সকালে ঘুম থেকে উঠে গোসল করে, নাশতা করে নিলো তন্ময় আর তিতির। রানীর মা, আর রানীকে এখানেই নিয়ে এসেছে। সকালে নাশতা নিয়ে তাই কোন চিন্তা নেই। আসলে চিন্তা কোনো বেলার খাওয়া নিয়েই করতে হবে না, কারণ এই দুজন সবসময়ই তন্ময়ের পছন্দ অপছন্দ সব জানে, এখন তিতির আর মুনিয়ার পছন্দও জানে। তন্ময় একবার গোরস্থানে যাবে সকালেই। তারপর অফিসে যাবে। তাই তাড়াহুড়ো করে বের হলো। চাচার ড্রাইভার আলিমের আজকে তন্ময়ের গাড়ীর দায়িত্ব। তাই তন্ময় একটা ঝামেলা ছাড়া থাকতে পারবে। নিজেই সাধারণত গাড়ী চালায় আজকে একটু সুবিধা নিলো।

গাড়ীতে উঠতেই ওয়াসিম ভাইয়ের ফোন পেলো। এত সকালে উনি কখনও কল দেননি, তাই আজকের কলে খুবই অবাক হলো। ধরতেই উনি বললেন দেখা করতে হবে তাড়াতাড়ি। তন্ময় আর তিতিরের সাথে, একসাথে। তন্ময় বুঝতে পারলো ব্যাপারটা। তাই জানালো যে ও গোরস্থান থেকে ফিরে তারপর দেখা কিরতে পারে। উনি যদি কষ্ট করে চলে আসেন তন্ময়ের ফ্ল্যাটে, তাহলে সুবিধা হবে সবারই। চলে আসবেন ঘন্টা খানেক পরেই।

কল দিয়ে তিতিরকেও জানালো। তন্ময়কে জিজ্ঞেস করলো, মা’কে আসতে বলবে কিনা! তন্ময় বললো, বলতে পারে, তবে দরকার হলে ওয়াসিম ভাই বলতেন, শুধু দুজনের কথাই যেহেতু বলেছেন, হয়তো বা দরকার হবে না। তবুও তিতির চাইলে আসতে বলে গাড়ী পাঠিয়ে দিতে পারে তন্ময়। তিতির খুব বেশী আগ্রহ দেখালো না। তখনই তন্ময় আবারও গাড়ী পাঠিয়ে দিচ্ছে বলায়, বললো, যা ভালো মনে হয় করতে, তন্ময় একটু ফোন করে দিতে বললো তিতিরকে, গাড়ী যাচ্ছে জানিয়ে, উনি যেন তাড়াতাড়ি করে চলে আসেন।

তন্ময় গাড়ী থেকে নেমে শাশুড়ীকে আনার জন্য গাড়ী পাঠিয়ে দিলো, গোরস্থানে নেমেই। বাবা-মা, আহমেদ চাচা, সবাই-ই এক জায়গায় ঘুমাচ্ছেন। জিয়ারত করার জন্য একটু সুবিধা হলো একই গোরস্থান হওয়াতে। আগে শুধু বাবা-মা কে দেখতে আসতো, এখন চাচাকেও দেখে যাবে। সাধারণত সুযোগ পেলেই চলে আসতেন তন্ময় বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত করার জন্য। দিনক্ষণ মেনে শুক্রবার বা আলাদা করে কখনও স্পেশাল ভেবে আসতো না।

জিয়ারত করে গেটের কাছে বের হতেই র‍্যাবের ইফতেখার ভাই কল করলেন। বাসায় আসছেন, রাস্তায়। তন্ময় বাইরে শুনে বললেন, তুলে নিতে আসছেন। তন্ময় অপেক্ষা করতে দাঁড়িয়ে রইলো। এই সময়ে গোরস্থানের এদিক সেদিক হাঁটতে লাগলো। বিভিন্ন মানুষের কবরগুলো অযত্নে থাকতে দেখে খারাপও লাগলো। অথচ বিদেশে কত যত্নে থাকে সব কিছু।

এসব ভাবনা ভাবতে ভাবতেই ইফতেখার ভাই আবারও কল দিলেন গেটের কাছে আছেন। চলে আসলো তন্ময়, দু’মিনিট এর মধ্যে।

গাড়ীতে উঠতেই ইফতেখার ভাই জানলেন, চিন্তা কিছু নেই। কয়েকটা খবর পেলেই সহজ হবে ব্যাপারটা খোলাসা করা। বললেন, ভাগ্যিস আগে আন অফিশিয়ালি জানিয়ে রেখেছিলেন আপনার ফোনের ব্যাপারটা, তাই অনেকটা সহজ হয়েছে সবকিছু বের করতে। শুধু কয়েকটা খবর জানলেই বাকিটা করা আরও সহজ হবে।

কথায় কথায় ফ্ল্যাটে গাড়ী ঢুকলো। ওয়াসিম ভাইয়ের গাড়ী, ওর গাড়ী সবই নীচে থাকায় বুঝলো সবাই-ই এসে পড়েছে। সুনন্দা আর সুপ্রীতির দেখা পেলো ফ্ল্যাটে কলিং বেল চাপতেই। মুনিয়াকে ছাড়া এখন সুনন্দা থাকতে পারে না, তাই চলে এসেছে। ওকে নিয়ে বাইরে যেতে চায়। বসতে বললো সবাইকেই তন্ময়। পরে বাইরে যেতে বললো। ওয়াসিম ভাই দুইটা স্ট্যাম্প পেপার বের করলেন, আগেই, তন্ময় আর তিতিরের সাইন নিলেন, ইফতেখার ভাইকে বললেন সাক্ষী হয়ে সাইন করতে তন্ময়ের জন্য, আর সুনন্দাকে বললেন তিতিরের হয়ে সাক্ষী থাকার জন্য।

সইসাবুদ হয়ে যাবার পরে বললেন, চাচা’র অনুরোধে এই সাইন নিয়ে উইল খোলার কথা। খুব বেশী কিছু না। অল্প কথাতেই জানালেন ওয়াসিম ভাই। অফিসের সবকিছু আগেই জানিয়েছিলেন। শুধু ব্যাংকের কিছু হিসাব, আর বাড়ী নিয়ে কিছুটা বলার ছিলো, সেটাই জানালেন। বাড়ীটা ভেঙে অ্যাপার্টমেন্ট বানাতে বলেছেন, আর সেখানে একটা ফ্ল্যাট তন্ময়ের, বাকিটা পুরো তিতিরের, গাজীপুরের জমির কথা তন্ময় জানতো, সেটা উনি দিয়ে গেছেন তন্ময়ের জন্য। আর ওনার দেশের সম্পত্তি যা পেয়েছেন সে-ই টাকায় আরও কিছু জমি কিনেছেন গাজীপুরে আরেক জায়গায়, সেগুলো তিতিরের। মুনিয়ার জন্য ব্যাংকে একটা ফিক্সড ডিপোজিট করে দিয়ে গেছেন, পাঁচ কোটি টাকার, নাতিনের যেন কখনও কোন অসুবিধা না হয় পড়াশোনা বা কোন কিছুর। তিতিরের জন্য আলাদা করে দশ কোটি টাকার কথা বলেছেন, এমনকি সুনন্দা আর সুপ্রীতির জন্যও আলাদা আলাদা করে এক কোটি টাকা রেখেছেন।

রানীর মা আর রানীর জন্যও আলাদা করে প্রায় পঁচিশ লাখ টাকা দিয়েছেন, সাথে গাজীপুরে কিছু জমিও, যেন ওরা সবসময়ই তিতিরের আর মুনিয়ার কাছে থাকে। আর রানী যদি পড়াশোনা করে কাজ করতে পারে, তাহলে তিতিরের সাথে, তন্ময়ের সাথেই করবে, বাইরে কোথাও না। তন্ময়কে ক্যাশ দিয়েছেন ওনার বাইরের অ্যাকাউন্টে থাকা টাকা, সেটা এইচএসবিসি’র অ্যাকাউন্টে আছে, দুবাইয়ে। পাঁচ মিলিয়ন ডলার। ইফতেখার ভাই কথা শেষ হতে জানতে চাইলে মালয়েশিয়ায় উনি ব্যাংকে ডাকাতির আগে কোন টাকা তুলেছিলেন কিনা, তুললে কতটা! ওয়াসিম ভাই জানালেন, তুলেছিলেন, মাত্রই ট্রান্সফার করা পাঁচ মিলিয়ন ডলারের থেকে আড়াই লাখ ডলার। সেটা ব্যাংক ট্রান্সফার করা, আরেকটা মালয়েশিয়ার অ্যাকাউন্টে। নাম্বার দিলো ইফতেখার ভাইকে।

বাংলাদেশের টাকাগুলো সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই উনি গুছিয়ে দেবেন। সবার অ্যাকাউন্ট দিয়ে। বাইরের টাকাগুলো মাস খানেকের মধ্যে করে দেবেন। তন্ময়ের একবার দুবাইয়ে যেতে হবে যদি টাকা দুবাইতে রাখতে চায়, অন্য দেশেও পাঠিয়ে দিয়ে পারে যদি ওর কোন অ্যাকাউন্ট থাকে। তন্ময় জানালো মালয়েশিয়ার অফিসের অ্যাকাউন্ট ছাড়া এখনো নিজের কোন বাইরের অ্যাকাউন্ট নেই। বাংলাদেশের অ্যাকাউন্ট ই ওর একমাত্র সম্বল, তাও এইচএসবিসি’র। দুবাইয়ে খুলতে অসুবিধা না হলে সেখানেই রাখবে, তবে অ্যাকাউন্ট জয়েন্ট করতে বললেন, দুবাই আর মালয়েশিয়ায়, দুই দেশেই, তিতির আর তন্ময়ের নামে। শুনে ওয়াসিম ভাই সহ সবাই-ই অবাক হয়ে তাকালো তন্ময়ের দিকে। তন্ময় সরাসরি বললো, যেভাবে একজনকে শেষ করে দিয়েছে মুহুর্তের মধ্যে, তাই ও চায়না যে ওর কোন কিছু হলে তিতির ঝামেলায় পড়ুক। সেজন্যে আগে থেকেই গুছিয়ে রাখতে চাইছে। ইশারায় তিতিরকে আপত্তি করতে না করলো।

সুনন্দা আর সুপ্রীতিরও ইচ্ছে ওদেরকে দেয়া টাকাও যেন মুনিয়ার নামে ট্রান্সফার করে ফিক্সড ডিপোজিট করে দেয়। কারণ বললো, দাদা (তন্ময়) ওদের কে এত ক্যাশ দিয়েছেন, আর মাসে মাসে এখনও যেভাবে দেন, তাই চাচা’র কাছ থেকে পাওয়া সবটাই ওরা ওদের আদরের মুনিয়ার জন্য রাখতে চায়। সাথে আরেকটা অনুরোধ করলো, সুপ্রীতি, কখনও যেন ওর হাজবেন্ড এই টাকার কথা না জানে। কারণ দাদার করে দেয়া অ্যাকাউন্ট বা দাদার দেয়া টাকার কথা সুপ্রীতি ওর হাজবেন্ড কে জানায় না। তাহলে কিছুই থাকবে না। কারণ ব্যবসা আর জুয়ার একটা নেশা ও টের পেয়েছে রাতুলের। ব্যাপারটা আগেই টের পেয়েছিল সুপ্রীতি, কিন্ত মাত্রই গতরাতে টের পেয়েছে আরও ভয়ংকর কিছু ব্যাপার। রাতে কাল রাতুল বাড়ীতে ছিলো না। সকালেই ফিরেছে। সাথে দু’জন লোককে নিয়ে। কাউকে আগে জানায়নি সুপ্রীতি, যে রাতুলের কিছু শারীরিক সমস্যা আছে। ভেবেছিলো সারিয়ে নেবে। কিন্ত আজকে সকালে যখন জোর করে ওকে সে-ই দুজন লোকের ঘরে পাঠাতে চেষ্টা করেছে, আর তখনই বুবু’র ফোন আসাতে, যা পড়া ছিল তাতেই বের হয়ে এসেছে। ইফতেখার ভাই শুনেই সাথে সাথে অ্যাকশন নিতে ব্যবস্থা করলেন। রাতুল ওয়াসিম ভাইকে ডিভোর্স এর কাগজ করতে বললেন। সাথে এও জানালো, যে দাদার কাছে টাকা চেয়েছে, চাচার কাছ থেকে টাকা নিয়েছে, সেগুলো সবই রাতুল করিয়েছে। সাথে ওর কিছু বদ বন্ধু আছে, কিন্ত কারা আছে জানে না।

ইফতেখার ভাই অবাক হয়ে তাকালো, তন্ময় তো পুরাই থমকে গেছে। তিতিরের পাশে বসা ছিলো, সুপ্রীতি, ভাবীর দিকে তাকিয়ে ওকে আশ্রয় দেবে কিনা জিজ্ঞেস করতে করতেই কেঁদে দিলো। তিতির সবার সামনেই জানিয়ে দিলো, এখন থেকে সবসময়ই সুপ্রীতি তিতিরের কাছেই থাকবে। কোথাও যাবে না। অনেকক্ষণ ধরে কাঁদতে দিলো ওকে সবাই-ই।

ইফতেখার ভাই যা বোঝার বুঝে নিয়ে ইমিডিয়েটলি রাতুলকে অ্যারেস্ট করতে ওয়ারেন্ট রেডি করতে বললেন অফিসে, করেই রাতুলের বাসা থেকে তুলে আনার জন্য বলে দিলেন। আর আগে আপাতত পালাতে যেন না পারে তাই বাসায় নজর রাখতে সোর্স পাঠাতে বললেন। কোনভাবেই ছাড়া যাবে না।

সুনন্দা মুনিয়াকে কোলে নিয়েই বোনকে আদর করতে করতে বললো, “তুই আমাকে কখনও কিছু জানাসনি কেন?” জবাবে সুপ্রীতি বললো, ওর দিকেও খারাপ নজর দিতো, আর দুলাভাইকে নিয়ে বাজে বাজে কথা বলতো। শুনে ওয়াসিম ভাই বললেন, অভি অনেক সাধারণ চুপচাপ ছেলে হলেও অসম্ভব মেধাবী একজন পেশাদার হবে ওকালতি পেশায়।

সবাই চলে যাওয়ার পরে তন্ময় এসে বোনের পাশে বসলো। মাথায় হাত রেখে জিজ্ঞেস করলো, গায়ে হাত তুলেছে কিনা কখনও। চুপ করে রইলো। তন্ময় বুঝে নিলো। “কখনও বলিসনি কেন আমার কাছে? আমি না বললে জানবো কিভাবে তোর ঘরে কি করছে তোর সাথে! আমাকে বললে তো আমি আরও আগেই তোকে সরিয়ে নিয়ে আসতাম। এভাবে অপমান হতে দিতাম না।” শুনে ভাইকে ধরে কাঁদতে থাকে সুপ্রীতি।

ইফতেখার সাহেব বের হয়েই অফিসে খবর নিলেন, ওয়ারেন্ট রেডি হতে কতটা সময় লাগবে, আর রাতুলের বাসায় কেউ গেছে কিনা খেয়াল রাখতে।

তন্ময় ভীষণ অস্থির হয়ে থাকলেও, ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো বেশ অনেকটা সময়। কিছুতেই নিজেকে ঠান্ডা রাখতে পারছে না। কিছু করতেও পারছে না। আরও বেশী অসহায় লাগছে সেজন্যে। একবার মনে হলো বের হয়ে একটু একা বাইরে ঘুরে আসতে, আবার বাদ দিলো, মাথা এতটা গরম লাগছে এখন কাউকে যে কোন কিছু করে বসতে পারে। মেজাজ কিছুতেই ভালো হচ্ছে না। ছাত্র রাজনীতির প্রথম দিককার দিনের কথা মনে পড়লো। একবার এমন মেজাজ খারাপ হয়েছিল পরে এক পাতি মাস্তানকে অনেক পিটিয়েছিলো তন্ময়। সুপ্রীতির দিকে বাজে মন্তব্য করেছিলো বলে। খেয়ালনকরেনি ছেলেটা যে তন্ময় পেছনেই ছিলো, সাথে। আজকেও ঠিক একইভাবে পিটিয়ে রাতুলকেও বোঝাতে ইচ্ছে করছে। এ-ই অপমান কতটা গায়ে লাগছে তন্ময়ের, তা কাউকে ও বলে বোঝাতে পারবে না। পুরনো নিয়মে একা ব্যালকনির ফ্লোরে বসে রইলো চোখ বুজে, মেজাজ কমাতে। এই নিয়ম অবশ্য তন্ময়ের নিজের। খুব মেজাজ চড়লে এভাবেই একা বসে থাকে, এখানে। সাধারণত রাতে বসে, আজকে এখন ভর দুপুরের রোদেই বসে আছে।

অনেকটা সময় চলে গেছে। তিতির একবার উঁকি দিয়ে দেখে এসেছিলো, কিছু বলেনি, ডাকও দেয়নি। বুঝতে পেরেছে তন্ময় একা থাকতে চাইছে। দুপুরের খাবারের সময় হয়ে গেছে, এইবার তিতির আবারও এসে দেখে তন্ময় একাই বসে আছে আকাশের দিকে তাকিয়ে। ফিরে গিয়ে মুনিয়াকে রেখে এসে এবার তিতির নিজেও বসলো এসে তন্ময়ের পাশে। তিতিরের আসার আওয়াজ পেয়ে চোখ ঘুরিয়ে তাকালো তন্ময়। তিতির হাত ধরে বসলো। তন্ময় কিছু বললো না, তিতির বললো, “তোমার শক্ত হতে হবে। নাহলে সুপ্রীতি ভিয় পাবে তোমাকে। তুমি রাতুলকে কি করবে সেখানে আমি সবসময়ই তোমার পাশে থেকে সাপোর্ট করবো।” তিতিরের দিকে তাকিয়ে তন্ময় শুধু বললো, “আমার বোনকে আমি এমন অথর্ব একটা কুলাংগারের সাথে বুয়ে দিয়েছিলাম, আমি ভাবতেই পারছিনা, কিভাবে এই ভুল করলাম আমি। একবারও বুঝিনি এই ছেলে এমন যে কিনা এত নোংরা মনের! চিন্তারও বাইরে ছিলো, কিছুতেই বুঝতে পারছিনা সুপ্রীতির কেন এতদিন এগুলো বলেনি আমার কাছে!”
তিতির বললো, ” আমি কথা বলেছি, ও বলেনি, লজ্জায়, ভয়ে। যেহেতু ও-ই পছন্দ করে তোমাকে বলেছিলো, বিয়ের ব্যাপারে, তাই সাহস পায়নি। আমি একদিন হাল্কা ঝগড়া করতে শুনেছিলাম, সেটা আমি ধরে নিয়েছিলাম হাজবেন্ড আর ওয়াইফের ব্যাপার, তাই কান পাতিনি কিছু শুনতে। কিন্ত এখন আজকে মনে হলো, আমিও ভাবী হিসেবে কেন কজেয়াল করে সেদিন কিছু শুনিনি, কেন আমি জোর করে ওকেই বা কিছু জিজ্ঞেস করলাম।না। সবসময়ই একটা মিথ্যা সুখী মেয়ের অভিনয় কিরছে সুপ্রীতি, সেটাও আমি বুঝতেই পারিনি!”
তন্ময় শুধু তাকালো, কিছু আর বললো না। আরও খানিকটা সময় দুজন এভাবে বসে ছিলো। তিতিরের সুপ্রীতির জন্য এই টান, মায়া দেখে তন্ময় মনে মনে ভীষণ সাহস পেলো। বুঝতে পারলো, এরপর থেকে তন্ময়ের টেনশন কম হবে। দু’জনে একই ধারায় চিন্তা করে। শান্তি পেলো মনে মনে। মেজাজটাও অনেকটা কমেছে মনে হলো। তিতিরের জোর করে টেনে তুলে খাওয়ার জন্য আনার কথায় তন্ময়ের আরও ভালো লাগলো।

খাওয়ার টেবিলে বিসার আগে সুপ্রীতির পাশে এসে দাঁড়িয়ে, ওকে একবার বুকে নিয়ে শুধু বললো, ” আমাকে তুই না জানিয়ে আমাকে অপমান করেছিস, আমার বোনকে আমি কখনও এমন শয়তান ছেলের সাথে সংসার করতে দিতাম না।” সুনন্দা একটু বললো, ” মানুষের কথা তুমি ভাবলে না, এভাবে একবারেই তুমি ডিভোর্স দিতে রাজি হয়ে গেলে ওর কথায়?” তন্ময় খুবই বিরক্ত হয়ে বললো, ” তুই কি সারাজীবন গাধাই থাকবি? আগে তোর বোন না আগে মানুষের কথা? কোনটা তোর কাছে জরুরী?” ভয়ে সুনন্দা কি বলবে বুঝতে পারছিলো না, তাই আবারও বোকার মতো নলে বসলো, ‘আমার শাশুড়ী যদি কিছু বলেন তাহলে আমি কি বলবো?” তন্ময় বললো, “তোর শাশুড়ী কিছু বললে, সোজা বলবি, আমি এখনও বেঁচে আছি, আর আমার কাছে আমার বোন আগে, সমাজ আমাকে এসে খাওয়ায় না, পড়ায় না। আমি, তোদের বাবা-মা না থাকায়, একাই খেয়াল করে আগলে রাখবো। আজকের বদলে যদি বিয়ের একদিন পরেও জানতাম, তাহলে সেদিনই আমি ওকে শ্বশুর বাড়ী থেকে বের করে আমিই টেনে নিয়ে আসতাম। কারো কথার আমি তোয়াক্কা করিনা কখনো। আজকে কপাল ভালো সুপ্রীতি আমার সামনে বসে আছে, যদি এই অপমান, নোংরামি সহ্য করতে বা পেরে আত্মহত্যা করতো, তখন কি করতাম আমি? কিছুই করার তো থাকতোও না, উল্টা সারাজীবন আমি তখন নিজে মাফ করতে পারতাম না অযোগ্য ভাই বলে ভাবতে ভাবতে। আমি আগে আমার বোনকে আমার কাছে আমার পাশেই রাখবো, সমাজের কথায় কখনও বোনকে ফেলে দেবো না এই বলে যে বিয়ে হয়েছে, মানিয়ে নে, একেবারেই না। এ-ই ফালতু মানিয়ে নেয়ার কিছু নেই। অযোগ্য জামাইয়ের ঘরে থাকার চেয়ে আমার কাছে আমার বাড়ীতেই থাকবে আমার বোন হয়েই, কারো চিন্তার দরকার নেই। আমি যদি খাই, আমার বউ মেয়ে যদি খায়, তাহিলে আমার বোনেরও আমার সাথে খাওয়ার জুটবে। সমাজ এসে খাওয়াবে না ওকে কখনও। আর এ-ই কথা শুধু তোদের জন্যই না, এ-ই একই আচরণ আমি করতাম যদি দেখতাম রানীর সাথেও ওর জামাই বা শ্বশুর বাড়ীর কেউ করে। এ-ই কথা সবাই মনে রাখিস। মেয়ে হয়ে বিয়ে হলেই পর হয়ে যায় না ভাইয়ের কাছে, আরও সাহস পেতে ভাইকে সবসময়ই পাশেই পাবি তোরা!”

ভাইয়ের কথা শুনে সুপ্রীতির চোখে পানি এসে গেলো, দেখে, এবার তিতির মুখ খুললো, ” ছুটকি, তুমি আমাকে আরও আগে যদি বলতে, তাহলে আমিই আমার কাছে আগে নিয়ে আসতাম। কখনও যেতেই দিতাম না। কান্নাকাটি করার কিছু নেই রে ছুটকি, আমি আছি, দাদা আছে তোমার, এখানেই থাকবে আমার ফ্ল্যাটেই থাকবে। এ-ই বাড়ীতে তোমারও অধিকার আছে, যেমন আমাদের আছে, এটা তোমারই বাড়ী, তোমার ভাইয়ের বাড়ী ভাববে না শুধু। একদম।কান্না করে না রে ছুটকি!” বলেই আদর করে সুপ্রীতিকে আরও কাছে টেনে নিলো।
সবার সাপোর্ট দেখে সুনন্দা এবারে বললো, ” যদি কেউ কিছু বলে ওকে, তাহলে ও কি করবে?” তন্ময় সেই কথায় এবারে হেসে দিয়ে বললো, “তুই এক কাজ কর, উত্তর দেয়ার জন্য মুনিয়াকে বলিস, তোর হয়ে ও বলে দেবে, মুনিয়াও অন্তত এ-ই কথাটা বুঝবে, কাকে কজ বলবে, শিখিয়ে দিতে হবে না। তুই বড় হবি কবে রে? হ্যাঁ, বলতো একটু আমাকে! তোর আসলেই কপাল ভালো অভিও আরেকটা সোজাসরল ছেলে, নাহলে তোর কপালে আরও কষ্ট হতো সুপ্রীতির চেয়ে। নে, আর কথা না বলে খেয়ে নে!”

খাওয়ার পরে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে প্রায় পাঁচটা বাজে। সবাইকে নিয়ে আর কিছু না বলে তন্ময় এবার একটু নিজেই মুনিয়াকে নিয়ে খেলা করতে লাগলো। মুনিয়াও বাবার আদর পেতে, সাথে খেলা করতে লাগলো। একবার একটু দৌড়ে এদিক সেদিক যায়, আবার ছুটে ফিরে এসে বাবাকে ধরে আদএ করে, এ-ই মুনিয়ার প্রিয় খেলা। খেলতে খেলতেই কিছুটা সময় নিজেকে সবকিছু থেকে দুরে রাখতে চেষ্টা করলো তন্ময়। বাড়ী থেকে আর বের হলো না আজকে। শুধু খেলতে খেলতে বিরক্ত হয়ে যাওয়ার পরে মুনিয়াকে নিয়ে একবার নীচে গিয়ে অল্পক্ষণ হেঁটে আসলো।

রাতে খেতে যাওয়ার সময় ইফতেখার ভাই কল দিলেন। জানালেন রাতুলকে দুপুর থেকে জিজ্ঞেস করে অনেক কথাই বের করতে পেরেছেন। আরও কিছু জানার চেষ্টা করবেন তারপর ওকে কোর্টে নেয়া হবে। রাতুলের বাসায় আত্মীয় সম্পর্কের কেউ না থাকায় এখনো কেউই জানেনি ওর অ্যারেস্ট হবার খবর। আর আপাতত কাউকেই অ্যারেস্ট করেননি, কারণ এক জায়গা থেকে সব খবর যতটা বের করা যায়। সারাদিন ওর ফোনে কোন কল না আসলেও রাতে আটটার পর থেকে বেশ কিছু কল আসছে। নাম্বারগুলো ট্র‍্যাকিং করা হচ্ছে। রাতে আরও কিছু বের হবে খবর, আশা করছেন। তিতির পাশেই ছিলো, তাই ফোন রাখার পরে ওকে জানালো সবকিছুই।

রাতে খাওয়ার সময় কাউকে কিছু বললো না তন্ময়। শুধু তিতিরের সাথে দোয়া পড়ানোর ব্যাপারে দুয়েকটা কথা বললো খাওয়া শেষ করার পরে। সুনন্দা অভির সাথে ওর বাড়ীতে গিয়েছে আর সুপ্রীতি আছে এখানেই।

মুনিয়া ঘুমিয়ে পড়েছে। তিতিরও শুতে যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছে। তন্ময় একবার বোনের ঘর থেকে ঘুরে আসলো। কোন কিছু নিয়ে টেনশন করতে মানা করলো সুপ্রীতিকে। সময় হলেই সব আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে। আশ্বাস দিলো ঠিকই, কিন্ত খটকা কিছুটা রয়েই গেলো তন্ময়ের মনে। কখনও চিন্তা করেনি ক্ষমতা খাটিয়ে নিজের বা নিজের আত্মীয় বন্ধুর জন্য কিছু করতে হবে। কিন্ত আজকে বুঝতে পারছে করতে হবে।

রাতভর জিজ্ঞাসাবাদ করে ইফতেখার সাহেবও অনেক কিছুই বের করলেন। মালয়েশিয়ার হাই কমিশনে কাজ করে একজনের সাথে সখ্যতা রাতুলের। তার কাছ থেকেই খবর বের করেছে কি করে, কিভাবে কাজ করবে রাতুল, সে-ই প্ল্যানিং করেছে ওই লোকের সাথেই মিলে। সেই লোকই রাতুলকে মালয়েশিয়ার সিম যোগাড় করে দিয়েছে। আন্ডার ওয়ার্ল্ডের লোকদেরকেও সে-ই লোকই যোগাড় করে দিয়েছে রাতুলকে সাহায্য করতে। মাইকেল নামের এক চাইনিজ গ্যাং লিডারের সাথে মিলে তাকে দিয়েই টাকা আদায় করেছে চাচার কাছ থেকে। আর অন্য একটা অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করিয়ে আবারও সে-ই অ্যাকাউন্ট থেকে টাকাও তুলে নিয়েছে দু ঘন্টা পরে কয়েকটা আলাদা আলাদা অ্যাকাউন্টে টাকা নিয়ে। সবকিছুই রাতুল করেছে অনেক বেশী উচ্চাভিলাষী হয়ে। ধারণা ছিলো না তন্ময় কিভাবে ওকে সামনে আনতে চেষ্টা করছিলো। রাতারাতি বেশী লোভ করতে গিয়েই সোনার ডিম দেয়া হাস মেরে ফেলেছে রাতুল। বাংলাদেশের অ্যাকাউন্টে টাকা আসে নি, সেটা পাওয়ার জন্য রাতুল টেনশন করছে না। কারণ এ-ই জায়গায় জানে৷ যে ঢাকায় টাকা আসলে তন্ময় বুঝে ফেলবে কি হয়েছে কোথা থেকে। ইফতেখার ভাইকে তন্ময় রাতে সিংগাপুর যাওয়ার পথে সবকিছু জানিয়ে, কাকে কোথায় সন্দেহ করেন বলাতেই এত কিছু সহজে বের করা সম্ভব হয়েছে। যদিও তন্ময় একবারও কল্পনাও করেনি রাতুল এসবের সাথেই এত গভীর ভাবে জড়িত আর মাস্টার প্ল্যানার।

রাতুলের কাছ থেকে সব মোটামুটি জেনে নিয়ে মালয়েশিয়ার কাউন্টার পার্টির কাছে সব রিপোর্ট দিলেন ইফতেখার সাহেব। হাজী সাহেবও যেহেতু আগেই জানিয়ে ছিলেন তন্ময়ের ব্যবসার গুরুত্ব আর আহমেদ সাহেবের সাধারণ মানুষের মতো চলাফেরা, জীবনধারণ, তাই মালয়েশিয়ার পুলিশও যতটা পক্রছে তাড়াতাড়ি করেই সব কিছু করতে সাহায্য করছে। আগেই যেহেতু ওরা অনেকটা এগিয়ে ছিলো, তাই ইফতেখারের পাঠানো রিপোর্ট ওদের অনেক কাজই সহজ করে দিলো।

সারারাত মোটামুটি জেগেই কাটাচ্ছে সুপ্রীতি। অনেক স্বপ্ন দেখেছিলো, আসলে দেখিয়েছিলো ওকে রাতুল। কলেজে পড়ার সময় থেকেই একটা মোবাইল অপারেটর এর কাস্টমার কেয়ারে কাজ করতে থাকা রাতুলের প্রতি একটা আকর্ষণ কাজ করতে থাকে। যদিও মা মারা যাবার পরেও দাদা ওদেরকে আদর করেছেন, স্বাধীনতা দিয়েছেন, ছায়ার মতো আগলে রেখেছেন। কখনও কোনকিছু করতে বাঁধা দেননি। তারপরও একটা নিষিদ্ধ নেশার মতো করে রাতুলের প্রেমে পড়েছিলো সুপ্রীতি। দাদা ও মেনে নিয়েছিলেন কিন্ত শর্তে, পড়ালেখা করে ভালো রেজাল্ট করে তারপর বিয়ের পারমিশন পাবে। হ্যাঁ, এ-ই কথাটা ঠিক, যে রাতুল কখনও সম্পর্ক হচ্ছে বলে কোন অনৈতিক সুবিধা নেয়নি সুপ্রীতির কাছ থেকে। কিন্ত সেটা সম্মানের চোখেই দেখেছিলো সুপ্রীতি। কখনও ভাবেনি রাতুলের সমস্যা থাকতে পারে। সমস্যাটা বুঝতে পারে বিয়ের পরে। হাল্কা আঁচ করেছিলো হানিমুনে মালয়েশিয়ায়, কিন্ত সেসময় প্রায়ই রাতে ড্রিংক করতো বলে টানটা আসেনি সেক্স এর। দু’জন সমানে মদ খাওয়া শিখেছে, ভুল হলো, রাতুল শিখিয়েছে সুপ্রীতিকে। আর ফিরে এসে অনেক।সময়ই কাজের ব্যস্ততা, রাতের পার্টি, উইকএন্ড পার্টি, বন্ধুদের সাথে ঘুরে বেড়ানো, এসব নিয়ে এত বেশী খুশী থাকতো, তাই জীবনের এই পর্ব অজানাই থেকেছে। আরবকিভাবে যে দু’বছর সময় পেরিয়ে গেছে, দুজনের কেউই হিসেব করেনি। বরং সেক্স ছাড়া বেঁচে থাকতে বুঝতে শিখেছিলো। কাউকেই কখনও এসব নিয়ে কথা বলেনি। কিন্ত মালয়েশিয়া যাওয়ার আগে, আসলে তন্ময় দাদার বিয়ের আগে থেকেই এই পরিবর্তন আসছিলো রাতুলের। গত দুই বছর ব্যবসার নামে টাকা উড়িয়ে, বন্ধুদের পাল্লায় জুয়া খেলে, চাকরীর থেকে ছেড়ে আসার সময়ে পাওয়া প্রায় দেড় কোটি টাকা শেষ করেছে। ফ্রান্সের ট্যুর থেকে আসার পরেই অনেকটা পরিবর্তন আঁচ করছিলো সুপ্রীতি, কাউকে বলেনি। অনেক সময় খেয়াল করেছে, রাতুল রাতে মোবাইলে বা ট্যাবলেট এ পর্ণ মুভি দেখে। আগে সুপ্রীতিকে সাথে নিয়েই দেখাতো, কিন্ত ইদানীং একেবারেই একা একা দেখতে থাকতো। আজেবাজে পার্টিতে যেতে রাজি হতো না সুপ্রীতি আর পালিয়ে সুনন্দার কাছে চলে যেতো নানা অজুহাত দেখিয়ে। এখন বুঝতে পারছে, দাদাকে আগেই সবকিছু জানানো দরকার ছিলো। তাহলে এত বিপদ হতো না কারোরই। এসব চিন্তা করতে করতেই কখন যেন ঘুমিয়ে গেছে টের পায়নি। ঘুমের মাঝেই দুএকবার রাতুলকে ডেকেও জিজ্ঞেস করেছে, কেন এমন করতে চাইছিলো রাতুল ওর সাথে। প্রশ্নের উত্তর ঘুমের মাঝে খুঁজে পায়নি সুপ্রীতি।
তৌফিকুল করিম সুহৃদ

লেখক:
Director
Fingertips Innovations Ltd.