িয়েছিলো, তখন গাড়ী থেকে নেমে ঘাসে বসেছিলো, মুনিয়ার পায়ে ঘাসের ছোঁয়া লাগছিলো আর ও হাসছিলো, তখনই তিতিরও সেদিন জড়িয়ে ধরেছিলো তন্ময়কে। তন্ময়ের সেটা একটা বিশেষ পাওয়া। সাধারণত কারো সামনে ধরতে ভীষণ লজ্জা পায় তিতির। এই ছবিটার একটা ফ্রেম সুনন্দা আর সুপ্রীতির কাছে আছে। তন্ময় রেখেছে ওর কাছেও। ফেসবুকে। কভার করে। ছবির দিকে তাকিয়ে মন খারাপ কিছুটা হাল্কা হলো। উঠে ঘরের দিকে গেলো। সকালে আবারও অনেক ব্যস্ততা। ঘরের দরজা আস্তে আওয়াজ না করে খুললেও দেখলো তিতির জেগেই আছে। তাকালো তন্ময়ের দিকে। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো। কাছে আসলো তন্ময়ের। তন্ময় একবার মুনিয়াকে খাটে দেখে, তিতিরকে বুকে জড়িয়ে ধরে রইলো। দু’জন চুপ করেই দাঁড়িয়ে রইলো বেশ অনেকটা সময়। একটা স্বান্তনার ছোঁয়া, একটা নিবিড় আর নিরাপদ আশ্রয়। অনেকসময় এভাবে জড়িয়ে থেকেও অনেকটা শান্তি পাওয়া যায়। পাওয়া যায় গভীর ভালবাসা। দু’জন মানুষের একটা আশ্রয় গড়ে তোলা এই ভালবাসায়। “শুতে চলো” বলে বিছানায় নিয়ে গেলো তিতিরকে। আর নিজে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেলো কাপড় পাল্টাতে আর ফ্রেশ হতে। এসে শুয়ে পড়লো তন্ময়। হাতটা ছুঁয়ে রইলো তিতির। তন্ময় আস্তে চাপ দিলো হাতের মুঠোয় হাতটা নিয়ে। কখন যে দুজন ঘুমে তলিয়ে গেলো জানেনা।

ঘুম থেকে চোখ খুলেই দেখে তিতির উঠে পড়েছে। শাওয়ার করে নিয়েছে, রেডি হচ্ছে। তন্ময় উঠে বসে দেখে মুনিয়া নেই পাশে। তিতির বুঝলো, “বাইরে ফুপ্পীর কাছে খেলছে উঠে গিয়ে।” শুনে একটু আশ্বস্ত হলো তন্ময়। তারপর নিজেও উঠে রেডি হতে গেলো। একবারে রেডি হয়ে দুজনেই নীচে নেমে আসলো। মুনিয়া বাবাকে দেখলো, হাসি দিলো একটু বাবার দিকে। আবারও ব্যস্ত হয়ে গেলো ফুপ্পীর কাছে। তন্ময় একটু নাশতা করতে গেলো। তিতিরও সাথে বসলো। একটা টোস্ট নিয়ে বাটার দিয়ে মার্মালেড লাগিয়ে নিলো। ডিমের একটা পোচ নিলো, সাথে অরেঞ্জ জুস। খেতে খেতেই একবার কল করলো আরেফিনকে। জেনে নিলো টিকেট এর ব্যাপারে। সব ঠিক করে দিয়েছেন আবরার। তারপর হাসপাতালে কল দিলো, ওরাও জানালো সাড়ে দশটা নাগাদ ওরা সবকিছুই রেডী করে ফেলবে। একবারে শেষ গোসল করিয়ে কফিনে রেডি করে দেবে। হাজী সাহেবের কলও এর মাঝেই এসে গেলো। উনিও হাসপাতালে কথা বলেছেন সকালেই। সব গুছিয়ে রেখেছেন কাস্টমস এর ডকুমেন্টস। কপি ই-মেইল করে দিয়েছেন এয়ারপোর্টে ওনার পরিচিত এক সিনিয়র অফিসারের কাছে। ওঁরা সব কিছু রেডি করে রাখবে যেন সময় না লাগে।

নাশতা সেরে তিতিরকে সাথে নিয়েই তন্ময় বের হলো। লাগেজ নিয়েই বের হলো ওদের গাড়ীতে। অন্যদের সবকিছু গুছিয়ে নিতে বলে গেলো সুনন্দা আর সুপ্রীতির কাছে। ওরা দুজন মুনিয়া আর রানীকে নিয়ে একবারে এয়ারপোর্টে পৌঁছে যাবে। মাইক্রোবাস রেখে গেলো। ভিজয়া জানতে চাইলো, ও এয়ারপোর্টে পৌঁছে দিতে যেতে পারবে কিনা। তন্ময় বললো, অবশ্যই পারবে। কোন অসুবিধা নেই। বের হলো তন্ময়ের সাথে তিতির। আরেফিনকে হাসপাতালে আসতে বললো আর নিজেরাও যেতে লাগলো। তিতির একটা সুতির সালোয়ার কামিজ পরেছে। ওড়নাটা মাথায় ঘোমটা করে দেয়া। ইদানীং সবসময়ই এভাবে রাখে বাইরে গেলে। খেয়াল করেছে সেটা তন্ময়। দু’জন এসে নামলো হাসপাতালে। হাজী সাহেবের গাড়ী দেখলো আছে রাখা। গাড়ী থেকে বের হতেই দেখলো রিসেপশন থেকে আরেফিন আর রুমানা। রুমানা এসে তিতিরকে জড়িয়ে ধরলো। তিতিরও আঁকড়ে রইলো কিছুটা। আরেফিন আজকে একটু সাহসী হয়ে আছে। এসে জানালো হাতের কাগজের ফাইল দেখিয়ে, সব এখানে গুছিয়ে নিয়ে রেডি হয়ে আছে ও। ডেডবডি দিলে, কফিন নিয়ে ও নিজেও যাবে এয়ারপোর্টে সব ফর্মালিটি কমপ্লিট করে দিতে। হাজী সাহেবের সাথেও দেখা করলো। অল্প সময়েই সব গুছিয়ে কাজ শেষ করলো হাসপাতালের লোকরা। পুলিশের লোকেরা সাথে আরও সাহায্য করলো। তিতিরের রুমানাকে সাথে দিয়ে তন্ময় হাজী সাহেবের কাছ থেকে বিদায় নিলো। ওনার মনটা ভেঙে গিয়েছে, তাই শরীরে চাপ পড়েছে, সেজন্য উনি বাড়ী ফিরে যাবেন। আর আরেফিন আর রুমানা ফিরে আসবে ওদেরকে তুলে দিয়ে। ঢাকার এয়ারপোর্টের সব ব্যবস্থা আবরার করিয়ে রাখছেন, সাথে ঢাকা অফিসের লোকজন আছে। তন্ময় একবার উকিল সাহেবের সাথে কথা বললো গাড়ীতে উঠে, ওয়াসিম সাহেব থাকবেন এয়ারপোর্টে। একবারেই লাশ নিয়ে মসজিদে। দাফনের সবকিছুই গুছাতে জানিয়ে দিয়েছিলো, চাচীর পাশে জায়গাও রেখেছিলেন। সেখানেই সব করে রাখবে। বাদ মাগরিব জানাযা পড়ে দাফন। ঢাকা অফিসে কথা বললো, ওরা গাড়ী নিয়ে রেডি থাকবে। এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেখে মুনিয়াকে সাথে নিয়ে সুনন্দা আর সুপ্রীতি অপেক্ষা করছে। ভিজয়াও আছে সাথে। সবাইকে অপেক্ষা করতে দিয়ে তন্ময় গেলো আরেফিনকে সাথে নিয়ে। পুলিশের লোকেরা আগে থেকেই জানতেন, তাই সব কাগজ গুছিয়ে তাড়াতাড়ি করে দিতে ইমিগ্রেশন এর ঝামেলা একবারে সবারই করে দিলেন। পনের মিনিট মতো সময়ও লাগলো কিনা বলতে পারবে না। এত তাড়াতাড়ি ওরা কাজ করে এগিয়ে দিলো। অ্যাম্বুলেন্সের থেকে কফিন তোলার জন্য অ্যাম্বুলেন্সের সাথে পুলিশের লোক আর আরেফিন গেলো তন্ময়ের সাথে। প্লেনের লাগেজ এর সাথে নেবে। এর মাঝে অন্য প্যাসেঞ্জার উঠে গেছে প্লেনে। তিতির একবার তাকিয়ে দেখলো কফিন আর তন্ময়কে। দাঁড়িয়ে রইলো। সবাইকে উঠে যেতে বললো পুলিশের লোকেরা, কিন্ত তিতিরকে কিছু বললো না, শুধু দুজন মহিলা পুলিশ আর ভিজয়া দাঁড়িয়ে ছিলো। সবাইকে বিদায় জানিয়ে তিতিরও ফ্লাইটে ওঠার সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে। ভিজয়াকে বিদায় জানিয়ে তন্ময় আসলে তারপর একসাথে উঠতে লাগলো দুজনেই। বসার পরে তিতির একবার আস্তে জিজ্ঞেস করলো, একবার কি চাচাকে বাড়ীতে নেয়া দরকার না? তন্ময় বললো,( বাড়ীতেই নেবে৷ একই কথা সেটা ভেবেছে। চাচার নিজের বাড়ী। এদিকে আবরার যে ফার্স্ট ক্লাসে টিকেট করেছে জানতো না। তাই বেশ অবাক হলো। আরেফিনও বলেনি কিছুই। হয়তো ও বুঝতে পারেনি। ফোন অফ করে দিয়েছে, তাই জিজ্ঞেস করতে পারছেনা। মুনিয়া যথারীতি সুনন্দা আর সুপ্রীতির কাছে ব্যস্ত। রানীও আছে। যদিও গুটিয়ে আছে ভয়ে। এতো আরামের কিছু কখনও পায়নি আগে। আসার সময়েও বিজনেস ক্লাসেই এসেছিলো যদিও সবার সাথে।

ফ্লাইট নামতেই ফোন অন করতেই ঢাকার সিমে একসাথে অনেক মেসেজ আর কলের অ্যালার্ট আসা শুরু করলো। ভাইব্রেশনও অফ রেখেছিলো তন্ময়, যেন ফ্লাইটে কেউ টের না পায়। বোর্ডিং ব্রিজে আসার আগ পর্যন্ত মেসেজের যতটা পারলো দেখলো। মিস কলের লিস্ট চেক করে নিলো। বের হয়ে সবাইকে নিয়ে ইমিগ্রেশন এর দিকে যাবার সময় দেখলো ঢাকা অফিসের থেকে আলম সাহেব আছেন সাথে মালয়েশিয়া হাই কমিশনের দুজন লোককেও দেখতে পেলো। ইমিগ্রেশনে ঝামেলা করলো না। ওদেরকে গাড়ীতে তুলে দিয়ে আলম সাহেবের সাথে তন্ময় গেলো কাস্টমস এর দিকে, আবরারকে সেখানেই পেলো। এমন কিছু ছিলো না, যে ফার্স্ট ক্লাসের টিকেট করে দিতে হবে। তখন আবরার বললো, যে চাচা আপনার, তাই। তন্ময় নিজেই উঠেছে অ্যাম্বুলেন্সের সামনে। অন্যরা অন্য গাড়ীতে। তিতির কল দিলো, তন্ময় জানালো বাড়ীতেই আনছে আগে। চাচার নিজের বাড়ী, একবার নেয়া দরকার।

বাড়ীতে এসে সবাইকেই আগে থেকে অপেক্ষায় দেখে তন্ময় একটা স্বস্তি পেলো, সাহসও পেলো। সবাইকে শেষ বার দেখতে দিয়ে তন্ময় তাড়াতাড়ি করে শাওয়ার করে কাপড় পাল্টে নিলো। তারপর জানাযা আর দাফনের জন্য নিয়ে গেলো।

সবকিছু সেরে বাড়ী ফিরলো। গাড়ীতে ওয়াসিম সাহেবের সাথেও কিছু কথা হলো। বেশ কিছু অজানা কথা জানতে পারলো। চাচা বেশ বড় একটা রিস্ক নিতে গিয়েছিলেন, যা এখনো কেউই জানে না। শুধু চাচা জানতেন আর ওয়াসিম ভাইকে বলেছিলেন ব্যাংকে যাওয়ার পথে। ভাবতেই পারেনি এমন একটা কিছু যে চাচা করবেন। তাও আবার সবাইকে বিপদ থেকে বাঁচাতে। ঘুণাক্ষরেও কাউকেই জানতে দেননি। তন্ময় শুধু জিজ্ঞেস করলো র‍্যাবে জানানো ছিলো কিনা। উনি জানালেন, র‍্যাব, ইন্টালিজেন্স, ডিবি সবাইকে উনিই জানিয়েছেন। ইন্টারপোলের মাধ্যমে কাল মালয়েশিয়ায় জানানো হচ্ছে। ব্যাপারটা যে এদিকে ঘুরে যাবে সেটা ভাবেনি তন্ময়, তাই অবাকই হলো। বাড়ীতে ফিরতেই দেখলো বাড়ী প্রায় খালি হয়ে গেছে। রাতও অনেক হয়েছে। তারপরও ওয়াসিম ভাইকে নামার জন্য পীড়াপীড়ি করলো। একসাথেই ড্রইংরুমে বসলেন। সাথে সাথে খেয়াল করলো বাইরে গাড়ী থেকে র‍্যাবের আর ডিজিএফআইয়ের লোকজন। ওয়াসিম ভাই বললো ঘাবড়ানোর কিছু নেই। কথা বলতে আসছে। কারণ শুধু আহমেদ চাচা আর তন্ময় ছাড়া আর কেউই এই ঘটনা একটুও কিছুই জানে না। অফিসে কেউ তো না-ই। তবে ওয়াসিম ভাই সন্দেহ করছেন কাছের মানুষদের মাঝে থেকে কাউকে কাউকে। যদিও সেটা তন্ময়ের সাথে আগে আলোচনা করে তারপর বলতে চান অন্যদের সাথে। তাই আগেই তন্ময়কে জানিয়ে রাখলেন। সবাই-ই একসাথে চাচার লাইব্রেরীতে বসলো। অল্পকথায় সেরে যাবার জন্য রাতেই এসেছে জানালো র‍্যাবের ইফতেখার সাহেব, কোন সিরিয়াস কথা আজকে বলতে আসিনি কাল সেগুলো বলবো, আজকে শুধু দেখা করে যেতে এসেছে, আর জানিয়ে রাখতে, যে, তন্ময় যেন সাহস পায়, আর চাচার এই হত্যার যেন আসল আসামী ধরা পড়ে। কারণ ব্যাপারটা খুবই গুরুতর। একটা ভালো ইমেজ করতে যখন দেশের সুনাম বাড়াতে বিদেশে একটা বিশাল প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে বিদেশীদের কাছে নিজের ক্লিন ইমেজ নিয়ে, তাই তন্ময় সব রকম সাহায্য আর সহায়তা পাবে বাংলাদেশের। সেটা একেবারে সরকারের ওপর থেকে আজকে নির্দেশ পেয়েছে র‍্যাব আর ডিজিএফআইয়ের কর্তারা। তাই রাতেই একবার সৌজন্য করে কথা বলতে এসেছে। সরকারের লোকদের বিদায় জানিয়ে তারপর ওয়াসিম ভাইকেও বিদায় জানালো তন্ময়। একসাথেই বের হলো তিতির, রানী আর মুনিয়াকে নিয়ে। সুনন্দা আর সুপ্রীতি আগেই বের হয়ে গিয়েছিলো জামাইদের সাথে। গাড়ীতে তিতিরকে কিছু বললো না, নিজের ফ্ল্যাটে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে মুনিয়াকে ঘুমের জন্য বিছানায় শুইয়ে দিয়ে তারপর জানালো তন্ময়, যে চাচাকে আসলে একটা বিশাল ফাঁদে ফেলে মেরে ফেলেছে বাংলাদেশের কিছু সন্ত্রাসী। কিছু পিছনের ইতিহাস খোঁজ নেয়া হচ্ছে, কারণ ব্যাপারটা খুব হাল্কা না। কয়েকটা ফোন কলের কথাও বললো তন্ময়, যেটা ও দেখেছে চাচার ফোনে। আর ফোন যেহেতু এখন ওর কাছেই আছে এখনও, তাই ও নিজেও কিছুটা খোঁজ খবর করবে। তন্ময়ের কাছ থেকে সব শুনে বেশ ঘাবড়ে গিয়েছে তিতির। কি বলবে, বুঝতে পারছে না আর। শুধু হাতটা চেপে ধরে রাখলো। আস্তে করে বুকে শুয়ে শুধু বললো সাবধানে থাকে যেন তন্ময়। তিতিরের আর কেউই নেই। কথাটা শুনে, তন্ময় তিতিরকে বুকে নিয়েই শুয়ে রইলো। মনে মনে অপেক্ষায় রইলো সকালের। একটা জটিল যুদ্ধের সামনাসামনি হতে হবে কাল থেকে। তাই ঘুমাতেই চেষ্টা করতে লাগলো। পাশে তো আশ্রয় আছেই তন্ময়ের, তিতির!

তৌফিকুল করিম সুহৃদ

লেখক:
Director
Fingertips Innovations Ltd.